মেঘের ওপারে পর্ব-০৪

0
364

#মেঘের_ওপারে
#পর্ব:৪
#অন্তরা_দেবযানী

নিশির সাথে ক্যান্টিনে বসে আছে অদ্রি।নিশি অদ্রির নতুন বান্ধবী। অদ্রিদের পাশাপাশি বসে আছে শ্রেয়ান,রিদ্ধি আর তাদের কিছু ফ্রেন্ড। অদ্রি প্রথম প্রথম আড় চোখে তাকালেও এখন আর তাকাচ্ছে না।
হঠাৎ রাজ এসে অদ্রির পাশে বসে পড়ল।বলে,অদ্রিজা!কেমন আছ?

অদ্রি বিরবির করে বলে, বিরক্তিকর।
মুখে ভদ্রতামূলক হাসি ফুটিয়ে বলে, ভালো।

অদ্রিকে অবাক করে দিয়ে রাজ অদ্রির দিকে একটু ঝুঁকে বলে, কি!শ্রেয়ান পাত্তা দেয় না?

অদ্রি রেগে যায়। দাঁতে দাঁত চেপে বলে,ওটা আমার পার্সোনাল ব্যাপার।আপনাকে ভাবতে হবে না।
— সেটা তো অবশ্যই।তোমার পার্সোনাল ব্যাপার নিয়ে আমি কেন চিন্তা করব? তা,,,,,রিদ্ধিকে চিনো?
— না চিনার কি আছে! অদ্ভুত।ওরা ফ্রেন্ড।
— উহুম! শুধু ফ্রেন্ড না।তার চেয়েও বেশি কিছু।
— তো আমি কি করব! দাঁতে দাঁত চেপে বলে অদ্রি।
অদ্রি আবারও বলে, আপনি এসব কথা আমাকে কেন বলছেন? যত্তসব!
অদ্রি রেগে উঠে যায়। সাথে নিশাও। অদ্রি চলে গেলে সে আর একা থেকে কি করবে।রিদ্ধিদের পাশ কেটে যাওয়ার সময় রিদ্ধি বাকা হেসে অদ্রির সামনে পা বাড়িয়ে দিল। সামনের দিকে তাকিয়ে হাঁটার কারনে অদ্রি রিদ্ধির পা খেয়াল করেনি।রিদ্ধির পায়ের সাথে পা লেগে ধপ করে নিচে পরে যায় অদ্রি। ব্যথায় কুঁকড়ে উঠে।

হঠাৎ কারো পরার আওয়াজে ক্যান্টিনের সবাই অদ্রির দিকে তাকায়। অনেকে ইতোমধ্যেই হেসে দিয়েছে।
অদ্রির চোখ ফেটে কান্না আসছে। অদ্রি উঠতে গিয়েও পড়ে যায়। অদ্রি অসহায় মুখ করে শ্রেয়ানের দিকে তাকায়।শ্রেয়ানও অবাক দৃষ্টিতে অদ্রির দিকে তাকিয়ে আছে।হয়ত সেও ভাবছে অদ্রি কি করে পড়ে গেল।
অদ্রি কোনো রকমে উঠে দাঁড়ায়।রিদ্ধির সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। রেগে বলে, তুমি আমাকে ইচ্ছে করে ফেলে দিয়েছো,তাই না?
রিদ্ধি অদ্রিকে দেখেও না দেখার ভান করে রইল।
অদ্রির বেশ রাগ হলো।
শ্রেয়ানের কাছে গিয়ে দাঁড়ায়।
শ্রেয়ান ভ্রু কুঁচকে তাকায় অদ্রির দিকে। কিছু বুঝতে পারছে না।
অদ্রি রেগে গিয়ে বলে,এই যে মিস্টার শ্রেয়ান রেজওয়ান! আপনার গার্লফ্রেন্ডের পাগুলো বেশি বড় হয়ে গেছে।কেটে ছোট করার ব্যবস্থা করুন।নয়ত পরেরবার হাঁটার সময় পা সামনে এলে পাড়া দিয়ে ভেঙ্গে দিব।বলে দেবেন ওনাকে।
শ্রেয়ানের ফ্রেন্ডরা শব্দ করে হেসে উঠে। অদ্রি তাদের দিকে এক পলক তাকায়। বুঝতে পারছে না এরা হাসছে কেন?সে কি কোনো হাসার কথা বলেছে?
অদ্রি গটগট করে চলে গেল।

এদিকে সবকিছু যেন শ্রেয়ানের মাথার উপর দিয়ে গেল।কিছুই বুঝলো না। শুধু বুঝেছে অদ্রির পরে যাওয়ার কারণ রিদ্ধি। কিন্তু বাকিটা! অদ্রি তাকে নাম ধরে ডাকছে।তার উপর আপনি! তাছাড়া রিদ্ধির কথা কেন তাকে বলছে?

শ্রেয়ান রিদ্ধির দিকে তাকায়। খানিকটা রেগে গিয়ে বলে,কি ব্যাপার রিদ্ধি!এটা কি হলো?

পাশ থেকে রাজ বলে উঠে,কি হলো সেটা কথা না।কথা হলো অদ্রি আমার হবু বউকে তোর গার্লফ্রেন্ড বানিয়ে দিল।হায়রে,কি কপাল আমার!
শ্রেয়ান রাজের দিকে এক পলক তাকিয়ে রিদ্ধির দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাল।
রিদ্ধি আমতা আমতা করে বলে,ও তোকে ডিস্টার্ব করে তাই।
— কিন্তু এখন তো ও আমাকে ডিস্টার্ব তো দূর কথাও বলে না। সেদিনও তুই ওকে ধাক্কা দিয়েছিলি, কিছু বলিনি বলে আজও দিবি?
— ওই মেয়েটার জন্য তুই আমাকে এভাবে বকলি!
— তোর কাজটা করা উচিত হয়নি।
— তুই ঐ মেয়েটার হয়ে কথা বলছিস?

পাশ থেকে রাজ বলে,বলবে নাহ্! দেখতে হবে তো শ্রেয়ানের কি হয় অদ্রি!

— আজ কাল তোকে মোটেও সুবিধার লাগে না।শ্রেয়ান বাকা চোখে তাকায়।
রাজ মুখটা ইনোসেন্ট করে। বলে,যাক বাবা!আমি অসুবিধার কি করলাম?

শ্রেয়ান রাজের কথার তোয়াক্কা না করে উঠে চলে গেল।
শ্রেয়ান যেতেই রিদ্ধি দাঁড়িয়ে যায়। দ্রুত হেঁটে রাজের সামনে গিয়ে কলার চেপে ধরে। দাঁতে দাঁত চেপে বলে,যা হয়েছে তোর জন্য হয়েছে!

রাজ আমতা আমতা করে বলে,আমি কি করেছি?
— কিছু করিসনি,তাই না!আমাকে চোখ মেরেছিস কেন?
— আজব! আমার চোখ মারার মানে হলো অদ্রিকে জ্বালাবি। ফেলে দিবি নয়।সবসময় দেড় লাইন বেশি বুঝে কাজ করে।
— কেন রে তোর মুখ নাই? মুখে বলতে পারলি না। রেগে গিয়ে বলে রিদ্ধি।
রাজ অসহায় মুখ করে রিদ্ধির দিকে তাকায়।বলে,এখন সব দোষ আমার।
রাজ আবারও বলে,কলারটা তো ছাড়। বিয়ের আগেই মারবি নাকি।
রিদ্ধি রেগে কিছু বলতে যায়।তার আগেই রাজ তাকে থামিয়ে বলে,জানি!বলা লাগবে না।এখন বলবি, করব না আমি তোকে বিয়ে।গত এক বছরে ডায়লগটা মুখস্থ হয়ে গেছে।
রিদ্ধি কলার ছেড়ে দেয়।রাগে মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে রাখে।

☆☆☆

ক্যান্টিনের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে অদ্রি। জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে।হাত দুটো দিয়ে মুখ ঢেকে রেখেছে। এই প্রথম শ্রেয়ানের সাথে এভাবে কথা বলেছে।শ্রেয়ানের নাম ধরে ডেকেছে। সাথে আপনি তো আছেই।
অদ্রির মনে হলো তার সামনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। কে দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে? শ্রেয়ান?হয়ত শ্রেয়ান। আচ্ছা!শ্রেয়ান কি তাকে এখন বকবে এভাবে তার সাথে কথা বলার জন্য?

অদ্রি চোখের সামনে থেকে হাত সরিয়ে নেয়। তাকিয়ে দেখে, শ্রেয়ান!শ্রেয়ানই তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। অদ্রি শ্রেয়ানের দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নেয়। উল্টোদিকে ঘুরে দাঁড়ায়। গালগুলো লজ্জায় লাল হয়ে গেছে।

চোখ বন্ধ করে ছোট ছোট কয়েকটা নিঃশ্বাস নিয়ে আবারও শ্রেয়ানের দিকে ঘুরে দাঁড়ায়। শক্ত কন্ঠে বলে, বলেছেন?
শ্রেয়ান কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে অদ্রির দিকে। অদ্রির ভীষণ অস্বস্থি হচ্ছে এতে। নিচের দিকে তাকিয়ে আছে।
শ্রেয়ান মুখ টিপে হাসে। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে তীক্ষ্ণ কন্ঠে বলে, কেন রে তোর মুখ নেই? আমি কেন বলব? আমি কি রিদ্ধির গার্ডিয়ান নাকি আমার কাছে রিদ্ধির নামে বিচার দিস?

অদ্রি বোকা বনে গেল।কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না।
শ্রেয়ান বাকা হেসে চলে গেল।

☆☆☆

ঘড়ির কাটায় চারটা বেজে দশ মিনিট।ঘুমে চোখ বন্ধ হয়ে আসছে অদ্রির।তাও টেবিলে বসে আছে সে। অনেকগুলো হোম টাস্ক বাকি আছে।
হঠাৎ ফোন বেজে উঠল।আয়ান ফোন করেছে।
অদ্রি ফোন রিসিভ করে।
ওপাশ থেকে আয়ান বলে উঠে, অদ্রি! শ্রেয়া আম্মুকে তোর কথা বলে দিয়েছে।
— কীহ!বড় আম্মুকে বলে দিয়েছে? অদ্রি ঘাবড়ে যায়।
— আরে অদ্রি রিল্যাক্স!
— বড় আম্মু নিশ্চয়ই তোমাকে খুব বকেছে?
— উহুম! আম্মু তোকে বাড়ি নিয়ে আসতে বলেছে।
অদ্রি অবাক হয়।বলে,বড় আম্মু আমাকে নিয়ে যেতে বলেছে! কিন্তু বড় আম্মু তো আমাকে সহ্য করতে পারে না।
— জানি না আম্মুর কি হয়েছে!তবে আম্মু আমাকে ফোর্স করছে তোকে আনার জন্য।আর খুব কাঁদছে।
— বড় আম্মু হঠাৎ এতটা বদলে গেল?
— হুম!তোকে নিয়ে যাব। আচ্ছা ওসব কথা বাদ দে।কেমন আছিস বল?
— পায়ের ব্যথা বেড়েছে।ব্যথা পেয়েছি।
আয়ান চিন্তিত হয়ে পড়ে। বলে, কিভাবে?
— পড়ে গেছি।
— কিভাবে? আচ্ছা সে কথা বাদ দে,পেইন কিলার খেয়েছিস?
— উহুম! খাইনি।
— ফোন রাখ। তাড়াতাড়ি খেয়ে নে।
— হুম।
অদ্রি ফোন কেটে দেয়। বুঝতে পারছে না হঠাৎ বড় আম্মু এত ভালো হয়ে গেল কেন?তার উপর আবার তার জন্য কাঁদছে! কিছু মাথায় ঢুকছে না তার।প্রচন্ড ঘুম আসছে।এই মুহূর্তে একটু ঘুমিয়ে নিলে হয়ত ভালো হবে। রাতে নাহয় হোম টাস্কগুলো শেষ করে নিবে। অদ্রি গিয়ে শুয়ে পড়ল।সেই সাথে ছয়টা বাজে এলার্ম দিয়ে রাখলো।

☆☆☆

চোখে তীব্র আলোর ঝলকানিতে অদ্রির ঘুম ভেঙ্গে গেল। ধীরে ধীরে চোখগুলো খুলল।মনে হচ্ছে যেন অনেক দিন পর চোখ খুলেছে। মাথাটা বেশ ঝিমঝিম করছে। খানিকটা ব্যথাও করছে।
অদ্রি উঠে বসে।দেখে, আয়ান অত্যন্ত ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
অদ্রি সে দৃষ্টির মানে বুঝলো না। চারিদিকে চোখ বুলিয়ে নিল। জানালার দিকে তাকাতেই অদ্রি অবাক হয়। তীব্র রোদ এসে রুমটা আলোকিত করে তুললো।আর সে নিজের রুমে শুয়ে আছে। মাথার কাছে তার বড় আম্মু বসে আছে চিন্তিত হয়ে। কিন্তু সেতো হোস্টেলে ছিল তাহলে এখানে কি করে এলো!
আয়ান দৌড়ে এসে জিজ্ঞেস করে, তুই ঠিক আছিস?

অদ্রির বুক ধক করে উঠল।সে ঠিক আছে কিনা!এটা কোনো প্রশ্ন হলো?কি হয়েছে তার?
আর এখন তো সন্ধ্যা হওয়ার কথা তাহলে চারিদিকে এত আলো কেন?

অদ্রি বলে, আমি ঠিক আছি। কিন্তু,,,,,
আয়ান যেন হাফ ছেড়ে বাঁচল।বলে,ওহ্!আমি তো খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।
— কেন?
অদ্রি কিছু একটা ভেবে তাড়াতাড়ি ফোন হাতে নিল। আয়ানের অনেকগুলো মিসড কল।আর ঘড়ির কাঁটায় তিনটা বেজে বারো মিনিট।সে তো চারটার দিক করে ঘুমিয়ে ছিল।তবে কি সময় পিছিয়ে গেল!সে স্বপ্ন দেখছে না তো এসব!

অদ্রি তাড়াতাড়ি তারিখটা দেখে নিল।সব যেন তার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। এসবের মানে কি?তার মানে সে পুরো একটা দিন ঘুমালো!

চলবে,