#মুখোশ || ৫ম পর্ব
সারার কথাগুলো শুনে পিয়াসের কপালে খানিকটা ভাঁজ পড়লো। ভ্রু কুঁচকে বললো,’তারমানে তুমি বলছো রিম্পাকে কেউ খুন করেছে! কিন্তু রিম্পাকে কেউ কেন খুন করবে? রিম্পার সাথে তো কারো শত্রুতা ছিলো না।’
সারা একটু থেমে, একদৃষ্টিতে পিয়াসের দিকে তাকিয়ে বললো, ‘তোমার কি মনে হয় সেদিন রাতে আমার ঘরের সামনে কাউকে দেখতে পাওয়া, মায়ের আলমারি থেকে রিম্পার বিয়ের গয়না হারানো, আর এখন এই ফাঁস দিয়ে মারা যাওয়ার ঘটনা,সবগুলো কাকতালীয়? পর পর ঘটনাগুলো সাজিয়ে দেখলে তুমি নিজেই বুঝতে পারবে।
সবক’টা ঘটনার মধ্যে একটা যোগসূত্র রয়েছে। তুমি বরং একবার বাবার সাথে কথা বলে দ্যাখো।’
পিয়াস কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর, চিন্তিত স্বরে বললো, ‘না, এখনই বাবাকে কিছু জানাবো না। বাবা-মায়ের মন ভালো নেই, আর এসব কথা বললে আরো সমস্যা হতে পারে। আগে তো নিশ্চিত হতে হবে, তিনটা ঘটনার মধ্যে আদৌ কোনো সম্পর্ক আছে কি না, এবং রিম্পার মৃত্যুটা খুন না আত্মহত্যা, সেটা স্পষ্ট প্রমাণ করতে হবে। তারপর যদি প্রয়োজন হয়, তখন বাবাকে জানাবো।’
সারা কিছুক্ষণ ভাবল, তারপর বললো, ‘তাহলে কি একবার পুলিশের কাছে যাবে? গিয়ে না হয় মায়ের আলমারি থেকে গয়না হারানোর একটা জিডি করে আসো। আমি সিউর, আলমারি থেকে যে গয়না গুলো সরিয়েছে, সেই রিম্পার খুনের সাথে জড়িত।’
পিয়াস মাথা নেড়ে বললো,’এতদিন পর গয়না হারানোর জিডি করতে গেলেও তো ঝামেলা বাড়বে, বৈয় কমবে না। পুলিশের জাত বড্ড খতরনাক। কোন দিকের পানি কোনদিকে নিয়ে যাবে, এটা ওটা বলে জল ঘোলা করাই তাদের কাজ। আর তাছাড়া, বাবা নিজেই তো আজকে পুলিশের লোকজনকে অনুরোধ করে রিম্পার পোস্টমর্টেম করানোটা বাদ দিয়েছে। এখন যদি আবার পুলিশের কাছে যাই, তাহলে আরেক বিপদ হবে। আসল অপরাধিকে ধরা বাদ দিয়ে আমরা কেন গয়না চুরির ঘটনা আর রিম্পার খুন হওয়ার সন্দেহের কথা লুকিয়েছি সেসব জানতে চেয়ে পাগল করে দিবে। তার থেকে বরং আমার পরিচিত রুদ্র দা কে একটা খবর দিই।’
সারা এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বললো, ‘রুদ্র দা! রুদ্র টা আবার কে?’
‘আমার অফিস কলিগ প্রশান্তর একজন দূর সম্পর্কের দাদা আছেন। পেশায় তিনি একজন আর্ট শিল্পী। তবে তার আরেকটা পেশাও আছে, সেটা হলো সত্য অন্বেষণ করা।’
‘মানে? তুমি কি ডিটেকটিভের কথা বলছো?’
‘অনেকটা তেমনি। তবে সরাসরি কোনো সংস্থার হয়ে কাজ করেন না তিনি।’
‘তাহলে?’ সারা জানতে চাইলো।
‘ভদ্রলোকের ছোটবেলা থেকেই ডিটেকটিভ হওয়ার ইচ্ছা ছিলো। সেই ইচ্ছাকেই বুকে ধারণ করেই খেলাধুলা বা আড্ডার বয়সে তিনি সবসময় ডুবে থেকেছেন নানান বইয়ের পাতায়। শার্লক হোমস, হারকিউল পোয়ারো, ফেলুদা,দেশ-বিদেশের নামকরা সব গোয়েন্দাদের কাহিনি পড়ে পড়ে তিনি যেন নিজের অজান্তেই মানুষ চিনতে, সূত্র জোড়া লাগাতে, আর নীরবতায় লুকোনো সত্য ধরার গোপন রাস্তা রপ্ত করে ফেলেছেন।
তবে এসব তিনি কখনোই প্রচারের জন্য করেন না। নাম, যশ, পরিচিতি এসব তাঁর কাছে অর্থহীন। একান্তই সখের বশে, নিজের তৃপ্তির জন্যই তিনি এই কাজগুলো করেন।
ভদ্রলোকের প্রখর বুদ্ধিমত্তা আর সাহসিকতা একাধিক আনসলভ কেসের জট খুলে দিয়েছে। প্রয়োজনে পুলিশকেও সাহায্য করেছেন,কিন্তু সবসময় আড়াল থেকে। কোনো নথিতে তাঁর নাম নেই, কোনো খবরের কাগজেও তাঁর ছবি ছাপা হয়নি। তাই মানুষ তাঁকে চেনে না, চেনার সুযোগও পায়নি কখনো।
একবার প্রশান্তর বাড়িতে গিয়ে তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। প্রথম দেখায় বিশ্বাসই হয়নি এমন রোগা-পাতলা, একটু নুয়ে থাকা ভদ্রলোকটার চোখের ভেতর এত তীক্ষ্ণ দৃষ্টি লুকিয়ে থাকতে পারে! সাধারণ চেহারার মানুষটার মাথার ভেতরে যে এমন অসাধারণ বুদ্ধি লুকিয়ে আছে তা দেখলে কেউ বুঝতেই পারবে না। ব্যবহারেও তিনি অসম্ভব অমায়িক। আমার বিশ্বাস, লোকটাকে সবটা খুলে বললে তিনি নিশ্চয়ই আমাদের সাহায্য করবেন।’
সারা সবটা শোনার পর একটু দ্বিধাগ্রস্ত গলায় বললো,’কিন্তু তিনি কি শহর থেকে এতদূর আসতে রাজি হবেন?’
পিয়াস কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে বললো,’প্রশান্তকে বলি। দেখি, সে যদি রাজি করাতে পারে।’
‘তাহলে সেটাই করো। দেখা যাক, ভদ্রলোক রাজি হন কি না।’
‘আচ্ছা দাড়াও আমি এখনই ফোন করছি।’
এই বলে বিছানার ওপর থেকে মোবাইলটা তুলে নিয়ে পিয়াস ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। সারা একা বিছানায় বসে রইলো। মাথার ভেতর একের পর এক দৃশ্য ভেসে উঠছে তার,রিম্পার হাসিমুখ, হঠাৎ পাওয়া সেই নিথর দেহ, আর প্রশ্নের পর প্রশ্ন। সবকিছু যেন কোনো অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা, কিন্তু গিঁটটা কোথায় সেটাই বোঝা যাচ্ছে না।
কিছুক্ষণ পর পিয়াস ঘরে ফিরে এসে বললো,’প্রশান্তকে সব খুলে বলেছি। সে বলেছে, একটু পর জানাবে।’
‘আচ্ছা। উনি যদি রাজি না হন, তাহলে থানায় গিয়ে সবটা খুলে বলো। তারপর যা হওয়ার হবে।’
ঠিক তখনই পিয়াসের ফোনটা বেজে উঠলো। সারা কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। পিয়াস চোখের ইশারায় তাকে চুপ থাকতে বলে কলটা রিসিভ করলো।
ওপাশ থেকে প্রশান্ত বললো,’পিয়াস… রুদ্র দা রাজি হয়েছে।’
পিয়াস নিঃশ্বাস ছাড়লো, কিন্তু প্রশান্তর পরের কথায় সে আবার গম্ভীর হয়ে গেল।
‘তবে শর্ত আছে। দু’দিন সবকিছু দেখে শুনে যদি ওনার মনে হয় ঘটনার একটা সমাধান বার করতে পারবেন, তবেই তিনি পুরোপুরি জড়াবেন। নাহলে আবার শহরে ফিরে আসবেন।’
পিয়াসের ঠোঁটে হালকা একটা হাসি ফুটে উঠলো। কণ্ঠে কৃতজ্ঞতা আর আশা মিশিয়ে বললো,’রুদ্র দা আমার মতো একজনের ডাকে এতদূর আসতে রাজি হয়েছেন এটাই অনেক। বাকিটা ভাগ্যের হাতে। যা হওয়ার হবে। তাও তো জানবো চেষ্টা করেছিলাম আমি।’
প্রশান্ত আবার বললো, আচ্ছা আরেকটা কথা, তোদের ওখানে আশপাশে কোনো হোটেল আছে তো? রুদ্র দা কিন্তু কারো বাড়িতে থাকেন না।’
‘ওসব নিয়ে চিন্তা করিস না। আমি সব ব্যবস্থা করে রাখবো। পারলে তুইও চলে আয়।’
‘যেতে পারলে তো ভালোই হতো,এমন দিনে তোর পাশে থাকতে পারতাম। তবে অফিসে অনেক কাজের চাপ রে। দেখি চাপ কমলে একদিন গিয়ে আংকেল-আন্টি আর বৌদির সাথে দেখা করে আসবো। আর হ্যাঁ আমি রুদ্র দা কে তোর ফোন নাম্বার আর গ্রামের বাড়ির ঠিকানা দিয়ে দিয়েছি। দাদা তোকে তার সময় করে কল দিয়ে কথা বলে যা যা জানার জেনে নেবে বুঝলি।’
‘আচ্ছা ঠিক আছে। অনেক বড় উপকার করলি আমার।’
‘উপকার বলছিস কেন,তোর বোন কি আমার বোন নয়? বরং আমার নিজের কাছেই খারাপ লাগছে তোর এমন বিপদের দিনে পাশে থাকতে না পেরে। তবে রিম্পার খুনি যদি ধরা পড়ে সবার আগে আমাকে আগে খবর দিবি কিন্তু।’
তারপর আরও কিছুক্ষণ দু’জন কথা বলার পর কল কেটে দিলো পিয়াস। রুদ্র দা আসতে রাজি হয়েছে শুনে পিয়াসের মাথা থেকে যেন অনেকটা দুশ্চিন্তা কমে গেলো এবার। তার বিশ্বাস রুদ্র দা এখানে আসলে নিশ্চয় কিছু একটা করে তবেই ফিরবে।
….
পরদিন সকালে সারার ডাকে পিয়াসের ঘুম ভাঙলো।
সারা তাকে ডাক দিয়ে বললো,‘তোমার খোঁজে কে জানি এসেছে।’
ঘুম জড়ানো চোখে পিয়াস প্রশ্ন করলো,‘কে এসেছে?’
‘আমি চিনিনা তো। তোমার খোঁজ করছিলো। বাইরে বসিয়ে রেখেছি, বাবার সাথে গল্প করছে।’
কথাটা শুনতেই পিয়াসের ঘুমের রেশ কেটে গেলো। চোখ মেলে একবার জানালার বাইরে তাকালো সে। বাইরে তখনো ঠিকমতো রোদ ওঠেনি। ঘন কুয়াশায় চারদিক অন্ধকারাচ্ছন্ন,যেন ভোরটা এখনো রাতের গা ছাড়াতে পারেনি। চটজলদি মোবাইলটা হাতে নিয়ে সময়টা একবার দেখলো পিয়াস-ভোর ছয়টা বেজে পঁচিশ মিনিট।
এই সাতসকালে আবার কে এসেছে?
হঠাৎ মনে হলো, রুদ্র দা নয় তো? লোকটা এমনিতেই খামখেয়ালি। প্রশান্তর মুখে সবটা শুনে হয়তো রাতেই রওনা দিয়ে দিয়েছে।
ভাবতে ভাবতেই পিয়াস হুড়মুড়িয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লো। প্রায় হন্তদন্ত হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো সে। বাইরে এসে দেখলো বারান্দায় দুটো চেয়ারে পাশাপাশি দুজন বসে আছে;একজন তার বাবা, আর অপরজনের আপাদমস্তক কালো চাদরে ঢাকা। মুখটা ঠিকমতো বোঝা যাচ্ছে না।
পিয়াস ধীরে ধীরে সেদিকে এগিয়ে গেলো।
কাছাকাছি যেতেই চিনতে পারলো;না, রুদ্র দা নয়। এটা তার বন্ধু সাদিক।
কিন্তু এত ভোরে, এত তাড়াহুড়ো করে সাদিক কেন এসেছে, সেটাই বুঝে উঠতে পারলো না পিয়াস। তাকে দেখে সাদিক একটু নড়েচড়ে বসলো, তারপর বললো,‘গতকাল আমি গ্রামে ছিলাম না। একটা কাজে শহরে গিয়েছিলাম। রাতে ফিরে মায়ের মুখে সবটা শুনে ভেবেছিলাম তখনই একবার এসে তোদের সাথে দেখা করি। কিন্তু অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল, তাই আর আসিনি। তাই ভোর হতে না হতেই চলে এলাম।’
একটু থেমে সে আবার বললো,‘রিম্পার মৃত্যুর খবরটা শুনে খুব খারাপ লেগেছে। খুব কষ্টও পেয়েছি। কেন করলো রিম্পা এমনটা? কিছু জানতে পেরেছিস?’
পিয়াস গম্ভীর চোখে সাদিকের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো,কোনো কথা বেরুলো না তার মুখ থেকে। শুধু ধীরে না-সূচক মাথা নাড়িয়ে বুঝিয়ে দিলো।
পিয়াসের এই নীরবতা দেখে সাদিক আর বেশি কথা বাড়ালো না। সামনে বসে থাকা আজিজুল হকের দিকে তাকিয়ে বললো,‘আচ্ছা চাচা, আমি উঠি তাহলে। অন্য একসময় আবার আসবো।’
কথাটা বলেই সে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়ালো,তারপর হনহন করে কুয়াশার ভেতর হারিয়ে গেলো সাদিক।
সাদিক চলে যাওয়ার পর পিয়াস কিছুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে থাকার পর আজিজুল হকের দিকে তাকিয়ে বললো,’ বাবা, মা কি করছে? উঠেছে?’
‘কেউ ঘুমালে তো উঠে। তোর মা তো সারারাতের ভিতরে একবারো চোখের পাতা এক করতে পারেনি। রিম্পার চলে যাওয়াতে খুব করে ভেঙে পড়েছে রে খোকা। মেয়েটা যে কেন এমন কঠিন একটা সিদ্ধান্ত নিলো! আচ্ছা বউমার সাথে তো রিম্পার খুব সখ্যতা ছিলো বউমা কিছু জানেনা?’
‘বলার মত কিছু জানলে তো সারা অবশ্যই আমাকে বলতো।’
আজিজুল হক একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে সিলিংয়ের দিকে মুখ তুলে তাকিয়ে রইলেন। তারপর দৃষ্টি না ফিরিয়েই বললেন,’ খোকা বউমাকে এক কাপ চা দিতে বলবি একটু। মাথাটা খুব ধরেছে।’
‘আচ্ছা বলছি।’
কথাটা বলে পিয়াস প্রস্থান নিয়ে সারাকে, বাবার জন্য এক কাপ চা দিতে বলে মায়ের রুমে ঢুকলো। দেখলো,মা পিঠের নিচে একটা বালিশ দিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে মুমূর্ষু রোগির মত বসে আছেন। চোখের দৃষ্টি ঝাপসা,ভিতরটা ছলছল করছে।
পিয়াস ধীর পায়ে ভিতরে ঢুকে মায়ের কাছে এগিয়ে গিয়ে চুপটি করে বসলো। তারপর মায়ের একটা হাত নিজের হাতে নিয়ে বললো,’মা, এভাবে কান্না করতে থাকলে তো তুমি নিজেও অসুস্থ হয়ে পড়বে। সন্তান হারা বাবা-মায়ের কষ্ট টা এখনো অনুভব করার মত শক্তি আমার হয়নি কিন্তু চোখের সামনে বাবা-মায়ের এমন পাথর হয়ে যাওয়ার কষ্ট টা যে আমি সইতে পারছি না মা।’
নূর জাহান বেগম ছেলের কথাগুলো শুনে কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন পিয়াসের দিকে। তারপর ছেলেকে জড়িয়ে ধরে ছোট বাচ্চার মত ডুকরে কেঁদে ফেলে বললেন,’ মেয়েটা কেন এমন করলো খোকা? একটা বারও কি আমাদের কথা মনে পড়লো না তার? আমি মা হয়ে মেয়ের মৃত্যু যন্ত্রণা কীভাবে সইবো একবারো ভাবলো না। রিম্পার মুখটা যে একটুর জন্যও আমার চোখের সামনে থেকে সরছে না।’
পিয়াস মায়ের প্রশ্নের উত্তরে কি বলবে কিছুই বুঝে উঠতে না পেরে মাথা নিচু করে মায়ের হাতটা নিজের হাতে নিয়ে চুপচাপ বসে রইলো।
…..
রিম্পা মারা যাওয়ার আজ তৃতীয় দিন। এই ক’দিনে পিয়াসদের বাড়িতে খাবার হয়নি। আশপাশের মানুষজন আর নিকটাত্মীয়রা যে যেমন পেরেছে, তাই নিয়ে এসেছে। সেগুলো দিয়েই কোনোমতে দিন কাটছে সবার। কারো মুখে ঠিকমতো কথা নেই, চোখেমুখে শুধু শোক আর ক্লান্তির ছাপ।
পিয়াসের ছুটি শেষ হয়েছে এক দিনের বেশি হয়ে গেছে। তবুও এই পরিস্থিতিতে চাকরির কথা ভাবার মতো মানসিক অবস্থা তার নেই। তার কাছে মনে হচ্ছে, এই মুহূর্তে অফিসের দায়িত্বের চেয়ে পরিবারটাই বেশি জরুরি। বাবা-মায়ের ভেঙে পড়া মন, ঘরের স্তব্ধতা,সবকিছুর মাঝেই তার উপস্থিতি দরকার।
পিয়াসের বাবার বাজারে একটা পাইকারি মুদির দোকান আছে। খুব বড় না হলেও একেবারে ছোটখাটোও নয়। এতদিন দোকানটা আজিজুল হক দুজন বিশ্বস্ত কর্মচারী দিয়েই সামলাতেন। কিন্তু রিম্পার মৃত্যুর পর থেকে আজিজুল হক আর দোকানে যাননি। কর্মচারী দুজনও এই ফাঁকে ছুটি কাটিয়েছে। এদিকে বিভিন্ন মহাজনদের ফোন কল আর সাদাই বেচা কেনার তাগাদা দেখে পিয়াস নিজে নিজে একটা সিদ্ধান্তে এসেছে। সে আর শহরে ফিরে যাবে না। চাকরিটা সে ছেড়ে দেবে। তারপর চাকরি ছেড়ে
বাবার দোকানটা এবার সে নিজেই দেখবে।
আজ সকালে প্রস্তুত হয়ে বাবার কাছে নিজের সিদ্ধান্ত জানাতেই আজিজুল হক কিছুক্ষণ চুপ করে ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর চোখে-মুখে একরাশ স্বস্তি নিয়ে মৃদু হাসলেন। কোনো প্রশ্ন না করে, কোনো দ্বিধা না দেখিয়ে তিনি দোকানের চাবির গোছাটা ছেলের হাতে তুলে দিয়ে বললেন,’এখন থেকে সবটা তোর উপরে তুলে দিলাম। দোকানটা আমাদের পৈতৃক, সেটাকে নষ্ট করিস না।’
পিয়াস বাবার আদেশ মেনে নিয়ে দোকানের উদ্দেশ্যে রওনা দিলো। তিনদিন দোকান বন্ধ থাকায় দোকানের ভিতরে বেশ ধুলো জমে গিয়েছে। দুজন কর্মচারীকে সাথে নিয়ে এক দ্বিপ্রহর দোকানের ধুলো পরিস্কার করতেই কেটে গেলো পিয়াসের। তারপর একটু স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেলে দুপুরের খাবার খেয়ে একটু বিশ্রাম নেবে ঠিক করলো এমন সময় কারও রাশভারী কণ্ঠস্বরে পিয়াস থমকে গেলো।
‘এইযে ইয়াং ম্যান,কেমন আছো?’
পরিচিত অনেক দিনের পুরোনো সেই কণ্ঠস্বর শুনে পিয়াস চটজলদি ঘুরে তাকালো মানুষটার দিকে। মানুষটাকে দেখে পিয়াসের বিস্ময়ে চোখ বড় বড় হয়ে গেলো! বিস্মিত স্বরে বলে উঠলো,‘রুদ্র দা…!’
চলবে…
#আশিক_মাহমুদ

