#প্রিয়া_তুমি
#পর্বঃ৮
#লেখিকা_লক্ষী_দেব
শাশুড়ির কথায় তানিয়া অবাক হলো, বুকের মাঝে চিনচিনে ব্য’থা অনুভব করল। বিয়ের এতগুলো বছরে শাশুড়ি কখনো একটুখানি রাগ নিয়ে, গলা উঁচু করে তার সাথে কথা বলেনি। সবসময় নরম ভাবে কথা বলেছে। অথচ আজকে? আজকে এভাবে এত বড় কথাটা বলতে পারল? তানিয়া ছল’ছল দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“আম্মু আপনি….।
তানিয়া কথাটা শেষ করতে পারল না। তানিয়ার কথার মাঝ পথেই আমেনা বেগম কড়া গলায় বলে উঠল,
“আমি তোমার কোনো কথা শুনতে চাচ্ছি না। তুমি রুমে চলে যাও।
তানিয়া আমেনা বেগমের কথাটা মানতে চাইল না। দ্বি’মত পোষন করে বলল,
“আমি থাকি আম্মু। আমার এখানে কোনো সমস্যা হচ্ছে না।
আমেনা বেগম কথাটা মানলেন না। আগের থেকে দ্বিগুণ কড়া হলেন। ধ’মকে বলে উঠলেন,
“তোমাকে কি বলেছি তুমি কি শুনতে পাওনি? নাকি ইচ্ছে করে আমার কথা অমা’ন্য করতে চাচ্ছো? আমার কথা শুনার প্রয়োজন বোধ করছ না। তোমাকে বলেছি রুমে যেতে তুমি রুমে যাও।
তানিয়া তী’ক্ষ্ণ কথাগুলো হজম করে উঠে দাঁড়ালো। এক মুহুর্ত এখানে সময় ব্য’য় না করে রুমের দিকে ছুট লাগালো। রুমে গিয়ে বিছানায় শরীরটা এলিয়ে দিয়ে কান্না করতে লাগলো। অভু’ক্ত, ক্লা’ন্ত শরীরটা নরম বিছানায় পেয়ে আরাম পেল। কান্নার মাঝেই ঘুমের অতলে তলিয়ে গেল।
তানিয়া রুমে চলে গেছে অনেকক্ষণ হয়ে গেছে। আমেনা বেগম এখনো ছেলের জন্য অপেক্ষা করে আছেন। ঘুমে চোখ গুলো বুঝে আসছে তবে রাফসানের ফেরার নাম নেই। মিনিট পাঁচেক পরই কলিং বেল বেজে উঠল। আমেনা বেগমের চোখ থেকে ঘুম ছুটে গেল। তড়িগড়ি করে উঠে দাড়িয়ে দরজা খুলে দিলেন।
রাফসান আমেনা বেগমকে দেখে অবাক হলেন। আবার খুশিও হলেন। আমেনা বেগমকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আম্মু তুমি এখনো ঘুমাও নি? এতো রাত পর্যন্ত জেগে আছো কেন?
“ছেলেকে বাহিরে রেখে আমি নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারতাম? আমার ঘুম হতো? তুই এতো রাত করে ফিরেছিস কেন? কি এতো কাজ তোর।
রাফসান মায়ের শেষ প্রশ্নটা কৌশলে এড়িয়ে গিয়ে বলল,
“আমি কি এখনও ছোট আছি আম্মু? আমার জন্য কিসের এতো চিন্তা করছো? আমি বড় হয়ে গেছি আম্মু। এতো চিন্তা বাদ দাও।
আমেনা বেগম রাফসানকে খাবার বেড়ে দিতে দিতে বললেন,
“সন্তানের জন্য মায়ের চিন্তা কখনোই শেষ হয় না। যতদিন পর্যন্ত বেঁচে থাকব ততদিন পর্যন্ত চিন্তা থাকবে। তুই বড় হয়ে গেলেও থাকবে।
রাফসান আর কথা বাড়ালো না। মায়ের সাথে খাবার খেয়ে নিল। আমেনা বেগম ছেলেকে পেয়ে ভুলে গেলেন তার পুত্রবধূ এখনো অভু’ক্ত আছে। রাফসানের ফিরার আশায় সেও কিছু মুখে তুলেনি।
রাফসান খাওয়া শেষ করে রুমে গেল। ঘু’মন্ত তানিয়ার সামনে গিয়ে বিছানার সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। তানিয়ার ঘু’মন্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে বলল,
“ভালোবাসা বড্ড যন্ত্র’নার। ভালোবাসার মানুষটা অন্য কাউকে ভালোবাসে সেটা জানা আরো বেশি যন্ত্র’নার।
________________
তানিয়া সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে গতকালের মতোই নিজেকে একা বিছানায় দেখল। উনি কি রাতে রুমে আসেনি? তানিয়া প্রশ্নের উত্তর খুঁজে ও উত্তর পেল না। দ্বিধা’গ্রস্ত হয়ে বিছানা ঠিক করে ওয়াশরুমে চলে গেল। ফ্রেশ হয়ে প্রতিদিনের মতোই সর্বপ্রথম রান্নাঘরে চলে গেল।
তানিয়া রান্নাঘরে গিয়ে দেখলো আমেনা বেগম সালমা বেগম দুজনই রান্নাঘরে আছেন। তানিয়াকে দেখা মাত্রই আমেনা বেগম বলে উঠলেন,
“রাফসান কি ঘুম থেকে উঠে গেছে?
তানিয়া আমেনা বেগমের কথাটা শুনলো। তবে আমেনা বেগমের কথায় বুঝলো না রাফসান কালকে রাতে বাসায় ফিরেছিল। কথাটা শোনা মাত্রই তানিয়া বলে উঠল,
“উনি তো কালকে রাতে বাসায় ফিরেনি।
তানিয়া কথাটা বলার সাথে সাথে দুজোড়া বি’স্মিত নয়ন তানিয়ার দিকে তাকাল। দুজনের চোখেই অবাকতা। দুজনের দৃষ্টি দেখে তানিয়া ভড়কে গেল। আমেনা বেগমের প্রশ্নটা মনে হতেই ধ্যা’ন ফিরল। অবাক ক’ন্ঠে প্রশ্ন করল,
“উনি কি রাতে বাসায় ফিরেছিলেন?
তানিয়ার প্রশ্নটা শোনা মাত্রই সালমা বেগম হায় হায় করে উঠলেন। তানিয়াকে শুনিয়ে শুনিয়ে চিৎকার করে বলে উঠলেন,
“এই কি বউ ঘরে এলো আমাদের? নিজের স্বামীর প্রতি কোনো খেয়াল, যত্ন নেই। স্বামীর খবর রাখে না। রাফসান দেশে না আসলে তো এইসব জানতেই পারতাম না। এতদিন এই কোন কালসাপের সাথে ঘর করলাম আমরা?
তানিয়া মাথা নিচু করে ফেলল। সালমা বেগমের কথা শুনে শিউর হয়ে গেল রাফসান কাল রাতে বাসায় ফিরেছিল। তানিয়া মনে মনে আর কয়েকটা বিষ’বাক্য শোনার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেল। তখনই শুনতে পেল আমেনা বেগম বলছেন,
“কপাল করে বউ এনেছিলাম। যদি জানতাম এমন হবে তাহলে কখনোই এমন বউ ঘরে তুলতাম না।
তানিয়া নি’শ্চুপে কথাগুলো শুনলো। আমেনা বেগম কথাটা বলে চুপ করে গেলেও সালমা বেগম চুপ রইলেন না। সেই দিন রনিতের গালের পাঁচ আঙুলের দাগের উশুল যেন নিজের তী’ক্ষ্ণ কথা দিয়ে শোধ করতে চাইলেন। এবং তানিয়ার চোখের চিকচিক করা পানিগুলো দেখে বুঝে গেলেন তিনি তার কাজে সফল হয়েছেন।
আমেনা বেগম অন্য দিনের মতো আজকে সালমা বেগমকে থামালেন না। তানিয়ার আচার আচরণে বুঝে গেলেন রাফসানের সাথে তানিয়ার সম্পর্ক ভালো না। তাই সালমা বেগম যা ইচ্ছে তাই বলে যাওয়ার পরও আমেনা বেগম কিছু বললেন না।
সালমা বেগমের সাথে সাথে নিজেও তানিয়ার চোখের পানি গুলো দেখলেন। তা দেখে বুকের ভেতরটা জ্ব’লে উঠলো। তিন বছর হয়ে গেল মেয়েটা এখানে আছে। নিজের মেয়ে না থাকায় তানিয়াকে মেয়ের মতোই স্নেহ করেছেন। কখনো কথার ভানে কান্না করানো তো দূরের কথা রাগী স্বরে কথা পর্যন্ত বলেন নি। আজ সেই মেয়েকে কান্না করতে দেখে বুকটা জ্ব’লে উঠল। তবে মুখে সেটা প্রকাশ করলেন না।
______________
সারাটা দিন তানিয়া বি’ষন্ন মনে পাড় করল। দুপুরে সকলে খাবার খেয়ে যখন নিজের রুমে চলে গেল তানিয়া ড্রয়িং রুমে একা একা বসে রইল। মন মেজাজ ভালো নেই। মাথা নিচু করে বসে রইল তানিয়া। চোখের সামনে দুজোড়া পা থেমে যেতেই তানিয়া চোখ তুলে তাকাল। চোখের সামনে রনিতের মুখটা দেখে চোখ ফিরিয়ে নিল।
রনিত তানিয়ার চোখ ফিরিয়ে নেওয়ার দৃশ্যটা দেখে হেসে উঠল। তানিয়া যে সোফায় বসে ছিল তানিয়ার পাশ ঘেঁষে সেই সোফায় বসে পড়ল। রনিত বসার সাথে সাথে তানিয়া সোফা থেকে উঠে গেল। তা দেখে রনিত আরেক দফা হেসে বলল,
“আহারে বেচারীর কি ক’ষ্ট। স্বামী কত অবহেলা করছে। ইশ, এতো ক’ষ্ট দেখে আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছে।
রনিতের খোঁচা দেওয়া কথাটা শুনে তানিয়া চোখ বন্ধ করে সয়ে গেল। কোনো প্রতিবাদ করল না। রনিত আবারো বলে উঠল,
“শুনো, তুমি আমাকে গ্রহণ করে নেও। রাফসানের থেকে আমি তোমায় বেশি খুশি রাখতে পারব। কোনো ক’ষ্ট দেব না।
তানিয়া রনিতের দিকে তাকিয়ে ক্রু’দ্ধ স্বরে বলল,
“আমি যদি মরেও যাই তবুও আপনার মতো নি’কৃষ্ট মানুষের কাছে যাব না।
তানিয়া রনিতকে কথাটা বলে নিজের রুমের দিকে চলে গেল। তানিয়াকে যেতে দেখে রনিত হেসে উঠল। হাসি থামিয়ে নিজে নিজেই বলল,
“তোমাকে তো আমার করবোই।
____________
রাতের খাবার খেয়ে রিতা তানিয়ার কাছে রান্নাঘরে গেল। তানিয়াকে প্রশ্ন করল,
“ভাবী আজ দুদিন ধরে ভাইয়াকে দেখছি না যে। ভাইয়া কোথায় গেছে।
তানিয়া থালা-বাসন ধুতে ধুতে রিতার প্রশ্নের উত্তরে বলল,
“তোমার ভাইয়া আমাকে বলে যায়নি।
“কেন? তোমাদের মধ্যে কী ঝগড়া হয়েছে? ভাইয়া কি কোনো কারণে তোমার সাথে রাগ করেছে?
“তেমন কিছুই হয়নি। তোমার ভাইয়া কেন এমন করছে তার কারণ আমি জানতে পারিনি। কাল রাতে অজান্তেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। তোমার ভাইয়াও আমাকে ডাকেনি।
“তুমি ভাইয়ার সাথে কথা বলে সব ঠিক করে নিও ভাবী। রাগ-অভিমান বেশি দিন জমিয়ে রাখা ভালো না।যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মিটিয়ে নেওয়াই ভালো।
রিতা চলে গেল। তানিয়া কাজ শেষ করে গিয়ে ড্রয়িং রুমে গিয়ে বসল। কাল রাতে বেখেয়ালিতে ঘুমিয়ে গেলেও আজ ঠিক করল ঘুমাবে না। রাফসানের এমন আচরণের কারণ না জেনে কিছুতেই শান্তি পাবে না। যে করেই হোক কারণটা জানবেই জানবে।
#চলবে