#মুখোশ || ৪র্থ পর্ব
রিম্পাকে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলে থাকতে সবার প্রথমে সারা দেখেছিলো। প্রতিদিন সকালে নাস্তা বানানোর সময় রিম্পার, সারার সাথেই থাকতো। রান্নাঘরের টুকটাক কাজে সাহায্য করতো। ননদ-ভাবি মিলেই হাতে হাতে কাজগুলো সারতো। কিন্তু আজ তাকে রান্নাঘরে না দেখে সারা প্রথমে বিষয়টাকে খুব একটা আদলে নেয় নি।
ভাবলো, হয়তো মনটা ভালো নেই। গত দুদিন ধরে যে ঝড় বয়ে যাচ্ছে সবার জীবনের উপর দিয়ে, তাতে কারও মন ভালো থাকার কথা নয়। তাই একা হাতে নাস্তা বানিয়ে নেওয়ার পরও যখন রিম্পার কোনো সাড়া পাওয়া পেলো না সে, তখন সারার মনে একটা অজানা অস্বস্তি জমতে শুরু করলো।
সাতপাঁচ না ভেবে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে রিম্পার ঘরের দিকে পা বাড়ালো সারা। আর ঘরের দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই মুহূর্তের মধ্যে তার পৃথিবীটা যেন থমকে গেল। সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ওড়না পেঁচানো অবস্থায় বাতাসে দুলছে রিম্পার নিথর দেহ খানা!চোখ দুটো বন্ধ, শরীর রক্তশূন্য, প্রাণহীন। সকালের নরম আলোয় এমন বিভীষিকাময় দৃশ্যের মুখোমুখি হবে,সারা তা কোনোদিন কল্পনাতেও ভাবেনি।
এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো, সে বুঝি কোনো ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন দেখছে। কিন্তু পরমুহূর্তেই নির্মম বাস্তবতা তার সেই ভ্রম ভেঙে চুরমার করে দিল। ভয় আর আতঙ্কে সারার বুক ফেটে বেরিয়ে এলো এক করুণ চিৎকার।
সেই চিৎকারে বাড়ির সবাই হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলো রিম্পার ঘরে। আর তারপর এক মুহূর্তের জন্য যেন সময় থেমে গেল। সবাই পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইলো। কারও মুখে কোনো কথা নেই, যেন অদৃশ্য কোনো তালা সবার কণ্ঠরোধ করে দিয়েছে। দেখলো তাদের সবার চোখের মধ্যমনি সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলে আছে। নিস্তেজ,প্রাণহীন শরীরটা দুলে বেড়াচ্ছে।
নিস্তব্ধ ঘরের ভেতর, এমন হৃদয় নিংড়ানো দৃশ্য দেখে তাকিয়ে রইলো সবাই বাকরুদ্ধ, অসহায় চোখে।
নূর জাহান বেগমের পুরো শরীরটা থরথর করে কাঁপছে। চোখের সামনে নিজের মেয়ের এমন বিভৎস মৃত্যু বোধহয় কোনো মা’য়েরি সহ্য করার মত নয়। নূর জাহান ছুটে গিয়ে ঝুলে থাকা রিম্পার পা দুটো জাপটে ধরে চিৎকার করে কাঁদতে লাগলেন। সকালের স্নিগ্ধ পরিবেশটা একজন অসহায় মায়ের সন্তান হারা আর্তনাদে যেন হঠাৎ করেই ভারী হয়ে উঠলো। সারা এগিয়ে গিয়ে শ্বাশুড়ির পাশে দাঁড়ালো। কিন্তু কীভাবে এই মূহুর্তে একজন মা’কে সান্ত্বনা দিবে তার কিছুই বুঝে উঠতে না পেরে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো বাকিদের দিকে।
বাবা আজিজুল হকেরেও একই অবস্থা। চোখের সামনে মৃত মেয়েকে দেখে শোকে পাথর হয়ে গিয়েছেন তিনি। পিয়াস একা কি করবে না করবে কিছুই ভেবে উঠতে পারছে না। রিম্পাকে দেখে তার হৃদয়টাও বোন হারানোর শোকে কাতর হয়ে উঠেছে। রিম্পা কেন করলো এমনটা? সে তো সবকিছু ঠিকঠাকই করে ফেলেছিলো।
কয়েক মিনিটের ব্যবধানে নিস্তব্ধ বাড়িটাতে অসংখ্য মানুষজন এসে ভিড় করলো। সবার মাঝে চাপা গুঞ্জন। রিম্পার আকস্মিক মৃত্যুটা কেউই বোধহয় স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারছে না। মানার কথাও নয়।
একেকজন একেকরকম প্রশ্ন তুলছে, আবার নিজেরাই তার উত্তর খুঁজে বেড়াচ্ছে। কেউ সন্দেহে, কেউ কৌতূহলে, কেউ বা নিছক অনুমানে।
আজিজুল হকের পাড়াতে একটা নামডাক আছে। তিনি
নিজেকে শক্ত করে নিয়ে বললেন, এই খবর যেন কোনোভাবেই থানা-পুলিশ পর্যন্ত না পৌঁছায়। কিন্তু দুঃসংবাদ বড়ই বেয়াড়া। হাওয়ার আগেই ছড়িয়ে পড়ে।
রিম্পার আত্মহত্যার খবর থানা অবধি পৌঁছাতে তাই বেশিক্ষণ সময় লাগলো না।
রিম্পার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই রিম্পার হবু শ্বশুরবাড়ি থেকে কাওসার আর তার বাবা এসে হাজির হলো। কাওসার যেন এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না। সে ভিড় ঠেলে রিম্পার ঘরের চৌকাঠে দাঁড়াতেই তার শরীরটা কেঁপে উঠলো। বিছানার উপরে কোমর থেকে মুখ অবধি ওড়না দিয়ে ঢাকা অবস্থায় রিম্পা শুয়ে আছে!
একবার রিম্পার দিকে তাকিয়েই আবার চোখ ফিরিয়ে নিলো সে। মেয়েটাকে এই কদিনে নিজের অজান্তেই ভালোবেসে ফেলেছিলো সে। মনের ভিতরে একটা বড় জায়গা তার নামে করে দিয়েছিলো। বাবা বিয়েতে না করে দেওয়ার পর সে নিজেই সবার বিরুদ্ধে গিয়েছিলো। রিম্পার হয়ে রুখে দাঁড়িয়েছিলো। কিন্তু এখন সেই মানুষটায় সবার ধরাছোঁয়ার বাইরে।
রিম্পাকে ঘিরে তার কত স্বপ্ন, কত ইচ্ছে, কত না বলা কথা,সবই যেন অপূর্ণ থেকে গেল। ভাবনাগুলো মাথায় আসতেই কাওসারের চোখজোড়া ছলছল করে উঠলো।
অশ্রুসিক্ত চোখে আরও একবার রিম্পার দিকে তাকালো সে। সবাইকে কাঁদিয়ে, কী আশ্চর্যভাবে শান্ত হয়ে শুয়ে আছে মেয়েটা। আচ্ছা, এভাবেও কি কেউ ফাঁস দেয়? প্রশ্নটার কোনো উত্তর খুঁজে পেল না কাওসার। মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করে উঠলো তার। বুকের ভেতরটা হঠাৎ ভারী হয়ে এলো।
রিম্পার লাশটা এখনো ঘর থেকে বের করা হয়নি। নূর জাহান বেগমের আকুতি-মিনতিতে ঝুলন্ত ফ্যান থেকে নামিয়ে খাটের উপর শুইয়ে রাখা হয়েছে তাকে।আত্মহত্যার লাশ ধরা-ছোঁয়া করা নাকি নিষেধ পাছে যদি পুলিশি ঝামেলা হয় আবার।
কিছুক্ষণ পর একটা পুলিশের গাড়ি বাড়ির সামনে এসে থামলো। গাড়ি থেকে তিনজন কনস্টেবলসহ একজন পুলিশ অফিসার নেমে সোজা বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়লেন। তারপর রিম্পার ঘরটি ভালো করে পরখ করে দেখার পর অফিসার যখন একজন কনস্টেবলকে লাশটি নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন, তখনই আপত্তি তুললেন আজিজুল হক।
শক্ত অথচ অনুনয়ের সুরে বললেন,’যে মানুষটা আর বেঁচে নেই, তাকে নিয়ে কাটা-ছেঁড়া করার মানে কী?’
একমাত্র মেয়ের নিথর দেহটাকে আর পোস্টমর্টেমের নামে ক্ষতবিক্ষত করতে চান না তিনি। অফিসারকে আলাদা করে ডেকে নিয়ে লাশ নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি নিঃশব্দেই মিটিয়ে ফেললেন আজিজুল হক।
অফিসার ফর্মালিটির জন্য রিম্পার পরিবারের কাছে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করলেন। তারপর কাজ মিটিয়ে আবার ফিরেও গেলেন।
সব শেষে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো বাদ আসরের নামাজের পরই রিম্পার দাফনকাজ সম্পন্ন করা হবে।
হলোও তাই,গতকাল অবধি যে মেয়েটা দিব্যি সবার চোখের মনি হয়ে ছিলো তাকে চিরদিনের জন্য গহীন কবরের ভিতরে চির শায়িত করার তোড়জোড় শুরু হয়ে গেলো। আর তারপর আসরের নামাজ শেষ করে সবাই মিলে রিম্পার দাফনকার্য সম্পন্ন করলো।
….
দাফন শেষ হওয়ার পর একে একে লোকজনের ভিড় কমতে লাগলো। শোকের শব্দ, দোয়ার ফিসফিসানি মিলিয়ে ধীরে ধীরে বাড়িটা আবার আগের মতোই শূন্য হয়ে পড়লো। একমাত্র মেয়েকে হারিয়ে নূর জাহান বেগম পুরোপুরি ভেঙে পড়েছেন
রোয়াকের এক কোণে তিনি পাথরের মূর্তির মতো ঠায় বসে আছেন। চোখের দৃষ্টি শূন্য,ফ্যাকাসে। তাঁর পাশে নিঃশব্দে বসে আছে সারা।
বাড়ি ফিরে পিয়াস ধীরে ধীরে মায়ের কাছে এগিয়ে এসে তাকে নিয়ে রোয়াক থেকে উঠে দাঁড়ালো। শরীরের ভার যেন আর বহন করতে পারছেন না নূর জাহান বেগম। সারা আর পিয়াস দু’জন মিলে তাকে ধরাধরি করে ঘরের ভেতরে নিয়ে গেলো।
উঠোনে আজিজুল হক বাড়িতে আসা লোকজনদের সঙ্গে কথা বলছেন। কেউ সান্ত্বনার ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না, কেউ আবার সবকিছুকে নিয়তির ঘাড়ে চাপিয়ে নিজেকে হালকা করার চেষ্টা করছে। রিম্পার মৃত্যুসংবাদ শুনে যেসব আত্মীয়স্বজন এসেছিলেন, প্রায় সবাইই ফিরে গেছেন। মুষ্টিমেয় কয়েকজন এখনো রয়ে গেছেন,নূর জাহান বেগমের সাহারা হয়ে।
কাওসার আর তার বাবাও শেষবারের মতো আবার এই বাড়িতে এসেছেন। হয়তো আজকের পর আর কখনোই আসা হবে না তাদের। উঠোনের একপাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে কাওসার,তার চোখের দৃষ্টি ঝাপসা , মুখে কোনো কথা নেই।
কাওসারের বাবা আজিজুল হকের কাছে এসে ভারী কণ্ঠে বললেন,’কি থেকে কি হয়ে গেলো! একটু ভুল বুঝাবুঝি হযেছিলো সবার ভিতরে। কিন্ত আমাদের কাওসার তার সিদ্ধান্তে অটল ছিলো। তারপর পিয়াসের মুখে সব শুনে তো আমি আমার ভুলটা বুঝে আবার সম্মতি দিয়েছিলাম।
তাহলে রিম্পা মা আবার এমন অঘটন ঘটালো কেন?’
আজিজুল হক কোনো উত্তর দিতে পারলেন না। চোখ নামিয়ে শুধু দীর্ঘ একটা নিশ্বাস ছাড়লেন। আরও কিছুক্ষণ দু’একটা কথাবার্তার পর ভদ্রলোক বিদায় নিলেন। কাওসারকে সঙ্গে নিয়ে ধীর পায়ে বাড়ির গেট পেরিয়ে বেরিয়ে গেলেন তিনি।
….
সেদিন রাতে সবকিছু কোনোমতে সামলে নিজের ঘরে ঢুকলো পিয়াস। মাথার ভেতরটা কেমন ভারী ভারী লাগছে তার। ঠিক তখনই সারা নিঃশব্দে এসে তার পাশে দাঁড়ালো।
তারপর কিছুক্ষণ কাচুমাচু করে নিচু স্বরে বললো,’আচ্ছা, তোমার কি মনে হয় রিম্পা সত্যিই আত্মহত্যা করেছে?’
পিয়াস বোকার মতো তাকিয়ে রইলো সারার দিকে। প্রশ্নটা যেন হঠাৎ করে তার মাথার ওপর এসে পড়লো।
সারা আবার বললো,’আমার তো রিম্পার মৃত্যুটাকে আত্মহত্যা বলে একবারের জন্যও মনে হয়নি।
যে মেয়েটা ঘুমানোর আগ পর্যন্ত হাসিমুখে কথা বলে গেলো, সে হঠাৎ করে গলায় কেন ফাঁস দিতে যাবে? ব্যাপারটা একটু অস্বাভাবিক লাগছে না? হ্যাঁ রিম্পার আত্মহত্যার মত একটা কারণ ছিলো যদি বিয়েটা আর না হতো। কিন্তু তুমি তো ও বাড়িতে গিয়ে সেসবের সমাধান করে এসেছিলে,ও বাড়ির সবাইও রাজি হয়ে গিয়েছিলো। তাহলে হঠাৎ করে মরার মত এতবড় একটা সিদ্ধান্ত কেন নিতে গেলো মেয়েটা?’
পিয়াস ভ্রু কুঁচকে বললো,
‘কি বলতে চাইছো তুমি?’
সারা একটু থেমে বললো,’আমার মনে হচ্ছে রিম্পা আত্মহত্যা করেনি। মৃত্যুর পর রিম্পার মুখটা দেখেছিলে তুমি? ভালো করে খেয়াল করলে হয়তো তুমিও ব্যাপারটা বুঝতে পারতে।’
পিয়াস সত্যিই তখন এতকিছু খেয়াল করেনি। নিজের একমাত্র বোনের এমন আকস্মিক মৃত্যুতে কে আর এত খুঁটিনাটি লক্ষ করতে পারে!
‘কোন ব্যাপার?’
ধীরে প্রশ্ন করলো পিয়াস।
সারা গলা আরও নিচু করে বললো,’শুনেছি, ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যার যন্ত্রণা অনেক কষ্টের। আত্মহত্যার পর মৃতর মুখটা বিকৃত হয়ে যায়। অনেকের চিবুক পর্যন্ত জিহ্বা বেরিয়ে আসে, চোখগুলোও কারো কারো ঠিকরে বেরিয়ে আসে। কিন্তু রিম্পার ক্ষেত্রে তো এসব কিছুই হয়নি।’
একটু থেমে আবার বললো,’রিম্পার মুখটা দেখে মনে হচ্ছিল, সে যেন গভীর ঘুমের মধ্যেই মারা গেছে। না কোনো মৃত্যুর যন্ত্রণার ছাপ ছিল , না ছিলো কোনো আক্ষেপের চিহ্ন। আরেকটা কথা, রিম্পাকে তো ঝুলন্ত অবস্থায় আমি সবার প্রথমে দেখেছিলাম। কেউ ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করলে অবশ্যই ঝুলে পড়ার পর একটু হলেও বাঁচার জন্য হাত দিয়ে গলার বাঁধন খোলার চেষ্টা করবে অথবা পা গুলো অস্বাভাবিক থাকবে।
মানুষ মৃত্যুর যন্ত্রণাকে সহ্য করতে পারলেও, কিন্তু শেষ মুহূর্তে সেই কষ্ট সহ্য করা অসম্ভব। কিন্তু রিম্পাকে দেখে তো এসবের কিছুই মনে হয়নি। এমন একটা মানুষ, যে নিজের গলায় ফাঁস দিয়ে ঝুলে পড়লো,অথচ তার একটুকুও যন্ত্রণা হলো না। এমনটা কি আদৌও সম্ভব!’
পিয়াস কিছুটা অবাক হয়ে বললো, ‘তারমানে তুমি বলছো…?
সারা তার কথার মাঝেই বলে উঠলো,’হ্যাঁ, রিম্পা আত্মহত্যা করেনি। তাকে খুন করা হয়েছে।’
চলবে….
#আশিক_মাহমুদ

