গোধূলীতে তুমি প্রিয় পর্ব-০২

0
1148

#গোধূলীতে_তুমি_প্রিয়
#পর্ব_২
#লেখিকা_রুবাইতা_রিয়া

খুব আয়োজনের সাথেই বিয়েটা হচ্ছিলো কিন্তু বিয়ের ঠিক দু ঘন্টা আগে যখন লাবিবা মনে একরাশ সপ্ন নিয়ে বউ সাজতে ব্যাস্ত ঠিক তখন ওর ছোট বোন এসে কাঁদতে কাঁদতে বলে উঠলো,,

লোবা—-আপুনি ইথান ভাই বিয়ে করে ফেলছে।তোমাকে সবাই বাহিরে ডাকছে।প্লিজ চলো।

লোবার কথা শুনে জানো আকাশ থেকে পরলাম আমি।এইগুলো কি বলছে ও।ইথান কখনোই এমন করতে পারেনা।ও তো আমাকে সেই ছোটবেলা থেকে ভালোবাসে তাহলে এগুলোর মানে কি?আমি লোবাকে কাঁপা কাঁপা গলায় বলে উঠলাম,,

আমি—-তুই মজা করছিস তাইনা আমার সাথে??দেখ লোবা এমন মজা আমার একটুও পছন্দ না!

আমার কথা শেষ হতে না হতেই লোবা আমার হাতটা ধরে টানতে টানতে বাহিরে নিয়ে গেলো।সেখানে গিয়ে জানতে পারলাম সত্যি আমার ভালোবাসার মানুষটা বিয়ে করে নিয়েছে।নিজেকে তখন একটা তুচ্ছ জিনিস মনে হচ্ছিলো।তবে ইথানের বউ বেশে যখন নিজেরই বেস্ট ফ্রেন্ডকে দেখেলাম তখন স্তব্দ হয়ে গেলাম।এইভাবে সবাই ঠকালো আমাকে??

আর কিছু ভাবতে পারছিনা।সব জানো আজকে অগোছালো লাগছে।ওয়ারড্রব থেকে একটা গাড় নীল রঙের থ্রি-পিস বের করে নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেলাম শাওয়ার নিতে।শাওয়ার ছেড়ে দিয়ে তার নিচে বসে কাঁদতে রইলাম।আজ জানো নিজের চোখের পানি বাদ মানছে না।

অন্যদিকে ফারিহাকে ঘরে নিয়েই দরজাটা লক করে দেয় ইথান।কোনো কথা না বলে দুম করে সোফায় বসে পরে।ইথানকেও কেমন জানি অগোছালো লাগছে ফারিহার কাছে।ফারিহা ইথানের সামনে গিয়প মাথা নিচু করে মিনমিনে কণ্ঠে বলে উঠলো,,

ফারিহা—-ইথান ভাইয়া লাবিবাকে সত্যিটা না বলে আমরা কি ঠিক করছি??ও অনেক কষ্ট পাচ্ছে ভাইয়া।আর ওকে এই অবস্হায় দেখে যে আপনি তার দ্বিগুণ কষ্ট পাচ্ছেন।

ফারিহার কথা শুনে ইথান নিশ্চুপ ভাবে ফারিহার দিকে তাকালো।ওকে কিছু বলতে যাবে ঠিক তখনই করিডরের দরজা দিয়ে ওদের রুমে একজন ছেলে প্রবেশ করলো।ছেলেটার মুখ রুমাল দিয়ে ঢাকা থাকলেও ফারিহার তাকে চিনতে একটুও সময় লাগলোনা।একপ্রকার দৌড়ে গিয়ে ছেলেটাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে হুহু করে কেঁদে দিলো।ইথান চুপচাপ ওদের দেখছে।ফারিহার এমন কান্ডে প্রথমে ছেলেটা অবাক হলেও পরে নরম কণ্ঠে বলে উঠলো,,

ছেলেটা—-এই পাগলী এইভাবে কাঁদছো কেনো??দেখো আমি চলে এসেছিতো।প্লিজ এভাবে কান্না করো না।

ফারিহা—-তুমি জানো আমার উপর লাবিবা খুব অভিমান করেছে।মাও খুব রেগে আছে আমার উপর।ইনফেক্ট এ বাড়ির প্রত্যেকেই রেগে আছে আমার উপর।আমি সবাইকে কষ্ট দিয়ে ফেলছি।

ফারিহার কথা শুনে ছেলেটা কিছু বলবে ঠিক তখনই দরজায় নক পরে কারোর।দ্রুতো ছেলেটা আড়ালে সরে যায় আর ফারিহা নিজেকে সাভাবিক করার চেষ্টা করে।ইথান গিয়ে দরজা খুলতেই ওর মা আহিয়া চৌধূরী রুমে প্রবেশ করেন।ইথান তারাতারি করে দরজাটা আবার লাগিয়ে দেয়।ইথানের মা একটু চিন্তিত কণ্ঠে বলে উঠেন,,

ইথানের মা—-ইথান বাড়িতে প্রচুর গেস্ট আছে এইজন্য গেস্টরুম সহ সব রুমেই লোক ভর্তি।এখন কি করবো বলতো??

ইথানের মায়ের কথা শুনেই আড়ালে থাকা ছেলেটি তাতারি করে বাহিরে বেড়িয়ে আসে।দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরে তাকে।ইথানের মাও ছেলেটিকে জড়িয়ে ধরে হালকা হেসে বলে উঠে,,

ইথানের মা—-বাবাহ!সেদিনের পুচকি ছেলেটা নাকি আজকে বিয়েও করে ফেলছে।ভাবা যাই বলতো ইথান??

ইথানের মায়ের কথায় সবাই একটু কিঞ্চিৎ হাসলো আর ফারিহা লজ্জায় মুখ লুকিয়ে নিলো।ইথান তখন ওর কাভার্ড থেকে কিছু কাগজপত্র বর একটা ফাইল এনে ওর মায়ের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে উঠলো,,

ইথান—-মা এই ফাইলে ইহান আর ফারিহার বিয়ের রেজিস্ট্রি পেপার আছে।ওদের বিয়ের সমস্ত ডকুমেন্টস আছে এখানে।এটাকে একটু সাবধানে রেখো প্লিজ যাতে কারোর চোখে না পরে।

ইথানের কথা শুনে ওর মা মুচকি হেসে মথা নারালো।তারপর কি জানো ভেবে বলে উঠলো,,

ইথানের মা—-ইথান লাবিবাকে কিছু,,,,,মাকে পুরো কথাটা শেষ করতে না দিয়েই ইথান বলে উঠলো,,

ইথান—-মা আমি এখন লাবিবাকে কিছু বলতে পারবো না।শুধু লাবিবা কেনো বাড়ির কাউকেই কিছু বলতে পারবো না।আমার রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত আমি এই বিষয়ে কোনো কথা বলতে চায় না। লাবিবাকে এখন সবটা বলে দিলে আমি জানি ও আমাকে ধরে বেঁধে হলেও বিয়ে করবে।কিন্তু এতে করে যে ওর জীবনটা একটা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাবে।তাই যতদিন পর্যন্ত না আমার মেইন রিপোর্ট আসছে ততদিন নাহয় আমার লাবুপাখি একটু কষ্ট পাক।কথাগুলো বলার সময় ইথানের চোখে পানি চিকচিক করছিলো।ছেলে বলেই হয়তো এখনো কাঁদেনি।ইথানের তার লাবুপাখিকে খুব দেখতে ইচ্ছা করছে কিন্তু লাবিবার সামনে যাওয়ার ক্ষমতা যে তার নেই এখন।

ফারিহা বুজতে পারলো সবার মনটাই খারাপ হয়ে গেছে।তাই কথা ঘুরানোর জন্য বলে উঠলো,,

ফারিহা—-মামনি এসব কথা এখন বাদ দেও আর এটা বলো যে ইথান ভাইয়া এখন কোথায় ঘুমাবে??

ফারিহার কথা শুনে ইহান মজার ছলে বলে উঠলো,,

ইহান—-কোথাও জায়গা না পেলে বাড়ির গার্ডেনে গিয়ে ঘুমাতে পারিস।ঠান্ডা আবহাওয়াই ভালোই হবে ঘুমটা।

ইহানের কথায় ইথান দাঁত কেলিয়ে হেসে দিয়ে বলে উঠলো,,

ইথান—-সমস্যা নাই তোর রুম তো ফাকা আছে।তুই তো এখানে বাসর করবি তোর বউয়ের সাথে।আমি নাহয় তোর রুমে গিয়েই দেবদাস হয়ে ঘুমাবো😪😪।

ইথানের কথা শুনে ইহান ফারিহার দিকে একটু ডেভিল ভাবে তাকালো।এদিকে ফারিহা লজ্জায় লাল নীল হয়ে যাচ্ছে।ইথানের মা ছেলে মেয়েদের এমন লাগাম ছাড়া কথা শুনে তাতারি করে ফাইলটা নিয়ে রুম থেকে বেড়িয়ে গেলো।

লাবিবা সবেমাত্র শাওয়ার নিয়ে বেড়িয়েছে।অতিরিক্ত ভেজার ফলে চোখদুটো ফুলে উঠেছে।চুল দিয়ে টুপটাপ করে পানি ঝরছে।ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে নিজেকে দেখে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিলো সে।অতঃপর রুমের মধ্যে ছড়িয়ে থাকা গহনাগুলো ভালোভাবে গুছিয়ে নিলো সে।এগুলো তো ইথানের বউয়ের জন্য ওর মা গড়িয়েছিলো।যেহেতু ইথানের বউ এখন অন্যকেউ তাই গহনাগুলোর মালিকও সে।তাকে ঠিকভাবে ফিরিয়ে দিতে হবে সবকিছু।কোনোকিছু না ভেবেই ইথানের রুমের উদ্দেশ্যে হাটা ধড়লো লাবিবা গহনাগুলো নিয়ে।

ইথান একটু ওয়াশরুমে গেছিলো ফ্রেশ হতে আর ফারিহা আর ইহান বসে বসে গল্প করছিলো আর হাসছিলো।ফারিহার মুড ভালো করার জন্যই ইহান মজার মজার গল্প বলছিলো আরকি।মাঝে মাঝে একটু রোমান্টিক কথাও বলছিলো যা শুনে ফারিহা লজ্জায় লাল হয়ে যাচ্ছিলো😇😇।দরজার কাছে কারোর পায়ের আওয়াজ পেয়ে ইহান তারাতারি আড়াল হয়ে গেলো আর ফারিহা হাসিমাখা মুখ নিয়ে বসে রইলো।ইথান তখনই ওয়াশরুম থেকে বেড়িয়েছে।

আমি রুমে এসে দেখতে পেলাম ফারিহা বেশ হাসিখুশি আর লজ্জামাখা ভঙিতে বসে আছে।ইথান ওর সামনেই দাড়িয়ে আছে।আমার আর বুজতে বাকি রইলোনা যে এখানে কি চলছিলো।এদের কি একটুও অনুতপ্তবোধ নেই?এতো বড় একটা কাজ ঘটিয়েও কি সুন্দর নিজেদের বাসর ইনজয় করছে।ছিহহহ!সবাই আসলে সার্থপর।আজ যেইখানে আমার থাকার কথা সেইখানে অন্যকেউ থাকবে।এই হাজারো গোলাপ ফুলের মাঝে তারা তাদের সুখ খুজে নিবে।আমার প্রিয় মানুষটাকে আমি যে হারিয়ে ফেলেছি।খুব কষ্ট হচ্ছে।এখানে না আসলেই হয়তো ভালো হতো।কিন্তু এখানে এসে যে ইথানের আরেক রূপের শিকার হবো তা জানলে হয়তো কখনোই এই ঘরে পা রাখতাম না আমি,,,

#চলবে??