দখিনা বারান্দায় তুমি আমি পর্ব-০১

0
791

#দখিনা বারান্দায় তুমি আমি
#আফসানা_মিমি
|প্রথম পর্ব|

‘ মামী তোমার ভাইয়ের ছেলে আমাকে আই লাভ ইউ বলেছে।’

‘ কি বলছিস দুহা! আর কিছু করেছে?’

‘ হ্যাঁ,আমাকে একটা আপ্পা দিয়েছে।’

‘আপ্পা কি? থাপ্পড়! যাক বাদ দে, তুই ছোট বলে আরান দুষ্টুমি করেছে হয়তো। চল কেক কাটার সময় হয়েছে।’

আরান আশফি আমার মেজ মামীর বড়ো ভাইয়ের ছেলে। আমার মত মামীদের বাসায় এসেছে বেড়াতে। দুইদিনে জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছে সে। উঠতে বসতে শুধু এই একটা বাক্যই বলে। মামা বাড়ি বেড়াতে এসেছি এক সপ্তাহ। জে এস সি পরীক্ষা শেষ হয়েছে। সময় নিয়ে এসেছি মামা বাড়িতে কিন্তু ভাগ্যে মনে হয় বেশি দিন থাকা নেই এই বাদরটার জন্য।

আমার এখনও পরিষ্কার স্বরণে আছে। এই বাড়িতে প্রবেশ করতেই প্রথমে দেখা হয় আরান ভাইয়ার সাথে। সকলের সামনে সে যে কি ভদ্র সাজ! ভেবেছিলাম খুবই ভদ্র। ব্যাগ বস্তা কাঁধে নিয়ে চলে যাচ্ছিল কোথাও। আমাকে দেখা মাত্র সিনেমা স্টাইলে হ্যাং মেরে দাঁড়িয়ে ছিল। পিছন থেকে মামী ডেকে যাচ্ছিল আরান ভাইকে। সে কি আহ্লাদি ডাক!
‘ আরান, বাবা যাস নে। তোর ফুফা তো এমনই জানিস তো! দুইদিন পর আদিব,আদিলের জন্মদিন। তুই চলে গেলে কষ্ট পাব।’

ভদ্রলোকের মত সেদিন আরান ভাইয়া বলেছিল,
‘ তোমার কথা ফেলতে পারি কী ফুপি! আমি আরো দশদিন থেকে যাবো। রাগ করিনি। ফুফার সাথে মিলমিশে থাকব।’

খেয়াল করেছিলাম সেদিন মামীর কপালে সূক্ষ্ম ভাজ পড়েছিল। দুই মিনিট নীরবে কিছু ভেবে আরান ভাইয়ার কানে কানে যেন কী বলেছিল। বিনিময়ে তিনি মাথা চুলকে লাজুক হেসেছিলেন।

সেদিনের পর থেকে শুরু হয় মৌখিক অত্যাচার। শুরুতেই ভদ্রতার খাতিরে কথা বলি উনার সাথে। পরমুহূর্তে ছ্যাচড়া উপাধি দেই অনিমেষে। মানুষটার স্বভাব পুরো বদমাইশি। আমাকে জ্বালাতন করার চিন্তায় থাকে সবসময়।

আজ মেজ মামার দুই ছেলে কাগজ,কলমের ষষ্ঠতম জন্মদিন। মূলত নাম আদিল,আদিব আমি নাম দিয়েছি কাগজ,কলম। তারও একটা কারণ আছে। আজ থেকে তিন বছর আগের ঘটনা। তখন আমি ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়তাম, সেবার গ্রীষ্মের ছুটিতে মামা বাড়িতে বেড়াতে আসি। কাগজ,কলমের বয়স তখন দুই বছর মাত্র। ছোটবেলা থেকেই ছবি আকার শখ ছিলো খুব। মামী দুই ছেলেকে গোসল করিয়ে বসিয়ে যায় আমার কাছে। আমি তখন ছবি আকায় ভীষণ ব্যস্ত। ধ্যান নেই কোনখানে। কিছুক্ষণ পর ঠকঠক আওয়াজ শুনে ধ্যান ফিরে আসে। আদিল,আদিব কাগজ,কলম কামড়াচ্ছে আর অদ্ভুত আওয়াজ করছে। অবুঝ মনে চিৎকার করে উঠি।
‘ আমার কাগজ,কলম সব খেয়ে সাবার করে ফেলল যে।’

বাচ্চারা খিলখিল করে হাসছে। আমি মরা কান্না শুরু করি। মামী দৌঁড়ে আসেন। বাচ্চাদের ফেলে আমার কান্না সংবরণের চেষ্টা করেন। এরপর থেকে কাগজ কলম দেখলেই একজন কাগজ খাবে আরেকজন কলম। শত যুদ্ধ করেও উদ্ধার করতে পারি না আমার শখের কাগজ কলমকে। তাই নাম দিয়েছি কাগজ, কলম।

গল্প করতে করতে বর্তমান সময়কে ভুলে গেলাম। মামী অনেক সময় ধরে অপেক্ষা করছে। গেলে চোখ রাঙাতেও পারে।
মামা দুই ছেলের জন্মদিনে বিশাল আয়োজন করেছেন। মন্ত্রী,কাউন্সিলর থেকে শুরু করে নিকটবর্তী-দূরবর্তী সকল আত্মীয়দের নিমন্ত্রণ করেছেন। আরানদেরও নিমন্ত্রণ করেছেন।
যথা স্থানে আসতেই মামীর চোখ রাঙানির শি’কার হলাম। বুঝতে পারলাম আমার জন্য এতক্ষণ যাবত অপেক্ষা করা হয়েছে। মাথা নত করে মামার পাশে দাঁড়ালাম। মামা-মামীর মাঝে কাগজ,কলম দাঁড়িয়ে। মামীর অপরপাশে আরান নামক বদ বাদর দাঁড়িয়ে আছে।
কেক কাটার শেষ মুহুর্তে আরান ভাইয়া ভয়ংকর কাণ্ড করে ফেলল। সকলে যখন কেক খাওয়ায় ব্যস্ত তখন আরান ভাইয়া আমার হাত শক্ত করে ধরে বাঁকা হাসতে ব্যস্ত।

‘ হাত ছাড়ুন আরান ভাইয়া। মামা-মামীকে ডাকব কিন্তু।’

‘ ভাইয়া বলে না দুহা রাণী! সোয়ামি ডাকো সোয়ামি।’

মুক্তদানা ঝড়ছে হাসির সাথে। আরান ভাইয়ার হাতে এক পিস কেক। হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে খাইয়ে দেওয়ার জন্য। আমি নাছোড় বান্দা খাবোই না বলে পন করেছি। ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে যায় আরান ভাইয়ার। রেগে শক্ত করে ধরে রেখেছে হাত।

” হা কর দুহা। আমার ধৈর্য্যের পরীক্ষা নিও না। এমনিতেই তুমি চটংপটং তোমাকে একটা কথা বললে ফুপির কাছে বলে দাও। এবার আমার কথা মত না চললে ভয়ংকর কিছু করব বলে দিলাম।”

ভয় পেলাম সহজেই, প্রকাশ করলাম না। চোখ খিচে, ঠোঁট চেপে বন্ধ করে রাখলাম।
” কথা শুনলে না তো! এবার বুঝো ঠ্যালা।”

আদরের সহিত বলার সময় যদি খেয়ে নিতাম ভালো হতো। সারা মুখে কেক মাখিয়ে ছেড়েছে বদ বাদরটা। এত সুন্দর মেকআপ নষ্ট করে ফেলেছে। দুঃখে কষ্টে কান্না চলে আসছে। বদ বাদর তখনও দাঁড়িয়ে বাঁকা হাসছে। কে বলবে আমার থেকে এই ছেলে অনেক বড়। ভাবসাব দেখে মনে হয় যেন প্রেসিডেন্টের খালাতো ভাই।
‘এটা কি করলেন আপনি। আমি তিন ঘন্টা যাবত সেজেছি জন্মদিন উপলক্ষে আর আপনি কেক মেখে সব শেষ করে দিলেন! আমি মামীর কাছে বিচার দিব।”
‘যা ইচ্ছে তাই কর। আমার কথা না শুনলে এমনিই হবে। যাইহোক আমি আমার কাজটা সেরে ফেলি।’

বলতে বলতে আরান ভাইয়া আবার একটা আপ্পা দিয়ে বসলো আমার গালে। শুধু আপ্পা দিয়ে ক্ষান্ত হল না, রাক্ষসের মত গাল থেকে কেক কিছু খেয়ে নিল।

ব্যথা পেয়েছি বটে। চিৎকার দিয়ে বলে উঠলাম,’ ওরে আমার গাল ছিরে নিয়ে গেল রে!’

মামী ছুটে আসেন চিৎকার শুনে।
‘ কি হয়েছে? তোর এই অবস্থা কেন? ক্ষুধা পেয়েছিল বুঝি! আহারে সোনাটা। সহ্য করতে না পেরে কেক খেতে গিয়ে পুরোটা মুখ ভরে ফেলেছে। চল তোকে আরো কেক দেই।’

মামী চলে গেলেন। কাগজ, কলম দাঁড়িয়ে; হাতে কেক কাটার ছু’রি। কাগজ, কলম একসাথে বলে উঠে,
‘দুহারাণী কামড় খেয়েছে, ইশ কী ব্যাথা পেয়েছে।’

কবিতা আবৃত্তি করতে করতে চলে গেল দুজন। লক্ষ্য করলাম যারা তাদের কবিতা শুনেছে সকলেই তাকিয়ে আছে। চলে আসলাম সেখান থেকে। আজ আমার দিনটাই খারাপ গেল।
———-

সকালে ঘুম থেকে উঠা অভ্যাস। মামার বাড়ি মজার হাড়ি, কথাটা সত্য। তিনদিন পর চলে যাব। দূর সম্পর্কের এক মামাতো বোনের সাথে বের হয়েছি, এলাকা ঘুরে ফিরে দেখার জন্য। অবশ্য আসার আগে বাসায় সবাইকে দেখে আসতে ভুলিনি। বিশেষ করে আরাম ভাইয়াকে। ভাইয়া কাঁথা মুড়ি দিয়ে সুন্দর করে ঘুমাচ্ছেন। শান্তি লাগছে। কেননা আমি যেখানে যাই সেখানেই আরান ভাইয়া এসে উপস্থিত হয়। আর আমার ঘোরাফেরার বারোটা বাজায়।

মামা বাড়ি থেকে অনেক পথ হেঁটে চলে এসেছি। বর্তমান অবস্থান করছি খোলা আকাশের নিচে, সবুজ মাঠে। দূর-দূরান্তের সবুজ মাঠ। ছোটবেলা থেকেই আমার এই জায়গাটা খুবই প্রিয়। এখানে ক্রিকেট, ফুটবল, কানামাছি খেলতাম। খুব মনে পড়ছে ছোটবেলার কথা।

আশেপাশের সৌন্দর্য উপভোগ করছি। আমাকে একা ফেলে দূর সম্পর্কের মামাতো বোন দৌঁড়ে অপর পাশে চলে গেল। আমিও চোখ বন্ধ করে দুহাত মেলে ঘুরছি। নির্জন এই জায়গায় এই সময়ে কেউ নেই। মনের সুখে ঘুরছি। কারো সাথে ধাক্কা লাগায় চোখ মেলে তাকাই। আরান ভাইয়া এখানে এসে হাজির। আমাকে দেখে দাঁত কেলিয়ে হাসছে।

‘ওহে সুন্দরী! মনটা করলি চুরি।
এভাবে হেসো না আর একটু ক্ষণে,
মরে যাচ্ছে যে আমি ক্ষণে ক্ষণে।’

‘আপনি আবার এখানে চলে এসেছেন? আমি কিন্তু এবার সত্যি সত্যি মামীর কাছে বিচার দিব।’

‘তোমার মামীকে আমি ভয় পাই নাকি? যাও বিচার দিয়ে আসো। দেখি কে আমার কী করতে পারে।’

‘আপনাকে কেউ কিছু করুক বা না করুক আপনি একজন ভালো মানুষ না।’

‘কি করেছি তোমার সাথে?’

‘ অনেক কিছু করেছেন। আমি এখান থেকে চলে যাচ্ছি। আপনি একাই থাকেন।’

চলে আসি সেখান থেকে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন আকাশ হঠাৎই মেঘাচ্ছন্ন রুপ ধারণ করল। বুঝে নিলাম আমার সাথে সাথে প্রকৃতিরও মন খারাপ হয়ে গেছে। পেছন ফিরে তাকালাম। অন্য সময় হলে আরান ভাইয়া এতক্ষণে চলে আসত। কিন্তু এখন আসছে না। এমনকি আমার দূর সম্পর্কের মামাতো বোনও নেই। ভয় পেলাম। আশেপাশে ভীত চোখে তাকালাম। অদূরে একটা দোকান ছাড়া আর কিছু চোখে পড়ল না। বৃষ্টিতে ভেজা আমার জন্য সুখকর না। দোকানের দাকে এগিয়ে গেলাম। বৃষ্টি ঝরছে মুশলধারে। ভয় পেয়ে গেলাম। দোকানে একজন বৃদ্ধ লোক বসে আছে, আর কেউ নেই। বৃদ্ধ লোকের দৃষ্টি সমীচীন মনে হয়নি। একটু পরপর পান চিবুচ্ছেন আর বিশ্রী হাসি হাসছেন। ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির জন্য আমি নিজেই দায়ী।বৃষ্টির মধ্যে চলে আসবো সেই মুহূর্তে বৃদ্ধ লোকটি বলে উঠলেন,

‘কোথায় যাচ্ছ মেয়ে! যে বৃষ্টি ঝরছে, বৃষ্টিতে ভিজলে জ্বর-ঠান্ডা চলে আসবে। এর চেয়ে ভালো তুমি আমার দোকানে এসে বসো। গরম গরম চা পান কর। এতে শরীর গরম হয়ে আসবে।
লোকটি কথাগুলো বলে আমার শরীরে খারাপ দৃষ্টিতে তাকালো। শরীর কাঁটা দিয়ে উঠলো, অজানা আতঙ্কে ঘিরে ধরলো চারিপাশ। আমি কি খুবই ভুল করলাম এখানে চলে এসে! হয়তো, বৃষ্টির বেগ অনেক বাড়ছে। বৃষ্টির সাথে সাথে প্রবর বাতাস বইছে। পাশে চিকন আকাশি গাছগুলো বাতাসে হেলে পড়ছে বারবার।

জনশূন্য এলাকা এসে পড়েছি। এখন কি হবে আমার! এদিকে বৃদ্ধ লোকটি চাহনি সহ্য করার মতো না। লোকটা এবার শব্দ করে চায়ের কাপ নিচে রেখে এগিয়ে আসছে আমার দিকে। চোখ লাল যেন নেশা করেছে ঠোঁট লাল পান খাওয়ার ফলে। কিছুক্ষণ পর পর জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিচ্ছে যেন বহুকালের তৃষ্ণা মিটাবে আমাকে দিয়ে। মনে মনে দোয়া করে যাচ্ছি, আল্লাহকে স্মরণ করে যাচ্ছি। এমন ভুল আর কোনদিন করব না।

বৃদ্ধ লোকটি আমার হাত ধরল শক্ত করে। এরপরে আমার গালে থাপ্পড় বসিয়ে দিল। বিশ্রী ভাষায় গালিগালাজ করে বলতে লাগল,

‘ শা*লী সোজা কথায় বুঝবি না। এ বৃষ্টি বাদলের তোরে কেউ বাঁচাতে আসবে না। তুই বরং এখানে দাঁড়িয়ে ঠাণ্ডা না হয়ে আমাকে গরম কর। বুড়ি মরেছে অনেক যুগ আগে। শরীরের রক্ত গরম হয়ে আসছে, চল!’

বৃদ্ধ লোকটির মনে কোন দয়া মায়া নেই। নাতির বয়সী মেয়ের দিকে কু-দৃষ্টি নিক্ষেপ করছে। আমাদের সমাজে আজ কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে! আপ্রাণ চেষ্টা করছি ছাড়া পেতে। হাত মোচড়ে যাচ্ছি, বারবার বলে যাচ্ছি,’ ছেড়ে দিন, ছেড়ে দিন।’ কিন্তু লোকটা আমাকে ছাড়ছে না।
আমাকে ভিতরে নিয়ে চেয়ারে বসিয়ে দুই হাত বেঁধে রাখল, এরপর মুখে কস্টিব লাগিয়ে দিল। দোকানের সামনে দিকে এগিয়ে গেল। পানের পিক বাহিরে ফেলে বিশ্রী হেসে দোকানের সামনে কাগজ খুলে দিল। যেন বাহির থেকে বৃষ্টির আসতে না পারে এবং মানুষ ভাবে বৃষ্টির কারণে দোকান বন্ধ। লোকটি আমার দিকে এগিয়ে আসছে। চোখে, মুখে লালসা স্পষ্ট। আজ হয়তো রেহায় পাবো না। এভাবেই নিজের সম্মান হারাব। হয়তো আগামীকাল পত্রিকায় বা টেলিভিশনে আমার খবর ছাপা হবে!

চলবে……