#বিষাদের_শহরে_তুমি_এলে
#পর্ব_০৩
#লেখিকা_Fabiha_bushra_nimu
ইফাদের বাবার সামনে বসে আছে চারজন পুলিশ। ইফাদের বাবা গম্ভীর মুখ করে, তাদের দিকে দৃষ্টিপাত করে রেখেছে। চারজনের মধ্যে একজন পুলিশ নরম কণ্ঠে বলে উঠলো।
–স্যার আপনার ছেলে, কালকে একটা মেয়ের গলায় ছু*রি* চালিয়ে এসেছে। কালকে মেয়েটির বিয়ে ছিল। মেয়েটির বাবা আপনার ছেলের নামে মামলা করেছে। আমরা আপনার ছেলেকে নিতে এসেছি। পুলিশের কথা শুনে, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পুলিশটির দিকে তাকালো ইফাদের বাবা। ইফাদের বাবাকে নিজের দিকে, দৃষ্টিপাত করতে দেখে, মাথা নত করে দিল পুলিশটি। ইফাদের বাবা শান্ত মস্তিষ্কে উত্তর দিল।
–এই খবরটা কে কে জানে?
–স্যার আমরা জানি, আর মেয়ের বাড়িতে যারা যারা দাওয়াত খেতে এসেছিল। তারা সবাই জানে।
–আর কেউ?
–না স্যার জানে না।
–মেয়ের বাবাকে আমার সাথে দেখা করতে বলো। আর এই খবরটা বাহিরে যেনো না যায়। গেলে কি হবে, সেটা নিশ্চয়ই বলে দিতে হবে না। ইফাদের বাবার কথা শুনে, চারজন পুলিশই ইফাদের বাসা ত্যাগ করল। রাগে ইফাদের বাবার পুরো শরীর কাঁপছে। হুংকার ছেড়ে ছেলেকে ডাকলো। ইফাদ গভীর নিদ্রায় তলিয়ে আছে। এই প্রথম তাদের বাসায় পুলিশ আসলো। ইফাদের বাবা বিলম্ব করল না। দ্রুত পায়ে ছেলের রুমে দিকে যেতে লাগলেন। ইফাদের রুমে এসে, জোরে জোরে ডাকতে লাগলো। আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসলো ইফাদ।
–সকাল সকাল এভাবে বিরক্ত করছো কেনো? তোমার বউ তোমাকে দেখে শুনে রাখতে পারে। যখন তখন এসে, যাকে তাকে বিরক্ত করো।
–কালকে তুমি কোন মেয়ের গলায় আঘাত করে এসেছো। বাবার কথা কর্ণকুহরে আসতেই সজাগ হলো ইফাদ। হাসিমাখা মুখ করে বলল।
–মেয়েটা মরে গিয়েছি। চল্লিশার ব্যবস্থা করবো। মেয়ের বাবা কি বেশি বাড়াবাড়ি করছে, তাহলে মেয়ের বাবাকে-ও কি কে*টে* পি*স* পি*স* করে দিব।
–ইফাদ আমি তোমার সাথে মজা করছি না। আমি সিরিয়াস। একজন ম্যাজিস্ট্রেটের বাসায় পুলিশ এসেছে। তা-ও আবার কাকে ধরতে, ম্যাজিস্ট্রেটের ছেলেকে ধরতে। এই খবরটা বাহিরে গেলে কি হবে বুঝতে পারছো।
–তুমি ভাইরাল হয়ে যাবে আব্বু। তোমার না অনেক ইচ্ছে ছিল। তুমি একদিন খুব জনপ্রিয় হবে। এমনিতেই তোমার অনেক জনপ্রিয়তা হয়েছে। আমার উছিলায় তুমি আরো ভাইরাল হয়ে যাবে। আমাকে তোমার ধন্যবাদ দেওয়া উচিৎ। তুমি আমাকে ধন্যবাদ না দিয়ে বকছো। এই জন্য বলে মানুষের ভালো করতে নেই।
–বাবা মাথার ওপরে ছিল। তাই বেঁচে গিয়েছো। বাবা না থাকলে, কি করবে? আজ বেঁচে আছি। তাই মাথার ওপরে ছায়া হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। যেদিন মাথার ওপরে থেকে, এই ছায়াটা সরে যাবে। তখন উপলব্ধি করতে পারবে, দুনিয়াটা কতটা কঠিন।
–ঝগড়াটে মানুষ এত সহজে মরে না? ইফাদের কথা শুনে, বিরক্ত হয়ে চলে ইফাদের বাবা। এই ছেলের সাথে কথা বলাই বেকার। এখন আপাতত শ্রেয়ার বাবার সাথে দেখা করতে হবে।
হসপিটালে প্রবেশ করল ইফাদের বাবা। ইফাদের বাবাকে দেখে, শ্রেয়ার বাবা এগিয়ে আসলো। মলিন কণ্ঠে বলল।
–আসসালামু আলাইকুম স্যার। আপনি এখানে? কোনো দরকার? ইফাদের বাবা সামলামের উত্তর দিয়ে, গম্ভীর কণ্ঠে জবাব দিল।
–একটা মেয়ের বাবার সাথে দেখা করতে এসেছি। কালকে মেয়েটার বিয়েছিল। মেয়েটার গলায় আঘাত করা হয়েছিল। মেয়েটা এই হসপিটালেই আছে। মেয়েটার পরিবারের ইনফরমেশন আমার চাই। ইফাদের বাবার কথা শুনে, স্তব্ধ হয়ে গেল শ্রেয়ার বাবা। মিনমিনে কণ্ঠে বলল।
–আমার মেয়ে স্যার। শ্রেয়ার বাবার কথা শুনে, গম্ভীর হলে ইফাদের বাবার কণ্ঠ। উচ্চ স্বরে বলল।
–তোমার মেয়ে হয়ে, এমন একটা কাজ করবে। আমি কখনো ভাবতে পারি নাই। আমার ছেলে যেটা করেছে, সেটা নিঃসন্দেহে অন্যায়। কিন্তু তোমার মেয়ে, আমার ছেলের সাথে রিলেশন করল। তাকে না জানিয়ে অন্য জায়গায় বিয়ে করে ফেলছে। ইফাদ যদি বড় কিছু ঘটিয়ে ফেলতো। তোমার কোনো ধারণা আছে। তুমি ইফাদকে চিনো না।
–স্যার আমি আপনার ছেলের কথা শুনেছি। কিন্তু কালকের ছেলেটাই আপনার ছেলে, এটা আমি জানতাম না। আমার মেয়ের যে, আপনার ছেলের সাথে রিলেশন ছিল। এটাও আমি জানতাম না। আগে যদি জানতাম। তাহলে আমার মেয়ের বিয়ে, কখনোই অন্য ছেলের সাথে দিতাম না।
–একটা দুর্ঘটনা ঘটে গিয়েছে। ব্যাপারটা যেহেতু আমাদের নিজেদের, তাই নিজেরা নিজেরা ঠিক করে নিলেই ভালো হয়। তুমি চিন্তা করো না। আমি আছি, তোমাকে কখনো বিপদের মধ্যে পড়তে দিব না। আমার ছেলের হয়ে, আমি তোমার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। তোমার মেয়ের চিকিৎসার জন্য যা যা খরচ হবে। সবকিছু আমি বহন করবো।
–ক্ষমা চেয়ে লজ্জা দিবেন না স্যার। আপনি এখানে এসেছেন। আমার পাশে দাঁড়াতে চেয়েছেন। এটাই আমার কাছে অনেক। আমার মেয়ের করা অন্যায়ের জন্য আমি’ও ক্ষমাপ্রার্থী স্যার।
–তোমার মেয়ে এখন কেমন আছে?
–আলহামদুলিল্লাহ স্যার একটু ভালো আছে। ডক্টর কথা বলতে নিষেধ করেছে। কিছুদিন ঠিকমতো চিকিৎসা নিলে, ঠিক হয়ে যাবে।
–তোমার মেয়ের বিয়ে কি হয়ে গিয়েছিল?
–জ্বী স্যার হয়েছিল।
–আমি না শুনতে পছন্দ করি না। হসপিটালের সমস্ত বিল আমি দিয়ে যাচ্ছি। আবার এসে তোমার মেয়েকে দেখে যাব। কথা গুলো বলেই চলে গেল ইফাদের বাবা। ইফাদের বাবার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থেকে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল শ্রেয়ার বাবা।
ইফাদের পাশে বসে আছে রিয়াদ। ইফাদ মুখটা গম্ভীর করে রেখেছে। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে রিয়াজের দিকে তাকিয়ে আছে। রিয়াদের নিরবতা ইফাদ একদম পছন্দ করছে না। তা রিয়াদ হারে হারে উপলব্ধি করতে পারছে। রিয়াদ নিজেকে প্রস্তুত করে নিয়ে বলল।
–আগেই বলে ছিলাম মেয়েটা ভালো না। আগে অনেক জনের সাথে রিলেশন ছিল। তোর থেকে তাদের বাজে ভাবে ঠকিয়েছে। আমি তোর তেমন কাছে ফ্রেন্ড না। আবির তোর বেস্ট ফ্রেন্ড। আবির তোর বেস্ট ফ্রেন্ড হয়ে, এমন একটা মেয়ের সাথে, কিভাবে রিলেশন করিয়ে দিতে পারলো। যে যাবার এমনিতেই চলে যাবে। তুই চাইলেও তাকে ধরে রাখতে পারবি না। এভাবে মন খারাপ করে থাকিস না প্লিজ। ছোট বেলা থেকে এক সাথে বড় হয়েছি। তুই মন খারাপ করে থাকলে, আমাদের ভালো লাগে বল। তোর জন্য একটা সুন্দর অফার নিয়ে এসেছি।
–রিয়াদ আমার ভালো লাগছে না। আমাকে বিরক্ত করিস না৷ আমি একটু শান্তিতে ঘুমোতে চাই। ঘুরতে যাবার জন্য, শান্ত মস্তিষ্কের প্রয়োজন হয়। আপাতত আমার মস্তিষ্ক এখন বিগড়ে আছে। বাহিরে গিয়ে, কারো ক্ষতি করে বসি।
রিয়াদ এক প্রকার জোর করেই ইফাদকে বাসা থেকে বের করে নিয়ে আসলো। চারজন বন্ধু মিলে ঘুরতে বের হয়েছে। উদ্দেশ্য ছবি তোলা। চারজনের বাইকে এসে থামলো একটা রাস্তায়। যেখানে দুইপাশে গাছপালা দিয়ে পরিপূর্ণ হয়ে আছে। রাস্তা দিয়ে নানা রকমের গাড়ি চলছে। গাড়ির এত আওয়াজে প্রচন্ড বিরক্ত হলো ইফাদ। রাগান্বিত হয়ে বলল।
–এত কোলাহল আমার ভালো লাগে না। আমাকে গাড়ির আওয়াজ শোনাতে নিয়ে এসেছিস। ইফাদের কথা শুনে, রিয়াদ ইফাদের কাঁধে হাত রেখে বলল।
–এত উত্তেজিত হচ্ছিল কেনো? রাস্তায় কোলাহল থাকবে এটাই স্বাভাবিক। জঙ্গলের ভেতর চলে গেলে, কেউ আমাদের বিরক্ত করতে পারবে না। ইফাদের কাঁধে রিয়াদ হাত রাখাতে ইফাদ রাগান্বিত হয়ে, রিয়াদের দিকে তাকালো। ইফাদের দৃষ্টি লক্ষ্য করে, রিয়াদ দ্রুত গতিতে হাত সরিয়ে দিল। ইফাদ গম্ভীর হয়ে বলল।
–এই তোদের ব্যাপার কি? আমাকে জঙ্গলে নিয়ে যাবি কেনো? তোরা আমাকে মে*রে* ফেলার বুদ্ধি করছিস নাকি? দেখ আমি এখনো বিয়ে করি নাই। বাচ্চার মুখের দেখতে পারি নাই। বিয়ে করে বউকে বাসায় নিয়ে আসতে পারি। তোদের মামা বানাতে পারি নাই। এত সহজে ম*র*তে চাই না। যদি আমাকে মা*রা*র উদ্দেশ্য এখানে আসিস। তাহলে তোদের উদ্দেশ্য বাতিল করে দে। আমি বিয়ের করে, সংসারটা করে নেই। তোরা মামা ডাকটা শুনে নে। তারপরে আমাকে মা*রা*র চিন্তা ভাবনা করিস। ইফাদের কথা শুনে সবাই হতভম্ব হয়ে গেল।
চলবে…..