হতে পারি বৃষ্টি পর্ব-৩৪+৩৫

0
684

#হতে_পারি_বৃষ্টি
#মোহনা_মিম
#পর্বঃ৩৪

ড্রয়িং রুমে নিরবতা। কারোর মুখে কথা নেই। সোফার এক কোণে বসে আছে সিফাত, তার পাশে বসে আছে মেঘ। তানিয়া দাঁড়িয়ে আছে মেঘের পেছনে। মিসেস রিতা অন্য একটা সোফায় বসে আছেন। মিমি একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে, তার পাশেই রিহা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তাছাড়া আর কেউ বাড়িতে নেই। সকলে অফিসে গিয়েছে। মেঘের ও অফিসে থাকার কথা, কিন্তু তানিয়ার কনসিভ করার পর থেকে সে মাঝে মধ্যে উঁকি দেওয়ার জন্য অফিসে যায়। আর বাকিটা সময় সে বাড়িতেই থাকে। তানিয়া হাজার বলেও তাকে অফিসে পাঠাতে পারে না। মেঘ তাদের রিহা ও সিফাতের সম্পর্কে সবটা বলেছে। তার মনে হলো মিমির অন্তত সব জানা উচিত। তার সব কিছু বলার পর থেকে সবাই চুপ করে আছে। রিহা তো ভয়ে আছে, না জানি তার বোন কি রিয়্যাকশান দেবে! সে ভয়ে ভয়ে বলল–

— আপু! কিছু তো বলো?

মিমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল–

— কি আর বলব রিহু? আমার ছোট্ট বোনটা অনেক বড় হয়ে গিয়েছে। সে এখন কথা গোপন করতে শিখে গিয়েছে। অনেক বড় হয়ে গিয়েছে সে।

রিহার খুব কান্না আসছে। সে বোনের এমন নির্লিপ্ততা মানতে পারছে না। মিমি আর কিছু না বলে উপরে রুমে চলে গেল। রিহা নিরবে চোখের জল ফেলতে লাগল। তানিয়া এগিয়ে এসে তার মাথায় হাত রেখে বলল–

— কাঁদছ কেন পাগলি? তোমার আপু তো একটু এই একটু খানি অভিমান করেছে। তা ছাড়া আর কিছুই না।

সিফাত উঠে দাঁড়িয়ে বলল–

— তুমি চিন্তা কোরো না পিচ্চি। আমি মিমিকে বুঝিয়ে বলছি।

সিফাত মিমির রুমের দিকে অগ্রসর হলো। রিহাও গেল তার পিছু পিছু। মিসেস রিতা উঠে দাঁড়িয়ে বললেন–

— সবাই কিন্তু দুপুরে লাঞ্চ করে তারপর যাবে। আমি রান্নার আয়োজন করছি।

তানিয়া বলল–

— ছোট মা! আমিও আসি?

তানিয়ার কথা শুনে মেঘ আঁতকে উঠে বলল–

— কিহ! একদমই না। তোমাকে না রান্নাঘরে যেতে বারণ করেছি? তাও তুমি চুপি চুপি রান্না ঘরে যাও তাই না? আজ হচ্ছে তোমার!

তানিয়া মুখ ভেংচি কেটে, মুখ গোমড়া করে রাখল। মিসেস রিতা হেসে বললেন–

— থাক তানিয়া! তোমাকে যেতে হবে না। আমি ঠিকই সামলে নেব, তাছাড়া সার্ভেন্ট রা তো আছেই। মিমিও একটু পর চলে আসবে। তুমি তোমার এই পাগলা বরটাকে সামলাও।

তিনি চলে গেলেন। তানিয়া মেঘের দিকে কটমট করে তাকিয়ে বলল–

— একটু রান্না ঘরে গেলে কি হয় মেঘ? আমার মাত্র তিন মাস চলছে। আর তুমি এমন একটা ভাব করছ যেন আজ বাদে কাল আমার ভেলিভারি হবে! ছোট মা কি মনে করল বলো তো?

মেঘ এগিয়ে এসে বলল–

— ছোট মা কিচ্ছুটি মনে করেনি। সে জানে তার ছোট ছেলে কেমন। এখন চলো রেস্ট করবে। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আছো।

তানিয়া মুখ বাঁকিয়ে যেতে নিলেই মেঘ তাকে হেঁচকা টানে কোলে তুলে নিল। বলল–

— আরে ম্যাডাম! আমি থাকতে আপনি হেঁটে হেঁটে রুম প্রর্যন্ত যাবেন! এটা আমি কি করে হতে দিতে পারি?

আশে পাশের দু একজন সার্ভেন্ট তাদের দেখে মিটিমিটি হাসছে। তানিয়া তা দেখে লজ্জা পেল। নিচু কন্ঠে বলল–

— সবাই দেখছে মেঘ। নামাও আমাকে।

মেঘ গলার সুর এনে গেয়ে উঠল–

~দেখুক পাড়া পড়শীতে~
~কেমন মাছ গেঁথেছি বড়শিতে~
~দেখুক পাড়া পড়শীতে~

তানিয়া খিলখিল করে হেসে ওঠে। মেঘ মৃদু হেসে তাকে নিয়ে রুমে চলে গেল।

মিমি মুখটা গম্ভীর করে বিছানায় বসে আছে। বোঝা যাচ্ছে না তার মনের মধ্যে কি চলছে। সিফাত এসে মিমির পাশে বসল। মিমি তা বুঝেও কিছু বলল না। সে এটাও খেয়াল করেছে যে রিহা দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে। সিফাত বলা শুরু করল–

— তুমি আমার ছোট, তাই তুমি করেই বলছি। আমি রিহাকে বড্ড ভালোবাসি। জানি না কীভাবে পিচ্চি মেয়েটা আমার মনের মধ্যে জায়গা করে নিল। আমি ওকে ছাড়া এক মূহূর্ত বেঁচে থাকার কল্পনাও করতে পারি না। আমি জানি ও ছোট। তবে বিশ্বাস করো রিহাকে খুব ভালো রাখব আমি। কোনো অযত্ন হবে না তার। মাথায় করে রাখব আমি আমার পিচ্চি কে।

মিমি সিফাতের কথা শুনে মুগ্ধ হলো। সে মুচকি হেসে বলল–

— আমি জানি। আপনি নিঃসন্দেহে আমার বোনের জন্য উপযুক্ত পাত্র। সে জীবন ঠিক ব্যক্তিকেই পছন্দ করেছে। আমার আপনাদের বিষয়ে কোনো আপত্তি নেই। রিহার এইচএসসি পরীক্ষা হয়ে গেলেই আমি মায়ের সাথে আপনাদের কথা বলব।

— তাহলে ওভাবে চলে এলে যে?

মিমি গলার স্বর উঁচু করে বলল–

— আমি কারোর ওপর রাগ করেছি। এখন সে লুকিয়ে না থেকে সামনে এসে আমার রাগ যেন ভাঙিয়ে দেয়।

রিহা তৎক্ষণাৎ ছুটে এসে মিমির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। শব্দ করে কেঁদে উঠল। সিফাত হেসে বের হয়ে গেল। দুই বোনের মান অভিমানের মাঝে থাকা টা তার ঠিক মনে হলো না। মিমি দু হাতে রিহার মুখ উঁচু করে ধরে মুছিয়ে দিয়ে বলল–

— কাঁদছিস কেন?

— আ আমি ভেবেছি তুমি ক কষ্ট পেয়েছ।

— না রে পাগলি! আমি তো মজা করছিলাম। আর কদিন পর আমার ছোট্ট বোনটার বিয়ে হয়ে যাবে। সত্যিই তুই এতো তাড়াতাড়ি বড় হয়ে গেলি রে রিহু!

রিহা মিমির বুকের মাঝে গুটিসুটি মেরে বসে থাকে। বোনকে সে খুব ভালোবাসে। মিমির গম্ভীর মুখ দেখে এক মুহুর্তের জন্য তার জান বের হয়ে গিয়েছিল।
———-

কাইফের কেবিনে কাইফের সামনে দাঁড়িয়ে আছে মিমি। সে জানে না কাইফ তাকে দাঁড় করিয়ে রেখে কি মজা পায়! তাকে ডাকল, কিন্তু বসতে বলল না। সে এক মনে ল্যাপটপ চালিয়ে যাচ্ছে। মিমি অসহায় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিছুক্ষণ পর হুড়মুড় করে প্রবেশ করল জেসি। বরাবরের মতই সে নক করেনি। মিমি মুখ কুঁচকে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল জেসির ন্যাকামো। জেসি কাইফের পাশে যেয়ে তাকে জড়িয়ে ধরতে গেলেই সে উঠে দাঁড়াল। জেসি হকচকিয়ে গেল। কাইফ গম্ভীর কণ্ঠে বলল–

— জেসি! আমি তোমাকে আগেই বলেছি অফিসে এসব করবে না।

— কিন্তু কাইফ!

— স্টপ! আমার একটা প্রশ্নের উত্তর দাও জেসি। পার্টিতে মিমির জুসে এলকোহল মিশিয়ে ছিল কে?

জেসি ঘাবড়ে গেল। মিমি অবাক হলো। কাইফ জেসিকে এটা জিজ্ঞেস করছে কেন? তানিয়া মিমিকে সব বলেছিল। মিমি বুঝতেই পারেনি তার সাথে কার শত্রুতা? যে এই কাজটা করল। জেসি আমতা আমতা করে বলল–

— আ আমি কীভাবে জানব কাইফ? স্ট্রেঞ্জ!

কাইফ বাঁকা হাসল। জেসি তার হাসি দেখে ভড়কে গেল। কাইফ বলল–

— তুমি আমাকে এতোটা বোকা ভাবো জেসি? কি ভেবেছ তুমি এমন ঘৃণ্য কাজ করবে আর আমি কিছু জানতে পারব না? ইউ আর রং জেসি।

জেসি ধরা পড়ে গিয়েছে। এখন অস্বীকার করেও লাভ নেই। সে জোর গলায় বলল–

— হ্যাঁ, আমি করেছি। তো?

কাইফ ভয়ংকর ভাবে রেগে গেল। ভুল করেছে অথচ তা জোর গলায় বলছে জেসি। কাইফ শক্ত কন্ঠে বলল–

— তুমি এটা ঠিক করোনি জেসি।

— কেন কাইফ? মিমি কে হয় তোমার? ওর কথা এতো ভাবো কেন তুমি? পার্টিতেও দেখলাম ডান্স করলে। বলো? কি সম্পর্ক ওর তোমার সাথে? কোনো অবৈধ সম্পর্ক? আমার আগেই সন্দেহ হয়েছিল, এই মেয়ে একটা ন/ষ্টা মেয়ে। তোমাকে বশ করেছে সে। না জানি কার কার সাথে কত সম্পর্ক আছে!

মিমি হতভম্ব। তাকে নিয়ে তারই স্বামীর সামনে সমান তালে বাজে কথা বলে চলেছে জেসি। চোখের কোণে জল জমলো তার। কাইফ রেগে কষিয়ে থাপ্পড় মারল জেসিকে। চিৎকার করে বলে উঠল–

— এনাফ! যথেষ্ট বলেছ জেসি। খবরদার ওর সম্পর্কে আর একটা কথা তোমার মুখ থেকে বের হলে তোমার জিভ আমি টেনে ছিঁড়ে দেব।

মিমি, জেসি উভয়েই কেঁপে উঠল ভয়ে। কাইফ জেসির হাত শক্ত করে চেপে ধরে কেবিনের বাইরে ছুড়ে ফেলল। জেসি পড়ে যেতে নিয়েও নিজেকে সামলে নিল। কাইফ মিমির হাত ধরে সামনে নিয়ে এসে বলল–

— শী ইজ মাই ওয়াইফ! আমার স্ত্রী হয় মিমি। সবাই কান খুলে শুনে রাখুন কাইফ খানের স্ত্রী মারিশা আহমেদ মিমি। এর পর থেকে তার সম্পর্কে কিছু বলার আগে দশবার ভাববেন সবাই।

জেসির দিকে তাকিয়ে বলল–

— আর তুমি! তোমার মুখ আমি আর কখনও দেখতে চাই না। তুমি আমার স্ত্রীকে নিয়ে বাজে কথা বলেছ, তোমাকে আমি বাঁচিয়ে রেখেছি এটাই তোমার সৌভাগ্য। যাও! এক্ষুনি আমার চোখের সামনে থেকে বেরিয়ে যাও।

পুরো অফিস কাইফের চিৎকারে কেঁপে উঠল। জেসি মিমির দিকে অগ্নি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বের হয়ে গেল। কাইফ শান্ত কন্ঠে বলল–

— সবাই যার যার কাজে যান।

সকলে ধীরে ধীরে চলে গেল। কাইফ মিমিকে নিয়ে পুনরায় নিজের কেবিনে গেল। মিমি হা করে তাকিয়ে আছে। সবটা যেন তার মাথার ওপর দিয়ে গেল। তার কাছে সবটা কেমন যেন স্বপ্নের মতো লাগছে। সে অবাক কন্ঠে বলল–

— এসব কি হলো মিস্টার খান?

কাইফ বিরক্ত হলো। মিমি সবটা দেখল তবুও জিজ্ঞেস করছে কেন? সে গম্ভীর কণ্ঠে বলল–

— মিমি! তুমি কি জানো এখন আমি প্রচুর রেগে আছি?

মিমি মাথা উপর নিচে নাড়ায়। যার অর্থ সে জানে। কাইফ আবারও বলল–

— তোমার স্বামী রেগে আছে। এখন তোমার কি করনীয়? নিশ্চয়ই তার রাগ কমানো?

মিমি আবারও মাথা নাড়ায়। কাইফ সোফাতে বসে বলল–

— তো এখন আমার রাগ কমাও। কীভাবে কমাবে আমি জানি না। দ্রুত করো।

মিমি এখন কি করবে? সে তো রাগ কমাতে পারে না। সে কাচুমাচু হয়ে বলল–

— কিন্তু আমি তো জানি না কীভাবে আপনার রাগ কমবে।

কাইফ তাকে ইশারায় নিজের কাছে ডাকল। মিমি গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গেল। কাইফ তাকে হেঁচকা টানে নিজের কোলে বসিয়ে নিল। মিমি চমকে উঠে যেতে নিলেই কাইফ তার কোমর চেপে ধরল। মিমি অস্বস্তিতে জড়সড় হয়ে বলল–

— কি করছেন মিস্টার খান?

— রাগ কমাচ্ছি।

বলেই সে মিমির গালে নিজের ঠোঁট ঠেসে ধরল। মিমির সর্বাঙ্গ শিরশির করে উঠল। হৃদস্পন্দন দ্রুত বেগে ছুটতে লাগল। সে চোখ বন্ধ করে কাইফের শার্টের কলার মুঠো করে ধরল। কাইফ তাকে ছেড়ে দিয়ে উঠতে উঠতে বলল–

— বুঝেছ কীভাবে আমার রাগ কমাতে হবে? পরের বার যেন দেখিয়ে দেওয়া না লাগে। তবে দেখিয়ে দিতে হলেও আমি খুবই আনন্দিত হবো।

সে নিজের চেয়ারে বসে কাজে মগ্ন হয়ে পড়ল। ভাবটা এমন যেন কিছুই হয়নি। এদিকে মিমির অবস্থা খারাপ। কাইফ এই প্রথম তার গালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিয়েছে। মিমির দম বন্ধ অনুভূতি লাগছে। সে তৎক্ষণাৎ কেবিন থেকে ছুটে বের হয়ে গেল। আর কিছুক্ষণ কাইফের সামনে থাকলে সে দম বন্ধ হয়ে মরেই যেতো। কাইফ মিমির যাওয়ার পথে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসে।

চলবে?

#হতে_পারি_বৃষ্টি
#মোহনা_মিম
#পর্বঃ৩৫

সুন্দর একটা দিন। পরিষ্কার আকাশ, বৃষ্টি হবার সম্ভাবনা একেবারেই নেই। বয়স্ক রিকশা ওয়ালা নিজের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে রিকশা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। মিমি আশে পাশে তাকিয়ে ব্যস্ত নগরী দেখে চলেছে। আজ সে ভার্সিটিতে যাচ্ছে। অনেক দিন পর যাচ্ছে বলা যায়। তাকে কিছু নোট নিতে হবে। অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা টা দিতে চায় সে। এতে অবশ্য কাইফের কোনো আপত্তি নেই। সে কাইফের অনুমতি নিয়েই আজ ভার্সিটিতে যাচ্ছে। আশে পাশে দেখতে দেখতেই মিমির চোখ পড়ল কিছু লোকের দিকে। কিছু গুন্ডা টাইপের লোক একটা বয়স্ক রিকশা ওয়ালা কে মারধর করছে। মিমি লোকটার ওপর মায়া হলো, তেমনই রাগ হলো লোক গুলোর ওপর। মিমি বলে উঠল–

— রিকশা থামান চাচা।

রিকশা চালক রিকশা থামিয়ে দিল। মিমি রিকশায় ব্যাগ রেখে বলল–

— আপনি একটু দাঁড়ান আমি আসছি।

মিমি এগিয়ে গেল লোক গুলোর দিকে। লোক গুলো রিকশা ওয়ালা কে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করছে। পুনরায় তার ওপর হাত ওঠাতে গেলে মিমি তা ধরে ফেলল। হাতটা ঝাঁকা দিয়ে ফেলে দিয়ে মিমি রেগে চেঁচিয়ে উঠল–

— কি হচ্ছে এখানে?

লিডার লোকটা তাকায় তার দিকে। মিমির পা থেকে মাথা পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করে বলল–

— কি সমস্যা?

মিমি ক্রুদ্ধ কন্ঠে বলল–

— আপনারা ওনার গায়ে হাত তুলছেন কেন? বয়স্ক একটা লোকের গায়ে এভাবে হাত তোলেন! লজ্জা করে না?

লোকটা শক্ত কন্ঠে বলল–

— দেখ তুই তোর কাজে যা। আমাদের কাজ করতে দে। মেয়ে মানুষ এসবের মধ্যে আসিস না। যা!

— না। আমি যাবো না। আপনি ক্ষমা চান ওনার কাছে। বাবার বয়সী একটা লোকের সাথে এমন ব্যবহার করছেন!

লিডারের চ্যালা গুলো বড় বড় চোখ করে তাকায় মিমির দিকে। অতঃপর সবাই খ্যাক খ্যাক করে হেসে ওঠে। লিডার লোকটা বলল–

— ওরে তোরা শুনলি! মা/লটা কি বলে? আমি নাকি এই বুড়োর কাছে মাফ চাইবো!

উচ্চ স্বরে হাসে সবাই। লোকগুলো আরও অনেক রকম কথা বলল। লিডার লোকটা বলল–

— তোর দেখছি ভারি তেজ! এখন যদি তোর গায়ে হাত দিই তাহলে কি করবি তুই?

বলেই সে মিমির দিকে হাত বাড়ায়। মিমির গা ঘিন ঘিন করে ওঠে। হাতটা তাকে স্পর্শ করার পূর্বেই সে গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে লোকটাকে থাপ্পড় মারে। সকলে হতভম্ব হয়ে যায়। লোকটা গালে হাত দিয়ে অগ্নি দৃষ্টিতে তার দিকে তাকায়। মিমি শক্ত কন্ঠে বলল–

— দেখে নিয়েছেন? আমি কি করতে পারি?

তারপর সে নমর গলায় রিকশা ওয়ালা কে বলল–

— আপনি চলে যান চাচা।

রিকশা ওয়ালা চলে গেল। মিমি আর কোনো দিকে না তাকিয়ে তার বরাদ্দকৃত রিকশায় উঠে বসে। রিকশা চালক দ্রুত রিকশা এগিয়ে নিয়ে যায়। মিমির মাথা গরম হয়ে গিয়েছে। সে জোরে জোরে শ্বাস ফেলে নিজেকে শান্ত করল। এক পর্যায়ে রিকশা চালক বললেন–

— কাম ডা তুমি ঠিক করলা না মা। তারা ভালা মানুষ না। আমাগো কাছ থেইকা চাঁদা তোলে। যদি কেউ দিবার না চায় তাইলে তারে ধইরা মারে আর গালিগালাজ করে। তুমি আজ যেইডা করলা এতে আমি খুশি। তয় তারা তোমার ক্ষতি কইরা দিবো গো মা।

মিমি ভয় পেল না বরং রিকশা চালকের চিন্তা দেখে মৃদু হাসল। বলল–

— আপনি চিন্তা করবেন না চাচা। তারা আমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।

— তোমার জন্য দুয়া করি গো মা।

রিকশা চালকের আদুরে গলার কথা গুলো মিমির খুব ভালো লাগে। সে চোখ বুজে ভার্সিটিতে পৌঁছাবার অপেক্ষা করে।
——–

ভার্সিটিতে নোট নেওয়ার কাজ শেষ মিমির। এই এক নোট দিয়ে তানিয়া আর সে একসাথে পড়তে পারবে। এক বাড়িতে থেকে ভালোই হয়েছে। গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে মিমি কোনো রিকশার দেখা পেল না। সময়টা দুপুর এখন কোনো রিকশা না পাওয়াটাই স্বাভাবিক। মিমি আর না দাঁড়িয়ে হাঁটা ধরল। যদি কোনো রিকশা পাওয়া যায়! কিছুক্ষণ হাঁটতে হাঁটতে মিমির পথ আগলে দাঁড়াল একটা গাড়ি। মিমি ভয়ে দু কদম পিছিয়ে গেল। গাড়ি থেকে নেমে এলো তখন কার সেই গুন্ডা দলের লিডার। মিমির দিকে তাকিয়ে বিশ্রী হেসে নিজের গালে হাত বুলিয়ে বলল–

— আমাকে চড় মেরেছিলি না? এবার দেখবি এই চড়ের শোধ আমি কিভাবে তুলি।

সে মিমির হাত চেপে ধরল। মিমি চিৎকার করে উঠল। কিন্তু আশে পাশে কেউ নেই। মিমির মনে পড়ে গেল সেদিনের কথা! অল্পের জন্য বেঁচে গিয়েছিল। এবার কি আর নিস্তার নেই? মিমি তার হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করল কিন্তু পুরুষালী শক্তির সাথে পেরে উঠল না। লোকটা টেনে হিচড়ে তাকে গাড়িতে তুলল। গাড়ি এগিয়ে চলল। মিমি শব্দ করে কেঁদে উঠল। ছেড়ে দেওয়া আকুতি করতে লাগল। তারা শুনল না। গাড়ি কিছুদূর এগোতেই সামনে একটা কালো কুচকুচে গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল। যেটা রাস্তা আটকে দাঁড়িয়ে আছে। হর্ন বাজিয়েও কাজ হলো না, গাড়ি সরলো না। লিডার লোকটা তার এক চ্যালাকে বলল–

— এই যা তো! দেখে আয় কোন মাতাল এভাবে রাস্তা আটকে রেখেছে।

চ্যালা নেমে গেল। গাড়ির দিকে এগিয়ে যেতেই পালোয়ানের মতো দেখতে সুট বুট গায়ে দুটো লোক বের হয়ে আসলো সামনে থেকে। রোগা পাতলা চ্যালা তাদের দেখে ভয়েই কাত। দ্রুত কদমে পিছিয়ে গেল সে। গার্ড দুটোর একজন গাড়ির পেছনের দরজা খুলে দিল। রাজকীয় ভাবে বের হয়ে আসলো ব্যক্তিটি, যার দেহ সম্পূর্ণ কালোতে আবৃত। ইতোমধ্যে মিমির কান্না থেমে গিয়েছে, সে অবাক হয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে। লোকটাকে কেমন চেনা চেনা মনে হলো। মস্তিষ্কে চাপ প্রয়োগ করতেই মনে পড়ল তাকে সেই নর পশুর হাত থেকে এই লোকটায় তাকে বাঁচিয়েছিল। হ্যাঁ! ব্যক্তিটি কিং নামে পরিচিত। কিং গম্ভীর কণ্ঠে আদেশ বাণী ছুঁড়ল–

— গার্ডস্! যাও লিডারকে আমার সামনে নিয়ে এসো। অবশ্যই টেনে হিচড়ে আনবে।

লোক দুটো এগিয়ে গেল। লিডার সহ দলের সদস্য সংখ্যা চার। গাড়ির দরজা খুলে শক্ত হাতে লিডারের কলার চেপে ধরল একজন। এক টানে গাড়ির বাইরে এনে দাঁড় করাল। কিং এর কথা মতো তাকে রাস্তায় শুইয়ে দিয়ে টানতে টানতে নিয়ে গেল কিং এর পায়ের কাছে। রাস্তায় টানার ফলে হাত পায়ের চামড়া উঠে গেল তার। মিমি নিরব দর্শক। সে চুপ করে বসে দেখছে। কিং দুজনকে ধমকে উঠে বলল–

— এতো আস্তে কেউ টানে? এই শিখেছ তোমরা? পুনরায় ট্রেনিং এ অংশ নেবে। এবার একে দাঁড় করাও। দেখি কতটা সাহস এর।

গার্ড দুটো তাই করল। কিং তার কলারে হাত দিয়ে সোজা করে দিয়ে বলল–

— চাঁদাবাজি করে কি বোঝাতে চাস? তুই খুব বড় মস্তান?

লিডারের গলা শুকিয়ে এলো। এর কাজ দেখে মনে হচ্ছে এ সাধারণ কেউ নয়। সে তোতলাতে তোতলাতে বলল–

— ক কে আপনি?

কিং হাসে। যেটা লিডারটা তার চোখ দেখেই বোঝে। কিং শীতল গলায় বলল–

— কিং!

গলা দ্বিগুণ শুকিয়ে গেল তার। কিং! এর সম্পর্কে অনেক কিছু শুনেছে সে। খারাপ কাজ করা লোকজন কিং এর হাত থেকে বাঁচতে পারে না। সে ভীতু কন্ঠে বলল–

— আমাকে ছেড়ে দিন।

কিং গার্ড দুটোর দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্য করে বলল–

— এর দেখি সব হাওয়া ফুশ! একটা মেয়েকে ধরে আনার সময় তার মধ্যে যদি এই ভয়টা কাজ করত! তাহলে আজ বেচারাকে কিং এর সামনে আসতে হতো না।

কিং তার লোকদের আদেশ করল–

— এর চ্যালা গুলোকে গাড়ি থেকে নামিয়ে আনো।

তারা তাই করল। চ্যালা গুলো অবশ্য পালানোর চেষ্টা করেছিল। তবে তারা পারেনি। কিং পুনরায় গম্ভীর কণ্ঠে বলল–

— এই লিডার এর একটা হাত ভেঙে দাও। যে হাত দিয়ে তাকে স্পর্শ করেছে। আর চ্যালা গুলোকে একটু উত্তম মধ্যম দিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করে দাও। আর হ্যাঁ! ম্যাডামকে সুস্থ ভাবে বাড়িতে পৌঁছে দাও।

বলে সে গাড়িতে উঠে বসে। এই গাড়ির পেছনে আরও একটা গাড়ি ছিল। সেখান থেকে আরও দুজন গার্ড দৌড়ে এসে গাড়িতে বসে শা শা করে ধুলো উড়িয়ে চলে যায়। গার্ড দুটো কিং এর কথা মতো কাজ খুব দ্রুতই সেরে ফেলে। কেননা এগুলো তাদের কাছে দুধ ভাত এবং খুবই আনন্দের কাজ। মিমি চোখ বড় বড় করে মুখে হাত চেপে তাদের মারধর করা দেখছে। যখন লিডারের হাতটা ভেঙে দিল, তখন সে চিৎকার করে উঠল। সেই চিৎকারে মিমির আত্মা লাফিয়ে উঠল। কাজ শেষে তারা মিমির অবস্থানরত গাড়ির দরজা খুলে বিনয়ের সাথে বলল–

— নেমে আসুন ম্যাডাম। আপনাকে বাড়িতে পৌঁছে দিচ্ছি।

মিমির চোখে মুখে অবাকতার রেশ কাটছে না। সে গাড়ি থেকে নেমে এলো। গার্ড দের একজন তাদের গাড়ির দরজা খুলে দিল। মিমি বসে গেল। বিস্ময়ে হতবাক হয়ে বলল–

— এদের হাসপাতালে ভর্তি করবেন না? এভাবে পড়ে থাকবে এখানে?

— না ম্যাডাম! আমাদের লোকেরা এসে এদের নিয়ে যাবে।

অতিরিক্ত কৌতুহলে হাঁসফাঁস করছে মিমি। সে জিজ্ঞেস করল–

— কারা আপনারা? ওই মুখোস ধারী লোকটাই বা কে ছিল? আর আমাকেই কেন বাঁচালেন আপনারা?

গার্ড দুটো গাড়িতে বসে গাড়ি স্টার্ট দিল। গাড়ি চালাতে চালাতে একজন বলল–

— ওই লোকটা কিং ছিল ম্যাডাম। উনি সবাইকেই সাহায্য করেন, তাই আপনাকেও করেছেন। আর এর বেশি কিছু আপনাকে বলার অনুমতি নেই।

মিমির বলার কিছু থাকলো না। কেন যেন তাকে সাহায্য করার ব্যাপারটা তার কাছে অন্য রকম লাগল। মিমি চুপ করে থাকল। গাড়িটা খান ম্যানসন থেকে কিছুটা দুরে তাকে নামিয়ে দিয়ে চলে গেল। এমনকি তাকে সেই ব্যাগটাও ফিরিয়ে দিল যেটা মিমি রাস্তায় ফেলে দিয়ে এসেছিল। বাড়ির লোক চিন্তা করবে বলে মিমি কাউকে কিচ্ছু জানাল না। নিজের মধ্যে চেপে রাখল কিং নামক মানুষ টার সম্পর্কে আকাশ চুম্বি কৌতুহল।

চলবে?