একটি জটিল প্রেমের গল্প পর্ব-০৫

0
259

#একটি_জটিল_প্রেমের_গল্প
ভাগ-৫
সুমাইয়া আমান নিতু

সেদিন আফ্রিতার কাছ থেকে মোটামুটি অপমান হয়ে ফেরার পরেও আমার শিক্ষা হলো না। ওইযে বলে না, ‘প্রেমের মরা জলে ডোবে না’। আমারও হয়েছে তাই। আফ্রিতা যখন বলল আমার ব্যক্তিত্ব বলে কিছু নেই, তখন খুব রাগ হয়েছিল। বাসায় ফিরেছিলাম গরম মাথা নিয়ে। কিন্তু খাবার আর আফ্রিতা এই দুটো জিনিস যেমন মাথা গরম করতে পারে, তেমনই ঠান্ডাও করতে পারে। ছোট ভাই তৌহিদ অনলাইন বিজনেস থেকে প্রথমবার ইনকাম করেছে। নান রুটি আর আস্ত তিনটা মুরগি এনেছে। আমি খেতে পছন্দ করি দেখে একটা মুরগি আমার। আরামসে পেটভর খেয়েদেয়ে বিছানায় শুতেই আফ্রিতার মুখটা ভেসে উঠল।

কী নিষ্পাপ মুখ! চোখদুটো মায়া মায়া, মাঝে মাঝে কাজল দেয়, আজও কাজল পরা ছিল, ঠোঁটে হালকা গোলাপি লিপগ্লস ছিল, আর বেবি পিংক কুর্তিতে…উফ আর ভাবতে চাই না। আমি টেবিল থেকে একটা বই টেনে নিলাম। সেদিন কী মনে করে একটা বাংলা বই লাইব্রেরি থেকে নিয়ে এসেছিলাম। বইটার নাম ‘বরফ গলা নদী’। লেখক জহির রায়হান। বাংলা সাহিত্যের সাথে যোগাযোগ আমার আজন্মেও ছিল না। স্কুল কলেজে বাংলায় পাশ করার জন্য যতটুকু পড়তে হতো তার বাইরে এক শব্দও পড়ার প্রয়োজন বোধ করিনি। এই প্রথম শক্ত মলাটের গল্পের বই হাতে পড়ল। পড়তে শুরু করে বেশ ভালোই লাগতে লাগল। মধ্যবিত্ত সাদামাটা জীবনের গল্প। লিলি, মাহমুদ, মরিয়ম, হাসিনা…ডুবে গেলাম একেবারে।

বই শেষ করে এদের নিয়ে ভাবতে ভাবতে ঘুম। ঘুম ভাঙল তিন্নির ডাকে। তিন্নি আমার ছোট বোন, পড়ে ক্লাস টেনে। আমার হাতে গল্পের বই দেখে সেটা টেনে নিয়ে নিল, তারপর এক ছুটে বাইরে গিয়ে ঘোষণা করল, “বড় ভাইয়া গল্পের বই পড়ছে! শোনো শোনো শোনো!”

তৌহিদ অনেক বই পড়ে, তিন্নিও শিখেছে। শুধু আমিই পড়তাম না, হাজার বলেও পড়াতে পারেনি ওরা। তৌহিদ এসে বলল, “ভাইয়া ঘটনা কী বলোতো? ক্লাসে কোনো এসাইনমেন্ট দিয়েছে?”

আমি কী বলব ভাবছিলাম। তৌহিদ নিজেই আমাকে বাঁচিয়ে দিল। বললাম, “হ্যাঁ।”

পরদিন ক্লাসে গিয়ে বার বার মনে হতে লাগল একবার যাই আফ্রিতার ডিপার্টমেন্টে। কিন্তু শেষে গেলাম না। গেলেই হয়তো জিজ্ঞেস করবে, “নিজের কোনো গুণ খুঁজে পেয়েছিস?”

তবে ক্যান্টিনে কয়েকবার যাওয়া হলো। আফ্রিতার দেখা নেই। ক্লাস শেষে বিকেলের দিকে লাইব্রেরিতে গিয়ে অগত্যা মহামানবীর দেখা পেলাম। একটা বই নিয়ে এমন জায়গায় গিয়ে বসলাম যেখান থেকে সরাসরি ওকে দেখা যায়। ও ও আমাকে দেখল, কিন্তু এমন ভাব করল যেন কোনোদিন দেখেনি, চেনা তো বহু দূরের কথা!

এরকম প্রতিদিন হতে থাকল। আমার জীবনযাত্রাও খানিক বদলে গেল। যেই আমি ক্লাসে যেতেই চাইতাম না, ট্যুর বা ছুটির গন্ধ পেলে সবার আগে লাফিয়ে উঠতাম, সেই আমি প্রতিদিন ক্লাসে যাই। ক্লাস শেষে নিয়ম করে লাইব্রেরিতে বসি। আফ্রিতাকে দেখার পাশাপাশি কিছু বইপত্রও পড়া হয় বটে!

কেন যেন মনে হলো আফ্রিতাও আমায় খানিকটা ছাড় দেয়। এইযে প্রতিদিন ওর জন্য বসে থাকি, চেয়ে থাকি একদৃষ্টিতে, কখনো বিরক্ত হয়ে কিছু বলে না। উল্টে ইদানীং সাজগোজ কিঞ্চিৎ বেড়েছে বলেই মনে হলো। আমি মনে মনে উড়ছি। ধৈর্যের মিষ্টি ফলের জন্য অপেক্ষা করে যাচ্ছি।

এর কিছুদিন পর একটা অনুষ্ঠান পড়ল। শিক্ষামন্ত্রী আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে আসবেন অতিথি হয়ে। বিশাল হুলস্থুল কান্ড। এক সপ্তাহে আগে থেকে সাজগোজ, রিহার্সাল, প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেল। কে কী করবে, কে কী পরবে এসব আলোচনা চারদিকে। আমি কোনোদিন কিছুতে অংশগ্রহণ করি না৷ বড়জোর পেছনের দিকে বসে হাই তুলতে তুলতে অনুষ্ঠান দেখি। এবার মনে হলো এটাই নিজের গুণ পরিচয় দেবার সবচেয়ে উত্তম সময়। যেই ভাবা সেই কাজ৷ নাচ, গান, কৌতুক, নাটক, বক্তৃতা কিছুই পারব বলে মনে হলো না৷ অগত্যা সবচেয়ে সহজটা বেছে নিলাম। কবিতা আবৃত্তি করব। কী কবিতা সেও এক ঝামেলা। কবিতার দায়িত্বে থাকা তরু আপুর কাছে যাওয়ার পর তিনি আমাকে ধরিয়ে দিলেন নজরুলের ‘সাম্যবাদী’ কবিতা৷ আবৃত্তিও শিখিয়ে দিলেন৷ কয়েকবার আবৃত্তি করার পর হতাশ গলায় তরু আপু বললেন, “তোকে দিয়ে এই কবিতা হবে না৷ তোর গলায় তেজ নাই।”

আমার নিজেরও ভালো লাগছিল না। বললাম, “বাদ দেন। অন্য কবিতা নাই?”

একে একে অনেক কবিতা চেষ্টা করানো হলো। আমার গলায় কিছুই মানানসই হচ্ছে না৷ তারচেয়ে বড় কথা কবিতা আবৃত্তির গুণাবলী আমার মাঝে সত্যি নাই। আবেগ, সুর কোনোটাই আসে না। মনে হয় রিডিং পড়ছি। জোর করে সুর আনতে চাইলে হাস্যকর শোনায়। অগত্যা দু’দিন পর তরু আপু হাল ছেড়ে দিয়ে বললেন, “তোকে দিয়ে হবে না রে। তুই বরং নাচটা প্র্যাক্টিস কর৷ ওটাতে গলার দরকার হবে না।”

আমি নাচের ‘ন’ ও জানি না, ওদিকে যাওয়ার কথা চিন্তাও করলাম না। তরু আপা ব্যাপারটা বুঝতে পারলেন। আরও একদফা প্রচেষ্টা চলল। শেষমেশ একটা কবিতা আমার মোটামুটি আয়ত্ত্ব হয়ে গেল। রবীন্দ্রনাথের ‘সোনার তরী’।

গগনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা।
কূলে একা বসে’ আছি, নাহি ভরসা।
রাশি রাশি ভারা ভারা
ধান কাটা হ’ল সারা,
ভরা নদী ক্ষুরধারা
খর-পরশা।
কাটিতে কাটিতে ধান এল বরষা।

যথারীতি অনুষ্ঠানের দিন চলে এলো। আমরা সবাই তৈরি। গতরাতে অনেকবার অনুশীলনে বেশ ভালোই মুখস্থ হয়েছে কবিতা। তাই আত্মবিশ্বাসও খানিকটা জন্মেছে মনে।

আফ্রিতা আমাকে প্রতিযোগিদের সাথে দেখে ভারি অবাক! কিছুক্ষণ বিষ্ময় নিয়ে তাকিয়ে থেকে নিজের স্পিচ পড়ায় মনোযোগ দিল। আজ সে বক্তব্য দেবে ‘ছাত্রজীবনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সুফল ও কুফল’ সম্পর্কে। আমাকে অবশ্য বলেনি, ওর গুনগুন পড়া শুনে ধারণা করতে পেরেছি। মেয়েটা গায়ে কী একটা সুগন্ধি ঢেলেছে! কাছে গেলেই ঘ্রাণে পাগল পাগল লাগে। আমি নানা অযুহাতে ওর আশেপাশে ঘোরাঘুরি করছি। আফ্রিতা বার দুই চোখ মটকে তাকালেও বলেনি কিছু। সবুজ ব্লাউজের সাথে জাম রঙা শাড়ি, মাথায় বেলীফুলের গজরা, কানে ঝুমকা আর চোখে পুরু করে কাজল। আজ ওকে দেখে আবারও নতুন করে প্রেমে পড়ে গেলাম।

একজনের পর একজন যাচ্ছে স্টেজে। আমার আস্তে আস্তে হৃৎস্পন্দন বাড়তে শুরু করেছে। হাতের তালু ঘামছে। এসির নিচে থেকেও আমি ঘামছি। পায়চারি করে যাচ্ছি সমানে। আফ্রিতার টার্ন চলে এলো। কী সুন্দর সাবলীলভাবে হেঁটে চলে গেল স্টেজে। মিষ্টি হেসে সবাইকে শুভসন্ধ্যা জানাল। আমি এবার সত্যি ভয় পেয়ে গেলাম। ওর পরেই আমি। লোকে আমার গলা শুনে মনে করবে কোকিলের পর কাক এসেছে। তারচেয়েও ভয়ের বিষয় হলো, আমি কবিতা ভুলে গেছি। প্রথম লাইনও মনে নেই।

(চলবে)