কারনে অকারনে ভালোবাসি ২ পর্ব-০১

0
2195

Suraiya Aayat
কারনে অকারনে ভালোবাসি 2
পর্ব;1

“আমার ওয়াইফ আপনার কাছে আসলে আপনি তাকে বলবেন যে সে কখনো মা হতে পারবে না, সে সেই ক্ষমতা হারিয়েছে অনেক আগেই। ”

ডক্টর মিতার সামনে থাকা ফাইলটা হাত থেকে নামিয়ে রেখে আরিশ বলে উঠলো।

ডক্টর মিতা তিনি একটু ভাবুক সুরে বললেন
“বাই এনি চান্স যদি সে কনসিভ করে যাই তখন কি করবেন আপনি?

আরিশ একরোখা হেসে বলল
” আমি অনেক বেশি প্রটেকটিভ এই ব্যাপারে তাই এই বিষয়টা নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকুন। ”

ডক্টর মিতা গালে হাত রেখে উৎকন্ঠা নিয়ে বললেন
” এতো বড়ো মিথ্যা বলাটা কি তাকে ঠিক হবে? না মানে মাতৃত্ব হলো প্রতিটি মেয়ের ই জীবনের বড়ো স্বপ্ন আর আমি তাকে এভাবে নিমেষেই ভেঙে চূরমার করে দেবো? তাও কারোর কাছে তার আদর্শ টিচার হিসাবে এভাবে বিশ্বাস ভাঙবো? ”

আরিশ কপালটার চামড়া হাত দিয়ে ইতস্তত ভাবে ভাজ করে জ্বিভটা দিয়ে ঠোঁটটা ভিজিয়ে নিষ্প্রভ কন্ঠে বলল

” তার বিশ্বাস অনেক আগেই ভেঙেছে আর সে জানেও যে সে মা হতে পারবে না, আর দেখুন আপনি আরু মানে আরুশির কলেজের একজন খ্যাতনামা প্রফেসর, এবং আরু নিজে আমাকে জানিয়েছে যে আপনি ওর কাছে ওর বর্তমানের আদর্শ, আপনি যা বলবেন ও বিশ্বাস করবে। আর আপনি তো ওর অবস্থা নিশ্চয়ই বুঝবেন, ও কনসিভ করলে ভবিষ্যতের কথা বাদ ই দিলাম, বর্তমানে ওর কি কি হতে পারে, বিষয়টা লাইফ রিস্কে চলে যাবে বুঝতেই পারছেন, এন্ড আই কান্ট লুজ হার। ”

ডক্টর মিতা চোখের চশমাটা ঠিক করে বলল
” আমার একান্ত প্রিয় একটা ছাত্রীর সুন্দর জীবন দেখতে এটুকু মিথ্যা আমি বলতেই পারি কিন্তু সে যদি কখনো সত্যিটা জানতে পারে তখন আপনি কি করবেন মি আরিশ? সে আপনাকে সহ আমাকেও ভুল বুঝবে। ”

কথাটা কর্নগোচর হতেই আরিশ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল
” তখনকার কথা তখন ভাবা যায় ডক্টর, আমি ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তা করি না, বর্তমানটাকে সুন্দর করে বাঁচতে চাই যাতে সুন্দর একটা অতীত রেখে যেতে পারি। দ্যাট ইট। আজ তাহলে আসি। ”

আরিশ উঠতে গেলেই ডক্টর মিতা বলে উঠলেন
” বাই দা ওয়ে আপনি কি সত্যিই আরুশির ভালোর জন্য এই মিথ্যা কথাটা আমাকে বলতে বাধ্য করছেন নাকি এর পিছনে আপনার কোন স্বার,,,, ”

স্বার্থ কথাটা ডক্টর মিতা পুরোপুরি বলে উঠতে পারলেন না তার আগেই আরিশ বলে উঠলো
” বিয়েটা হয়েছিলো জোর করেই, আমিই জোর করেছিলাম বিয়েটা করতে, বলতে গেলে আরুশিকে বাধ্য করেই বিয়েটা করেছিলাম, আসলে হারাতে ভয় পেতাম তাই চেষ্টা করতাম নিজের করে রাখার, আমার তরফ থেকে ওটা লাভ ম্যারেজ আর আরুশির কাছে সেই বিয়েটার কোন নাম আছে কি আমার জানা নেই আর আমি জানতেও চাই না, এর থেকে বেশি কিছু জানতে হলে আপনি আমার সম্পর্কে আরুশিকে নি্রদ্বিধায় প্রশ্ন করতে পারেন, উত্তর পেয়ে যাবেন। ”

কথাটা বলে আরিশ মুচকি হেসে বেরিয়ে গেল। আরিশের বলা কয়েক লাইনের উত্তর শুনে হয়তো ডক্টর মিতার হয়তো আর বুঝতে অসুবিধা হলো না যে আরুর প্রতি আরিশের ভালোবাসাটা ঠিক কেমন। উনিও মুচকি হেসে নিজের কাজে মনোযোগ দিলেন।

মেডিকেল কলেজ থেকে বেরিয়ে গাড়িতে উঠতেই আরিশ ফোনটা পকেট থেকে বার করতেই দেখলো সানার কল এসেছে, সানা দরকার ছাড়া সচরাচর কল করে না দেখে আরিশ কপাল কুঁচকে কল ব্যাক করতেই ওপর পাশ থেকে নিমেষেই কল রিসিভ হলো আর সাথে সাথেই সানা বলে উঠলো
” ভাইয়া তুই কি হসপিটাল এ? ”

আরিশ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে বলল
” এই ভর দুপুরে হসপিটালে থাকবো না তো কোথায় থাকবো? ”

কথাটাই যেন সানা বেশ ঘাবড়িয়ে গেল আর সানার এমন চেহারা দেখে আরু কিছুটা দূরত্বে দাঁড়িয়ে ফিসফিসিয়ে বলল
” বল এমনি বললাম, আমি কি তোর খবর নিতে পারি না? ”

দুঃভাগ্যবশত আরুর ফিসফিসানির আওয়াজ আরিশের কানে পারে গেল আর এটাও বুঝতে পারলো যে নিশ্চয়ই কোন গড়বড় আছে। তাই ততখনে সানার কিছু বলার আগে আরিশ বলল
“কেন কি হয়েছে?”

সানা এবার ঢোক গিলে আরুর বলা কথাগুলোই রিপিট করে বলল
” আমি তো তোর তোর বোন হয়ে তোর খোঁজ নিতে পারি না হ্যাঁ? ”

আরিশ বুঝতে পারলো এটা আরু শিখিয়ে দিয়েছে তাই মুচকি হেসে আগের সিরিয়ানেসটা ফিরিয়ে বলল
” অবশ্যই পারিস। তা বেশ, আর কিছু বলবি? ”

আরু আবার সানা কে শিখিয়ে দিতেই সানা বলল
” নাহ মানে আরু বলছিলো যে আরু তোকে নিয়ে নাকি আজকে বাজে স্বপ্ন দেখছে আর তুই ও বাসার বাইরে তাই ভয় পাচ্ছিল যে তোর কিছু হয়নি তো তাই আমাকে তোর খবর নিতে বলল। এই যা। ”

আরিশ ভ্রু কুঁচকে বলল
” তার দিনের বেলার স্বপ্ন গুলোও আমাকে নিয়ে যে এতো ধামাকাদার হয় জানতাম না তো। যাইহোক তার স্বপ্নে যে আমি আসি এটা শুনেই কান স্বার্থক আমার। ”

ফোনটা লাউডেই দেওয়া ছিলো তাই সবটা আরুর কানে যাচ্ছিলো, আরু মুখ ভাঙচি দিয়ে বিড়বিড়িয়ে বলল
” বয়েই গেছে তাকে নিয়ে আমার স্বপ্ন দেখতে, আমার ঘুম আর স্বপ্নের মধ্যে আমি তালা মেরে রেখেছি সে যেন আসতে না পারে। ”

সানা আরু কে চুপ করতে বলল, এই কথাটা আরিশ শুনতে পাইনি তবে বলল
” তাহলে সে নিজেই আমাকে ফোন করলে পারতো। ”

সানা কথা ঘোরানোর জন্য বলল
” চিন্তায় হয়তো এটা মাথায় আসেনি, যাই হোক তুই তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরছিস তো? তাড়াতাড়ি ফিরবি তো? ”

কথাটা সানা রিপিট করে বলল তাতে আরিশ ভাবলো যে জিলাপির মাঝে ডবল প্যাচ, তার আজকে বাসায় তাড়াতাড়ি অর দেরি করে ফেরার মাঝেই কোন গল্প আছে তাই আরিশ চালাকি করে বলল
” নাহ, আজকে ফিরতে লেট হবে, আজকে অনেক কাজ। আচ্ছা রাখছি। ”

সানা মুখের হাসিটা চওড়া করে দাঁত বার করে হেসে বলল
” আচ্ছা। ”

সানার কন্ঠের মাঝে উৎফুল্লতা আরিশ এর আর বুঝতে অসুবিধা হলো না,তবে তার লেডি গুন্ডিটা কি ছক কসেছে সেটাই ভাববার বিষয়।

আরিশ সানার কলটা কেটে আরু কে কল করলো। সানা আর আরু সবে খুশিতে তাদের নাচানাচি শুরু করবে ঠিক তখনই আরিশ এর কল আসলো আরুর ফোনে, আরুর পিলে চমকানোর মতো অবস্থা, আজ যে করেই হোক ওদেরকে আজকে সন্ধ্যায় বাসা থেকে বার হতেই হবে না হলে সব প্ল্যান ক্যান্সেল হয়ে যাবে। আরু ফোনটা হাতে নিয়ে দাঁড়ালো আর সানার দিকে ভয়াবহতা দৃষ্টি নিয়ে তাকাতেই সানা বলল
” ফোনটা ধর। ”

আরু বিলম্ব না করে ঝটপট করে ফোনটা ধরতেই আরিশ রাগী রাগী কন্ঠে বলল
” ফোনটা ধরতে এতো লেট হলো কেন? ”

আরু অবাক হয়ে বলল
” কোথায় লেট হলো? আমি তো তৎক্ষণাৎ ফোনটা ধরলাম, আর এমনও তো না যে কল কেটে গেছে। ”

আরিশ ধমক দিয়ে বলল
” কলটাকেটে ধরতে তুমি ১০.২৩ সেকেন্ড লেট করেছো। যাই হোক, তা কি করছিলে বলো। ”

আরু কিছুখন আগের ঘোরটা কাটিয়ে উঠতে পারেনি তাই উৎফুল্ল হয়ে বলে ফেলল
” এই তো নাগিন গানটাতে নাচ দিতে যাচ্ছিলাম আর আপনি ফোন করলেন। আপনার টাইমিং একদম ভালো না। ”

আরিশও আরু কে লজ্জা দেওয়ার জন্য বলল
” রাতে আমার টাইম জ্ঞান টা বেশ ভালোই থাকে, তা নিয়ে প্রশ্ন চলে না কি তাইতো আরু পাখি? ”

আরু বা সানার বুঝতে অসুবিধা হলো না ঠিক কি বোঝাতে চাইলো আরিশ, সানা মুখ টিপে হেসে সরে গেল ওখান থেকে। আরু দাঁত কিড়কিড় করে কিছু বলতে যাবে তখনই আরিশ বলল
” সানা পাশ থেকে সরে গেছে? ”

আরু অবাক হয়ে বলল
” হম কিন্তু আপনি কি করে জানলেন? ”

আরিশ মুচকি হেসে বলল
” জানতে হয়, যাইহোক আমি নাকি তোমার স্বপ্নে এসেছিলাম আর নাকি বেশ দাঙগাহাঙ্গমা করে আমার নাকি বিপদ ও হয়েছিলো আর তুমি নাকি অনেক চিন্তা করছিলে আমাকে নিয়ে তাই নাকি আরু পাখি? ”

আরু একটু রেগে বলল
” হমম তো? ”

আরিশ মুখ টিপে হেসে বলল
” তোমার স্বপ্নে আমার মতো জাতীয় অভদ্র মানুষের স্থান হয়েছে? ”

আরু বুঝতে পারলো যে আরিশ ওকে অকারনে রাগাচ্ছে যা আরিশ খুব ফাসট্রেটেড থাকলে করে, আর আরুর সাথে এমন অকারনে ফাজলামি করলে আরিশ এর ফাসট্রেশন কমে যায় তাই আরু বুঝতে পেরে বলল
” আপসেট? ”

আরিশ বলে উঠলো
” নাহ, রাখছি বাই, বাসায় এসে তোমার হাতে নুডলস আর কফি খাবো,এখন টাটা। ”

আরু কে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে আরিশ কল কেটে দিলো।

কল কাটতেই আরু জোরে চিৎকার করে বলে উঠলো
” সানা, মিশন আরাভ আহমেদ! ”

Bar-B-Q Tonight রেস্টুরেন্টে এসেছে আরু আর সানা আর সামনে বসে আছে আরাভ আহমেদ যে কি না সানার কলেজের সিনিয়র তবে সে এখন ডক্টর। সানা ফিসফিসিয়ে আরুর কানে বলল
” দোস্ত আমার ভয় লাগছে, যা বলার তুই বল আর আমি এমন এখান থেকে উঠে যাচ্ছি আর এক মিনিট থাকলে হার্ট ফেইল করবো চিন্তায় সিওর। তুই সব সামলিয়ে নিস দোস্ত। ”

আরু সানা কে উঠতে বারন করবে তখনই সানা বলে উঠলো
” আমি একটু ওয়াশরুম থেকে আসছি। ”

সানা উঠে যেতেই আরাভ বলল
” বাই দা ওয়ে সানা কে তো চিনি কিন্তু আপনি? ”

আরু শুকনো ঢোক গিলে হেসে বলল
” আমি সানার ভাবী আরুশি। ”

আরাভ হেসে বলল
” তা ভাবী কি আমাকে কিছু বলার জন্য এখানে এনেছে নাকি ননদীনি। ”

আরু বুঝতে পারলো যে আরাভ ফ্লার্ট করছে তাই আরু বুঝেশুনে বলল
” আসলে কি ভাইয়া, কাজটা ননদিনীর কিন্তু করতে হবে ভাবীকেই তাই আর কি। ”

” তা কি এমন কাজ যা ভাবীকে করতে হবে তাও যদি হয় এমন একটা বিউটিফুল ভাবী। ”

আরু মাথা নামিয়ে নিলো , কি বলবে বুঝছে না, সানা ভয়ে কেটে পড়েছে সুযোগ বুঝে আর ওকে রেখে গেছে। আরু দাঁত চেপে বিড়বিড় করে বলল
” যার বিয়ে তার ঘুম নেই পাড়া পড়শির ঘুম নেই। ”

হঠাৎ পাশ থেকে আরিশ কোল্ডড্রিংসটা টেবিল থেকে হাতে নিয়ে বলল
” ভুল বললে আরু পাখি ওটা যার বিয়ে তার হুশ নেই পাড়াপড়শির ঘুম নেই হবে। ”

হঠাৎ আরিশ এর কন্ঠস্বর শুনে আরুর পিলে চমকে উঠলো, এক ঝটকায় পাশে তাকিয়ে দেখলো আরিশ ওর দিকে তাকিয়ে আরাম করে কোল্ডড্রিংস খাচ্ছে। আরু কিছু বলতে যাবে তখনই আরিশ আর কোল্ডড্রিংসটা আরুর মুখের সামনে ধরে বলল
” খাও এটা, আর আমি যা বললাম ওটা ঠিক করে আরাভ কে বলো। ”

আরু আমাদের দিকে তাকিয়ে দেখলো সে ও মুচকি হাসছে, আরিশ এর দিকে তাকালো, সে ও মুচকি হাসছে। আরুর গলা শুকিয়ে এলো, ভয়ে আরিশ এর হাত থেকে কোল্ডড্রিংসটা নিয়ে খেতে গিয়ে দেখলো ক্যান ফাকা, আরু না পেরে স্ট্র টা চেবাতে লাগলো আর বিড়বিড় করতে লাগলো
” মি অভদ্র এলো কোথা থেকে। আব তেরা কেয়া হোগা আরুপাখি। ”

#চলবে,,

কারণে অকারণে ভালোবাসি গল্পটি পড়তে লেখাটি উপর ক্লিক করুন।