অনুরাগের ছোঁয়া পর্ব-২৩

0
581

#অনুরাগের ছোঁয়া
#নবনী-(লেখনীতে)
#পর্ব-২৩
||
রিয়া আজকে মনে মনে অনেক খুশি।তার ভালোবাসার মানুষটিকে যে,এভাবে পাবে সে কোনদিন ভাবতেই পারেনি।খুশিতে তার চোখে জল এসে গেছে।তার সামনে একটা রুমাল দেখতে পেয়ে সে সামনে তাকায়।সামনে তাকাতেই সে দেখতে পায় আবির তার সামনে রুমাল বাড়িয়ে দিয়ে বলছে, তোমার মুখে হাসিই মানায় জল না।আবির মুচকি হাসি দিয়ে বলে,এটা দিয়ে চোখের জলটুকু মুছে নাও।

ফুলে ভরা সজ্জিত রুমে বসে আছে ছোঁয়া।চারদিকে বেলীফুলের গন্ধে ম-ম করছে। বেলীফুল ছোঁয়ার অনেক পছন্দ।ছোঁয়া হাতে একটা বেলীফুলের মালা নিয়ে তার সুভাষ নিতে লাগল।ছোঁয়া মনে মনে ভাবল, অনুরাগ জানল কীকরে যে তার বেলীফুল পছন্দ।এসব ভাবতে ভাবতেই তার ঠোঁটের কোনে আলতো হাসি ফুটে উঠল।দরজা আটকানোর শব্দ কানে আসতেই ছোঁয়া ফুল ছেঁড়ে নড়েচড়ে বসল।সে বুঝতে পেরেছে যে অনুরাগ এসেছে।সে অনুরাগের দিকে একপলক তাকিয়েই চোখ সরিয়ে নিল।এই মুহূর্তে অনুরাগকে তার কাছে যাস্ট অসহ্য লাগছে।অনুরাগ যে তাকে ব্লাকমেইল করে বিয়ে করেছে এটা মনে উঠতেই তার প্রচন্ড রকমের রাগ হচ্ছে।সে মনে মনে অনুরাগের চৌদ্দ গুষ্টি উদ্ধার করছে।

রুমে আসতেই অনুরাগের চোখ গেলো তার খাটে বসে থাকা অসম্ভব সুন্দর একটা রমনীর দিকে।যে রাগে খাটে গাল দুটো ফুঁলিয়ে বসে আছে।অনুরাগের কাছে ছোঁয়াকে এখন কিউট বাচ্চাদের মতো লাগছে।তার ইচ্ছে করছে এখন টুস করে ছোঁয়ার ফোঁলা গালদুটো চুমু খেতে।সে তার ইচ্ছেটাকে দমিয়ে রাখতে না পেরে ছোঁয়ার একদম কাছে গিয়ে তার গালে টুস করে একটা চুমু খেলো।আকস্মিক এরকম হওয়াতে ছোঁয়া চোখ বড় বড় করে অনুরাগের দিকে তাকালো।তার দিকে তাকিয়ে দেখল যে অনুরাগ ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।অনুরাগের এই ডোন্ট কেয়ার ভাবটা যেনো ছোঁয়ার রাগটা আরও কয়েক কদম বাড়িয়ে দিলো। সে ঝাঁঝাঁলো কন্ঠে অনুরাগকে বলল..

–এই আপনি আমাকে চুমু খেলেন কেনো?

–কে বলল আমি তোমাকে চুমু খেয়েছি।আমিতো আমার বউকে চুমু খেয়েছি।

–আপনার বউ কে?

–কেনো তুমি!

–আপনাকে আমি স্বামী হিসাবে মানি না।

ছোঁয়ার এ কথাটা শোনে অনুরাগে অনেক রাগ হলো।সে নিজের রাগ কন্ট্রোল করতে পারল না।সে দৌড়ে গিয়ে ছোঁয়ার বাহু শক্ত করে ধরে তার দিকে ফিরিয়ে বলে,

–কেনো তুমি আমাকে স্বামী হিসেবে মানতে পারবে না বলো।আমি কি এতোটাই খারাপ।নিজেকে শেষ করার ভয় দেখিয়ে আমি তোমায় বিয়ে করেছি।আমি মানছি আমি অন্যায় করেছি।তোমার মুখে এই কথা শোনার চেয়ে আমার নিজেকে শেষ করে দিলেই ভালো হত।

এটা বলে সে ছোঁয়ার বাহু ছেড়ে দিলো।অনুরাগ শক্ত করে ধরাতে ছোঁয়া অনেক ব্যাথা পেয়েছে। তারপর ও সে মুখে কোন শব্দ করেনি চুপচাপ ব্যথা সহ্য করে গেছে।অনুরাগের কথাগুলো শোনে তার মনে অনেকটা কষ্ট হতে লাগল।অনুরাগের যে কথাগুলো বলতে কতটুকু কষ্ট হয়েছে তা ছোঁয়া আজ অনুভব করতে পারছে।

এদিকে অনুরাগ একের পর এক জিনিস মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলছে।আর ছোঁয়া জিনিসের শব্দে কেঁপে কেঁপে উঠছে।সে গিয়ে অনুরাগকে আটকাতে যাবে তার আগেই অনুরাগ একটা কাঁচের গ্লাস তার হাতের মুঠোয় চেপে ধরল।তার হাত থেকে অনবরত গলগল করে রক্ত পরতে লাগল।ছোঁয়া অনুরাগের হাতে রক্ত দেখে পাগল হয়ে দৌড়ে অনুরাগের কাছে গিয়ে তার হাতটা ধরতেই অনুরাগ ঝাড়ি মেরে ছোঁয়ার হাতটা সরিয়ে দিলো।ছোঁয়া আবার তার হাতটা ধরতে গেলেই অনুরাগ তার হাতটা আবার সরিয়ে দিয়ে শক্ত কন্ঠে বলল..

–কারো সিমপ্যাথি আমার চাই না।যেদিন আবার সব অভিমান ভুলে আমার হাতটা ধরতে চাইবে সেদিন নাহয় ধরবে।যদি তার আগে আমি মরে যাই তাহলে আমাকে ক্ষমা করে দিও।

–না..হ…

অনুরাগের মরার কথা শুনে ছোঁয়া জোরে চিৎকার করে উঠল।তারপর দৌড়ে গিয়ে অনুরাগকে জরিয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।কাঁদতে কাঁদতে বলল,আপনি প্লিজ মরার কথা বলবেন না।আপনি মরে গেলে আমি কি করে বাঁচবো। অনুরাগকে ছাড়া ছোঁয়া কীকরে অনুরাগের রঙে নিজেকে রাঙাবে।যা হওয়ার তা হয়ে গেছে।আমি আর পুরনো কোন কথা মনে রাখতে চাইনা। আপনার সাথে আমি আমার জীবনটা নতুন করে শুরু করতে চাই।অনুরাগের রঙে নিজেকে রাঙাতে চাই।

–ছোঁয়ার কথা শোনে অনুরাগ খুশি হয়ে ছোঁয়াকে কোলে নিয়ে ঘুরতে শুরু করে। তার হাত থেকে যে রক্ত পরে ফ্লোর ভেসে যাচ্ছে তাতে তার কোন হুস নেই। সে তো ছোঁয়ার কথায় খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেছে।সে ছোঁয়াকে কোল থেকে নামিয়ে বলে..

–তুমি সত্যি বলছো ছোঁয়া।আরেকবার বলো আমার না বিশ্বাস হচ্ছে না।

–আপনি যা শোনেছেন তা সব সত্যি। এবার চুপচাপ ভদ্র ছেলের মতো এখানে বসেন আমি ফাস্ট এইডস বক্স নিয়ে আসছি।

ছোঁয়া খুব যত্নসহকারে অনুরাগের হাতে বেন্ডেজ করে দিচ্ছে।ছোঁয়া যতক্ষণ অনুরাগের হাতে বেন্ডেজ করে দিছে, ততক্ষন ধরে অনুরাগ ছোঁয়াকে এক মনে দেখে গেছে।বেন্ডেজ করা শেষ হলে ছোঁয়া উঠতে নিলে অনুরাগ ছোঁয়ার হাত ধরে তার বুকের উপর ফেলে দিলো।ছোঁয়া নাক মুখ কুঁচকে অনুরাগকে জিজ্ঞেস করল..

–এটা কি হলো।

অনুরাগ দুষ্ট হেসে বলল,

–কেনো বে-বি তুমিকি ভুলে গেছো আজকে আমাদের বাসর রাত।তোমার কাছে আসতে আমাকে হারামিগুলাকে গুনে গুনে পঞ্চাশ হাজার টাকা দিতে হয়েছে।আসার আগে হারামীগুলো বার বার বলে দিছে বিড়াল যেন ভালো মতো মাড়ি।তো বেবী চলো শুরু করি।

অনুরাগের কথায় ছোঁয়ার গালদুটো লজ্জায় লাল হয়ে গেলো।সে অনুরাগের বুকে কয়েকটা কিল ঘুসি দিয়ে বলে,অসভ্য কোথাকার।তারপর সে তারাতারি অনুরাগের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে দ্রুত একটা শাড়ি নিয়ে ওয়াশরুমে ডুকে ঠাস করে ওয়াশরুমের দরজা বন্ধ করে দেয়।ছো্য়া ওয়াশরুমে ডুকা মাত্র অনুরাগ হু হা করে হেসে দেয়।

মোমবাতির হলদেটে আলোর মাঝে বসে আছে রিয়া।পুরো ঘর জুরে মোমবাতি আর ফুল দিয়ে অসাধারন ভাবে ডেকোরেশন করা।খাটের মাঝে গোলাপের পাঁপড়ি দিয়ে আবির আর ছোঁয়ার নাম দিয়ে লাভ সেইভ আঁকা।আবির আর ছোঁয়ার নাম দেখে প্রথমে রিয়ার খারাপ লাগলে ও পরে সে তার মনকে বুঝায় যে কোন পরিস্থিতিতে তার বিয়েটা হয়েছে।এখানে তো আজকে ছোঁয়ার থাকার কথা ছিল তাই তো ছোঁয়ার নাম লিখা আছে তাতে তার কষ্ট পাওয়ার কোন কারন নেই।নিজের ভালোবাসার মানুসটাকে নিজের করে পেয়েছে এতেই সে খুশি।কয়জনেই বা ভালোবাসার মানুষটিকে নিজের করে পায়।এই দিক দিয়ে সে বড় ভাগ্যবাতী।আবির এখনো রুমে আসে নাই।আবির রুমে এসে খাটের উপর নিজের আর ছোঁয়ার নাম দেখলে নিশ্চয়ই কষ্ট পাবে এই ভেবে রিয়া খাটের ওপরের সব ফুলগুলো একত্রে করে বেলকনি দিয়ে ফেলে দিলো।তারপর সে খাটের উপর গিয়ে বসল।বসে থাকতে থাকতে কখন যে তার চোখ লেগে এসেছিল সে বুঝতেই পারেনি।

দরজার খটখট আওয়াজে তার ঘুম ভেঙে গেলো।চোখ মেলে দেখলো আবির এসেছে। মোবাইলটা হাতে নিয়ে দেখল বারোটা বাজে।আবিরকে দেখে সে গুটিসুটি মেরে বসল।আবির রুমে এসে একপলক রিয়ার দিকে তাকালো।তারপর সে ওয়াশরুমে ডুকে আগে নিজে ফ্রেশ হয়ে আসল। তারপর কার্বাড থেকে একটা গোলাপি কালার শাড়ি রিয়ার হাতে দিয়ে বলল ফ্রেশ হয়ে আসতে।রিয়া ও বাধ্য মেয়ের মতো ফ্রেশ হতে গেলো।

ওয়াশরুমের দরজা খুলার শব্দে আবির সেদিকে তাকালো।দরজার দিকে তাকিয়ে সে সেখানেই থমকে গেলো।গোলাপি কালার শাড়ীতে রিয়াকে সদ্য ফোঁটা গোলাপের মতো লাগছে।আবির নিজের দৃষ্টি রিয়ার দিক থেকে সরিয়ে বলল,

–খাটে এসে বসো তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে।

আবির কি বলবে এটা ভেবেই রিয়ার কলিজার পানি শুকিয়ে যাচ্ছে।আবির তাকে ডিভোর্স দিবে নাতো এসব ভাবতেই সে খাটে গিয়ে বসল।তারপর নিচের দিকে তাকিয়ে বলে..

–বলুন স্যার কী বলবেন।

রিয়ার ভয়ার্ত মুখ দেখে আবিরের অনেক হাসি পেল।সে হাসি আটকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,

–দেখো রিয়া আমাদের বিয়েটা কিন্তু স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে হয়নি।আর পাঁচটা স্বামী স্তীর সর্ম্পের মতো আমাদেরটা না।তাই সম্পর্কটাতে আমাদের একটু সময় দিতে হবে।তুমি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ আমি কি বলতে চাচ্ছি।

আবিরের কথায় রিয়া অবাক চোখে তার দিকে তাকালো।রিয়া ভাবতেই পারছে না আবির এতো সহজে সব মেনে নিবে।আবিরের প্রতি তার সম্মান আরও বেরে গেলো।সে আবিরের দিকে তাকিয়ে বলল..

–হুম বুঝতে পেরেছি।

–গুড! তাহলে তুমি বিচানার ঐ পাশে শুয়ে পর আর আমি এ পাশে।আমি খুব ক্লান্ত এটা বলে সে বিছানার একপাশে শুয়ে পড়ল।রিয়াও রুমের লাইটটা অফ করে আবিরের থেকে বেশ দূরত্ব রেখে শুয়ে পরল।



#চলবে?