মেঘের খামে উড়োচিঠি পর্ব-৩১+৩২

0
299

#মেঘের_খামে_উড়োচিঠি
লেখনীতে : তামান্না বিনতে সোবহান
পর্ব – একত্রিশ

কার্টেসিসহ কপি করা সম্পূর্ণ নিষেধ!

ভালোবাসার মানুষের মুখ থেকে ‘ভালোবাসি’ শোনার মধ্যেও অন্যরকম এক আনন্দ আছে। এই আনন্দ যখন সমস্ত শরীর ও মনের প্রতিটা কোণায় কোণায় পৌঁছায়, প্রিয় মানুষটার ওপর সামান্যতম রাগ-অভিমান থাকলে সেটুকুও হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। ভালোবাসার কাছে সব রাগ, সব অভিমান তুচ্ছ হয়ে যায়। নিজের প্রিয়জনের ওপর বিন্দু পরিমাণ রাগ না থাকলেও তার পাঠানো ভয়েস শোনে পুরো রুম কাঁপিয়ে হাসলো ফারশাদ। ভাগ্যিস হাসির শব্দটা কেউ শুনছে না। শুনলে তাকে পাগল উপাধি দিত। এখন নিউজিল্যান্ড সময় রাত বারোটা। গভীরঘুমে থাকার সময়। কাল সকালে যেহেতু ম্যাচ আছে, ঘুম না হলে তারই ক্ষতি। একাধারে বেশ কয়েকবার ভয়েস শোনে, ঠোঁটে প্রশান্তির হাসি নিয়ে লিখল,

-‘গুড নাইট।’

একটা রোমান্টিক কবিতার মাধ্যমে মনের সব ভাব-ভালোবাসা প্রকাশ করার পর কারও মুখ থেকে ফিরতি ‘ভালোবাসি’ শোনার বদলে ম্যাসেজ এলো, ‘গুড নাইট’। এটা দেখে মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেল উজমার। গাড়িতে উঠে বাড়ির দিকে রওনা দিল। রিটার্ন কোনো ম্যাসেজ পাঠাল না। বাইরের দিকে দৃষ্টি দিয়ে মন খারাপটাকে দূর করার চেষ্টা করছিল। এরমধ্যেই আরেকটা ম্যাসেজ এলো,

-‘হঠাৎ এরকম একটা ভয়েস পাঠালেন যে!’

গাড়িতে বসেই ম্যাসেজ সিন করল উজমা। লিখল,
-‘ইচ্ছে হয়েছে, তাই। কেন, বিরক্ত হলেন?’

-‘উঁহু, এরকম ম্যাসেজ দিনে দশটা এলেও বিরক্ত হব না।’

-‘ফোন ধরছিলেন না, কেন?’

-‘আপনি তো ব্যস্ত ছিলেন, তাই। তাছাড়া, এখন আমার ঘুমোনোর সময়।’

-‘আমি একবারও বলেছি আমি ব্যস্ত? মিথ্যে অজুহাত না দেখিয়ে এটা বলুন যে, আপনি আমার ওপর রাগ করেছেন।’

ম্যাসেজের ওপর রাগের রি’অ্যাক্ট বসাল ফারশাদ। সঙ্গে সঙ্গে রিপ্লাই দিল,
-‘অদ্ভুত! এমন কথা আপনি ভাবলেন কী করে? দুনিয়া উলটে গেলেও আমি আপনার ওপর রাগ করব না। বন্ধুরা জীবনের একটা অংশ এটা আমি জানি। আমার আগে ওদের সাথে আপনার পরিচয় হয়েছে, সম্পর্ক এগিয়েছে, ভরসা এসেছে। ওরা সবাই আপনাকে যথেষ্ট ভালোবাসে বলেই, আপনার বিদায়ের কথা ভেবে কষ্ট পাচ্ছে। আর ওদের কষ্টের কথা ভেবেই আমার খারাপ লাগছে। মনে হচ্ছে, আপনার সাথে আমি জড়াচ্ছি বলেই, এত চমৎকার একটা সম্পর্কের মধ্যে দূরত্ব তৈরী হতে যাচ্ছে। বাটারফ্লাই, আমি আপনাকে ভালোবাসি। ভালোবাসি আপনার ভালো-মন্দে জড়িয়ে থাকা প্রত্যেকটা মানুষকে। আমি তো গতদিনই বলেছিলাম, ফোনে কথা বলার সময় আপনার কান্না-হাসি আমার মনের ওপর খুব প্রভাব ফেলে। দুটো হাতে আপনাকে ছুঁয়ে দেয়ার ইচ্ছে জাগে। আমি নিজেকে সামলাতে পারি না। ছুটে যেতে ইচ্ছে হয়। সবটুকু দূরত্ব গুছিয়ে ফেলতে ইচ্ছে হয়। কিন্তু আমি অপারগ। যে পেশায় আমি জড়িয়ে আছি, তার প্রতি আমার একটা দায়িত্ব-কর্তব্য আছে। ইচ্ছে থাকলেও আমি সেই দায়িত্ব-কর্তব্যকে অবহেলা কর‍তে পারি না। তাই আপনাকে ছুঁয়ে দেয়ার তীব্র ইচ্ছা বুকে নিয়ে আরও কিছুদিন নিউজিল্যান্ডেই থাকতে হবে আমাকে। এত এত ইচ্ছে ও অনুভূতি বুকের ভেতর জমা রেখে দিন অতিবাহিত করা ভীষণ ধৈর্যের। তারমধ্যে একবার কথা বললে আপনি দশবার ফুঁপিয়ে উঠেন। হারানোর ভয়েই আপনি কাঁদেন, এটা আমি জানি। আর জানি বলেই, আপনার কষ্টে বুক ভেঙে আসে। এজন্য আমি চাই, যতদিন না আমরা মুখোমুখি হচ্ছি, ততদিন আপনার কান্না-হাসির শব্দ না শোনে থাকতে। এমনিতেই আমি নার্ভাস হয়ে যাই, আগামীর কথা ভাবতে গিয়ে। তারমধ্যে আপনার অসহায় কণ্ঠস্বর আমাকে আরও দুর্বল করে দেয়। যার কারণে আমি চেয়েছিলাম, ফোনে কথা বলব না আর। একেবারে সরাসরি আপনার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলব। এর ভেতরে আমাদের যত কথা হবে, সব লিখিত হবে, এই ইনবক্সে হবে।’

একটা ছোট্ট কথার পিছনে এত দীর্ঘবিস্তৃত অনুভূতি লুকিয়ে থাকতে পারে, জানা ছিল না উজমার। সম্পূর্ণ ম্যাসেজ বার দু’য়েক পড়ে রিপ্লাইতে লিখল,

-‘সত্যি তো, রাগ করেননি?’

ঠোঁটমুড়ে হাসলো ফারশাদ। উজমাকে জ্বালাতে বলল,
-‘হ্যাঁ, রাগ করেছি। ভীষণ রাগ করেছি। এখন আমার রাগ ভাঙান।’

হা হা রি’অ্যাক্ট দিয়ে উজমা ফের লিখল,
-‘ফাজিল…। এখন আমি রাগ ভাঙাতে পারব না। গাড়িতে আছি।’

-‘রাগ যখন ভাঙাতেই পারবেন না, তাহলে জানতে চান কেন?’

-‘বেশ করেছি।’

-‘ঘুমের বারোটা বাজিয়েছেন। এখন আমি ঘুমোবো কী করে?’

-‘আমি আবার ঘুমের বারোটা বাজালাম কীভাবে?’

-‘কীভাবে আবার? ভয়েস পাঠিয়ে। এখন আরেকটা ভয়েস নোট পাঠান। এমনকিছু বলুন, যেন আমার দু’চোখে ঘুম নেমে আসে। ওহ হ্যাঁ, আরেকটা কথা। এরপর আর আপনি-আজ্ঞে করবেন না। যা বলবেন, অবশ্যই তাতে ‘তুমি’ সম্বোধন রেখে বলবেন। ঠিক আছে?’

ম্যাসেজের রিপ্লাইতে কী লিখবে, ভেবে পেল না উজমা। এত সহজে তুমিতে নামতে লজ্জা লাগছে। আবার ভয় হচ্ছে, বিয়ের কয়েকদিন আগেই যেভাবে বিয়ে ভেঙে যায়, এবারও যদি সেরকম কিছু হয়, মনকেই বা সামলাবে কী করে! সমাজ ডিঙিয়ে ভালোবাসাকেই বা জয় করবে কীভাবে! মনের ভয়কে মনে আগলে নিয়ে ফারশাদের কথাকে গুরুত্ব দিতে চাইল। কিন্তু আপনি ছেড়ে তুমিটা সহজে মুখে এলো না। একসময় অসন্তুষ্ট মেজাজে লিখল,

-‘ভয়েস দিতে পারব না। ডানে-বামে অনেক প্যাসেঞ্জার আছে, তারা হাসবে।’

-‘তাইবলে আমি ঘুমোবো না?’

-‘আপনাকে তো ঘুমোতে নিষেধ করিনি। আপনি ঘুমোন।’

-‘এভাবে তো ঘুম আসবে না।’

ভালোবাসার মানুষের সাথে অকারণ বকবক করাতেও বুঝি শান্তি। এই সাধারণ কিছু কথাবার্তা, এতেও হৃদয়ঘর তৃপ্ত, সন্তুষ্ট, আনন্দে আত্মহারা। আশেপাশের মানুষ ও পরিস্থিতি বিবেচনা করে ফোন ব্যাগে ঢুকানোর আগে মনের সবটুকু অনুভূতিকে এক করে লিখল,

-‘আমি একটা কবিতা লিখব, সেই কবিতার নাম দিব, মেঘের খামে উড়োচিঠি। উৎসর্গে রাখব, আপনার নাম। কবিতার প্রতিটা শব্দে ও বাক্যে থাকবে আপনার উপস্থিতি। থাকবে আপনাকে ঘিরে সাজানো আমার মনের অসংখ্য অব্যক্ত অনুভূতি। যে অনুভূতিগুলো আমি মুখ দিয়ে প্রকাশ করতে পারব না, সেগুলো কবিতার প্রতিটা পঙক্তিতে তুলে ধরব। এরপর সেই কবিতা উড়োচিঠির মাধ্যমেই আপনার ঠিকানায় পাঠাব। সেই ঠিকানায়, যেখানে হৃদয় বসত করে। আপনি পড়বেন তো?’

***

রৌদ্রজ্বল এক দুপুরে ঘটা করে কাউকে কিছু না জানিয়ে পুলিশের এস আই সৌরভ চ্যাটার্জিকে সঙ্গী করে সাজ্জাদ ওয়াজেদ উপস্থিত হোন বাড়িতে। দু’দুটো বিয়ে নিয়ে সবাই বেশ ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে। কেনাকাটার প্রস্তুতি নিচ্ছিল সবে। ফারিশা জানিয়েছে সে মার্কেটে উপস্থিত থাকবে, উসাইদ যেন দুই বোনকে সাথে নিয়ে বেরোয়। এমতাবস্থায় বাড়ির আঙিনায় পুলিশের এস আইসহ নিজের আপন চাচাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে প্রত্যেকেই অবাক হলো। ভদ্রতা রক্ষার্থে মিশকাত এগিয়ে গিয়ে বলল,

-‘চাচ্চু, আপনি হঠাৎ?’

সাজ্জাদ ওয়াজেদ সবার মুখের ভাবভঙ্গি খেয়াল করে বুঝলেন, তাঁর উপস্থিতি কেউ আশা করেনি, সহজে গ্রহণও করেনি। হয়তো এটাই স্বাভাবিক, তবুও মনে কিঞ্চিৎ ব্যথা পেলেন। একটা সময় তিনি সবার ওপর অবিচার করেছিলেন। সবাইকে বাপ-দাদার ভিটা থেকে বিদায় করেছিলেন। সব সম্পত্তির ওপর নিজের আধিপত্য দেখাতে অসুস্থ মানুষটাকে কতভাবে হেনস্তা করেছিলেন। এই নিয়ে এতদিন অনুশোচনা না জন্মালেও এখন মনে হচ্ছে, রক্তের সাথে বেঈমানী করার কারণে করুণাময় তাঁকে পদে পদে অপমান করছেন, শাস্তি দিচ্ছেন। পাপের বোঝা বেড়ে গেছে বলেই হয়তো, সমাজে মুখ দেখানোর মতো মুখ আর তার থাকছে না। ভদ্রলোকের থমথমে মুখ দেখে কিছু বোঝার উপায় রইল না। উজমা চোখের ইশারায় সৌরভকে বলল,

-‘কী হয়েছে? মামলা করেছেন উনি?’

চোখের ইশারায় না বোঝাল সৌরভ। শামীমকে নিয়ে পেপারে যা কিছু ছাপা হয়েছে, তা নিয়ে সাজ্জাদ ওয়াজেদ ভীষণ পেরেশানিতে পড়েছেন। এরমধ্যে আবার শাম্মার জীবনেও ঝড় নেমে এসেছে। সদ্য বিয়ে হয়েছে মেয়েটার। ঘর-সংসার বুঝে ওঠার আগেই যদি ঝড়তুফান নেমে আসে, কীভাবে সামলাবে? তিনি-ই বা বাবা হয়ে মেয়ের জীবনটা ভেঙে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচাবেন কী করে? যা কিছু সত্য তা প্রকাশ হওয়ার পর এখন আবার সবকিছু মিথ্যা বলে ধামাচাপা দেয়াও কষ্টের। একদিকে ছেলের জীবন, একদিকে মেয়ে, অন্যদিকে নিজের এতদিনের যত্ন করে গড়ে তোলা মান-সম্মানের অকাল ধ্বংস তিনি মেনে নিতে পারছেন না। তা-ই মেয়ের জীবন বাঁচাতে আইনের আশ্রয় যেমন নিচ্ছেন, তেমনই ছেলের জীবন ও নিজের সম্মান বাঁচাতে উসমান ওয়াজেদের কাছে হাতজোড় করে ক্ষমা চাইতে এসেছেন। পুরো কথা খুলে বলার আগে উসাইদকে উদ্দেশ্য করে সৌরভ বলল,

-‘যদি আমাদের পাঁচ মিনিট সময় দেন, আমরা আপনার বোনের সাথে জরুরী কিছু কথা বলতে চাই। ঠিক আমি নই, আপনার চাচা কথা বলতে চাইছেন। ওনার অনুরোধেই আসতে হয়েছে আমাকে।’

উসাইদ নিজের চাচার দিকে তাকিয়ে জানতে চাইল,
-‘কী হয়েছে, চাচ্চু? কোনো সমস্যা?’

বড়ো অসহায়বোধ করলেন সাজ্জাদ ওয়াজেদ। লজ্জাজনক কথা কীভাবে বলবেন, মেয়ের সংসার কীভাবে বাঁচাবেন, সেটা ভেবেই নিজেকে তিনি চরম ধৈর্য্যহারা ও সর্বহারা অবস্থায় আবিষ্কার করলেন। কোনোমতে বললেন,

-‘শামীমের ব্যাপারটা হয়তো শুনেছ তোমরা। ওর ওই দুর্ঘটনার পর সাকিব নানানরকম অত্যাচার করছে শাম্মার ওপর। ও বলেছে, যেকোনোদিন শাম্মাকে ডিভোর্স দিবে আর উজমার জন্য বিয়ের প্রস্তাব পাঠাবে আবার। মেয়েটা সবে সংসার শুরু করেছে। এরমধ্যে এইসব ঝামেলা ও নিতে পারছে না।’

উসাইদ নীরবে ভাবল। ভদ্রলোক ও এস আইকে ভেতরে এনে বসালো। চা-নাশতার ব্যবস্থা করে বলল,
-‘আমরা কি করতে পারি, চাচ্চু? আপনার তো আইনের আশ্রয় নেয়া উচিত। সাকিব আইনের লোক হয়ে স্ত্রীর ওপর অমানবিক নির্যাতন কেন করছে?’

-‘আমরা তো আইনের আশ্রয় নিচ্ছি, বাবা। তবুও বলতে এলাম যে, যদি সাকিব এরকম কিছু করতে চায় বা আবারও বিয়ের প্রস্তাব দেয়, ওকে তোমরা পাত্তা দিও না।’

তাচ্ছিল্যভরা কণ্ঠে উসাইদ বলল,
-‘আপনি কী করে ভাবলেন চাচ্চু, ওই অমানুষটাকে আমি আমার বাড়িতে ঢুকতে দেব?’

-‘যত যা-ই হোক, সরকারি চাকরি করে। তাছাড়া উজমার জন্যই শাম্মার সংসারে আজ অশান্তির সৃষ্টি হয়েছে। ও যদি শামীমকে…।’

-‘ব্যস, অনেক কথা বলে ফেলেছেন। এবার আপনি যেতে পারেন। আমার বাবা-মা কোনোকালে লোভী ছিল না, আমরাও হইনি। টাকা-পয়সার চেয়ে আমাদের কাছে সম্মানটাই অনেক বড়ো।’

-‘আমি সেটা বলছি না। তবুও যদি আসে আরকি।’

-‘দেখুন, শামীম, শাম্মা কিংবা সাকিব, এই তিনজনকে নিয়ে কোনো আলাপেই আমি যাব না আর। আপনি নিজের সন্তান মানুষ করতে পারেননি, সেটা আপনার ব্যর্থতা। সাকিবের সাথে উজমার বিয়ে দিয়ে দেব, ভালো ঘর, ভালো সংসারে পা রাখবে ও, সেই লোভে আপনারাই শাম্মাকে ওর ঘাড়ে গছিয়ে দিয়েছেন। উজমার নামে বদনাম রটিয়েছেন। এতকিছুর পরও আমরা আপনাদের ওপর কোনো অভিযোগ দিইনি। আজ শামীমের সাথে যা হয়েছে, এর সম্পূর্ণ দায়ভার ওর। তাছাড়া, শাম্মার জীবন নষ্ট করার জন্য আপনি ও আপনার পরিবারের লোকজন দায়ী। আমার বোন নয়। তাই পরবর্তীতে আমার বোনের নামে অভিযোগ আনার আগে, অবশ্যই আপনি একবার নিজের দিকে তাকাবেন।’

-‘আমি চাইলে কিন্তু উজমার নামে মামলা করতে পারি।’

-‘ঠিক আছে, করুন।’

সাজ্জাদ ওয়াজেদ খুব বিব্রতবোধ করলেন। এরা যে কীভাবে এত সাহস পায় বুঝে উঠতে পারলেন তিনি। উজমাকে যদি পথ থেকে না সরান, তাহলে শাম্মার জীবন নষ্ট হয়ে যাবে। বাবা হয়ে তিনি তো নিজের সন্তানের ঘর-সংসার ভেঙে যাওয়া দেখতে পারছেন না। শক্তি ও ধৈর্য্য কিছুই নেই তার। যেভাবে হোক, মেয়ের সংসার তাকে বাঁচাতে হবে। তিনি ভেবেচিন্তে বললেন,

-‘শামীম আমাকে সব বলেছে। ওর এই অবস্থার জন্য উজমাই দায়ী।’

-‘দায়ী তো মামলা করছেন না কেন, আপনি? করুন। প্রমাণ দিন, কীভাবে আমার বোন আপনার ছেলের এই অবস্থা করল! কেউ কি স্বেচ্ছায় কাউকে খুন করে, যদি পরিস্থিতি তৈরী না হয়?’

-‘ঠিক আছে। আমি মামলায় যাচ্ছি। এত সহজে আমি আমার মেয়ের জীবন নষ্ট হতে দিব না।’

সাজ্জাদ ওয়াজেদ ও এস আই চলে যাওয়ার পর চিন্তিত মন নিয়েই সোফায় বসে রইল উজমা। উসাইদ বোনকে সাহস দিয়ে বলল,
-‘ভয় পাওয়ার কিছু নেই। তুই যা, শপিং শেষ করে আয়। আমি লইয়্যারের সাথে কথা বলছি।’

***

থানায় গিয়ে মামলা লিখাতে গিয়ে সাজ্জাদ ওয়াজেদ পড়লেন বিপদে। লইয়্যার মামলা নিচ্ছে না। কেন নিচ্ছে না, সে-ই ভালো জানে। টাকা-পয়সা দিয়ে একজনের কাছে মামলা লিখালেন ঠিকই কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যে অন্য একজন লইয়্যারের আদেশে মামলাটা ওখানেই চাপা পড়ে গেল। তিনি ত্যক্তবিরক্ত মন নিয়ে এস আই সৌরভের সামনে এসে বললেন,

-‘কী ব্যাপার, আপনারা মামলা নিচ্ছেন না কেন?’

এস আই সৌরভ মনোযোগ দিয়ে একটা কেইস দেখছিল। সে খাতাপত্র ওল্টাতে ওল্টাতে বলল,
-‘নিব না কেন? নিয়েছে তো।’

-‘নিলে আধঘণ্টার মধ্যে মামলা ডিশমিশ হয়ে যায়?’

সৌরভ খাতাপত্র ভাঁজ করে একপাশে রেখে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
-‘আপনার ছেলেই তো এই মামলা লিখাতে চাইছে না। সে দোষ নিজের ঘাড়ে নিচ্ছে। এমন কোনো প্রমাণও নেই যে, মিস উজমা ওয়াজেদাহ তাকে নপুংসক করেছেন।’

-‘আপনারা এইভাবে পালটি খেতে পারেন না। ও দোষী। ও আমার ছেলেকে মেরেছে। ওর পর্যাপ্ত সাজা হওয়া উচিত।’

-‘সঙ্গে সঙ্গে জামিন হয়ে গেলে তাকে অ্যারেস্ট করার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।’

-‘এরমধ্যেই কে তার জামিন হয়ে গেল? কার কথায় আপনি তাকে অ্যারেস্ট করবেন না বলে সিদ্ধান্ত নিলেন?’

-‘প্রথমত, তার নামে কোনো অভিযোগ নেই। আপনি যে অভিযোগ দিচ্ছেন, সেটার প্রমাণ নেই। দ্বিতীয়ত আপনার ছেলে নিজেই বলেছে, মিস উজমা ওয়াজেদাহ’র কোনো দোষ নেই। তৃতীয়ত, মামলা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার জামিন হয়েছে তিনজন, একজন মিসের ভাই উসাইদ বিন ওয়াজেদ অন্যজন মিসের ফিয়ান্সে, সৈয়দ ফারশাদ মুনতাসীর। আর তৃতীয়জন আপনার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এস আই সৌরভ চ্যাটার্জি। বোঝা গেছে?’

একটা মামলা ডিশমিশ করতেও তো অনেক টাকার দরকার। ইতিমধ্যে এত টাকা কোথায় পেল উসাইদ? এই সৈয়দ ফারশাদ মুনতাসীর আবার কে! উজমার হবু স্বামী! বিয়েই বা ঠিক হলো কবে? উসাইদ তো তাকে কিছু জানাল না। না-কি একেবারে, পরিবারের বাইরের লোক ভেবেই দূরে সরিয়ে রাখল? তিনি ওখানে বসেই উসাইদের নম্বরে ফোন করলেন। রিসিভ হতেই বললেন,

-‘উজমার বিয়ে ঠিক করলে কবে? জানাওনি কেন?’

-‘স্যরি, চাচ্চু। জানানোর প্রয়োজন মনে করিনি। আমার বোনের জন্য যারা বিপজ্জনক তাদেরকে আমি ওর কাছেপাশেও আসতে দেব না। এজন্যই আরকি…।’

-‘মামলা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জামিন কীভাবে করলে তুমি? এত টাকা কোথায় পেলে?’

-‘সেই হিসেব তো আমি আপনাকে দেব না। অযথা বিরক্ত না করে, নিজের ঘরের খেয়াল রাখুন। আমরা তো আপনাদের কোনো ক্ষতি করছি না। তাহলে যেচেপড়ে কেন আমাদের পিছনে পড়ে আছেন?’

লজ্জিত হয়ে ফোন রেখে থানা থেকে বেরিয়ে গেলেন সাজ্জাদ ওয়াজেদ। সৌরভ পিছনে থেকে মুচকি হাসলো শুধু। ছেলে মানুষ করতে পারেননি সে-ই দোষ দেখবেন না, অন্যের নির্দোষ মেয়েকে শাস্তি দিতে আসবেন! এমন আজিব কিসিমের মানুষ যে দুনিয়ায় কেন আসে, বুঝে আসে না তার। সে কাজে ডুব দিতে গেলেই ল্যান্ডলাইন বেজে উঠল। টেলিফোন কানে ঠেকাতেই ফারশাদ বলল,

-‘উনি কি চলে গেছেন?’

-‘হ্যাঁ, একটু আগেই গেলেন।’

-‘থ্যাংক ইউ। আপনি না থাকলে…!’

-‘থ্যাংকসের কিছু নেই। উজমার কাজটা আমার ভুল মনে হয়নি, তা-ই পাশে দাঁড়িয়েছি। এমন সাহসী মেয়ে আমি খুব কমই দেখেছি। সময়মতো অন্যায়ের মোকাবেলা করতে না শিখলে অনেক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়।’

-‘তবুও… আপনাকে থ্যাংকস জানানো উচিত।’

-‘আর আমার আপনাকে দুটো অভিনন্দন জানানো উচিত।’

-‘কেন?’

-‘প্রথমত বিয়ের জন্য আর দ্বিতীয়ত, শেষ পর্যন্ত টিকে থেকে দলকে জেতানোর জন্য। দেশে ফিরছেন কবে?’

-‘এইতো, কাল সকালের ফ্লাইটেই। বিয়েতে আসবেন। আমার পক্ষ থেকে দাওয়াত রইল।’

-‘ব্যস্ত না থাকলে চেষ্টা করব। ওহ, আপনার বুবুর খোঁজ পেয়েছেন? আমি তো অনেক জায়গায় খোঁজার চেষ্টা করেছি, পাইনি।’

-‘ওই মিশন থামিয়ে দিন। আর খুঁজতে হবে না। বুবু আপনাদের শহরেই আছে। দেশে ফিরে দেখা করব।’

-‘এটা তো সুখবর। যাক, অবশেষে পাওয়া গেল।’

টুকিটাকি আরও কিছু কথা হওয়ার পর ফোন রেখে দিল ফারশাদ। সৌরভ মনোযোগ দিল কাজে। আপাতত এই কেইসের সমাপ্তি এখানেই। আর কোনো ঝামেলা নেই।

***

শপিংমলে এসে কেনাকাটাতে মনোযোগ দিতে পারছে না উজমা। সারাক্ষণই মন ভার হয়ে থাকছে। অকারণ মন খারাপ, দুঃশ্চিন্তা হচ্ছে। মুড সুইংয়ের এই দিকটা ভীষণ গোলমেলে। কোনো কারণ ছাড়াই মনের ওপর একটা তুফান বইয়ে দেয়। কোনো কাজে মন বসানো যায় না। একাকী গুমরে মরতে ইচ্ছে হয়। কেঁদেকেটে মনকে হালকা করলে শান্তি পাওয়া যায়। এই পরিস্থিতিতে এখন তার কান্নারও সুযোগ নেই। ফারিশা ও ঊষা জমিয়ে শপিং করছে। সাথে যোগ দিয়েছে মাইসারা ও রাইদাহ। বান্ধবীর বিয়ের শপিং হবে, অথচ তারা থাকবে না, এ-ও হয়? শপিংয়ের ফাঁকে ফাঁকে উজমার চয়েস জানতে চাইলে, সে নীরবতার চাদরে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে আলাদা সরে বসলো। ঊষা বোনের মুখভার অবস্থা দেখে বলল,

-‘আপু, কী হয়েছে? নিজের জন্য কিছু নিচ্ছ না কেন?’

উজমা বিরক্তিকর মেজাজ থেকেই বলল,
-‘তুই নিয়েনে। আমাকে এসবে টানিস না।’

সবাইকে রেখে শপিংমলের নিচে থাকা ফাস্টফুডের দোকানে এলো উজমা। কর্ণারের একটা টেবিল ফাঁকা পেয়ে বসে পড়ল। নিজের জন্য এক কাপ কফি অর্ডার দিয়ে অযথাই ফোন স্ক্রল করে গেল। দুঃশ্চিন্তায় ঠোঁট কামড়ে ধরল। শামীম ও সাকিব কেন তার পিছু ছাড়ছে না, বুঝতে পারল না। বেচারী শাম্মা, ওর জন্যও খারাপ লাগার জন্ম নিল। মাঝে মাঝে এই সমাজ ও সমাজের মানুষগুলোকে উজমা বুঝতে পারে না। এরা আসলে কীসে সুখী, এটা বোধহয় এরা নিজেরাও জানে না। নির্দোষ মানুষদের অকারণ শাস্তি দেয় এরা। শাম্মার কোনো দোষ নেই। সে হয়তো পরিস্থিতির শিকার। অথচ সাকিব তার জীবন এই ক’দিনের নরক বানিয়ে ছেড়েছে। বিয়ে করার জন্য পাগল হয়ে বিয়ে করে, ক’দিনের মধ্যেই নিজের আসল রূপ দেখিয়ে দিল সে। সাকিব আইনের লোক, একজন শিক্ষিত মানুষ, যথেষ্ট বুঝদার, তারমতো মানুষকে দিয়ে এই ধরনের ভুল আশা করা যায় না। এতকিছু ভাবতে গিয়ে নিজেকে তার নির্ভার ও সুখী মানুষের একজন মনে হলো। ভাগ্যিস যথাসময়ে মানুষ চিনতে পেরেছিল সে। নয়তো কী হতো। শাম্মার জায়গায় আজ সে থাকতে পারত। ভাগ্য ভালো বলেই, ভয়ানক বিপদ থেকে বেঁচে গেছে। এরূপ অসংখ্য ভাবনায় বিভোর ছিল উজমা। দুই বান্ধবী পাশে বসেছে, টের পেয়েই বলল,

-‘কফি খাবি, তোরা?’

রাইদাহ ও মাইসারা মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। কেউ-ই বুঝল না বান্ধবীর মনের অবস্থা। উজমা নিজেই আরও দু’কাপ কফি অর্ডার দিল। বলল,

-‘কিছু বলবি?’

রাইদাহ মাথা নেড়ে বলল,
-‘মনোযোগ নেই কেন?’

-‘ভালো লাগছে না কিছু।’

-‘কেন?’

-‘বড়ো চাচ্চু থানায় মামলা করেছিল।’

বিষয়টা জানে না দুই বান্ধবী। তা-ই অবাক হলো। শুরু থেকে আজ অবধি ঘটে যাওয়া ও থানায় মামলা হওয়ার ব্যাপারটাও খোলাসা করল উজমা। মাইসারা বলল,

-‘এই সাকিবের সমস্যা কী? এসব করে ওর লাভ কী হচ্ছে? বিয়ের জন্য লাফিয়েছিল, বিয়ে তো করেছেই। তাহলে পিছনে পড়ে আছে কেন?’

রাইদাহ বলল,
-‘এই ধরনের মানুষ সর্বক্ষণ নিজের সুখের কথা ভাবে। নিজেকে সর্বোচ্চ সুখ দিতে গিয়ে অসংখ্য ভুল করেও অনুতপ্ত হয় না। উল্টে জেনে-বুঝে আরও ভুল করে। বাদ দে এসব। বিশ্বস্ত কিছু মানুষ তোর পাশে আছে, আমরা আছি। ভয় কী আর?’

সবার জন্যই কফি এলো। নির্বিঘ্নে কফিতে চুমুক বসালো উজমা। মাইসারা বলল,
-‘অযথা ভয়কে মনে জায়গা দিস না। নিজে সৎ থাকলে কেউ কিচ্ছু করতে পারবে না।’

-‘আমার জীবনে কেন এত জটিলতা আমি বুঝি না। জীবন কত ছোটো, অথচ প্রতি পদে পদে শুধু ভোগাচ্ছে। এই একটা জীবনে কী সহ্য করিনি বল তো! মাঝেমধ্যে মনে হয়, জীবন কেন! এত ঝুটঝামেলাই বা কেন! একটু শান্তি কেন কোথাও নেই?’

একেকটা কঠিন ধাপ পেরোতে পেরোতে উজমা এখন যথেষ্ট ক্লান্ত। একাকী লড়াই করার জোর আর নেই। যখনই একটু সুখের ছোঁয়া পায়, তখনই কোনো না কোনোভাবে মানসিক আঘাত পায়। সেই আঘাতে মন একেবারে ভেঙেচুরে চুরমার হয়ে যায়। শক্ত হয়ে দাঁড়াতে গিয়ে আবারও হোঁচট খাওয়া, এগুলো মনের ওপর খুব প্রভাব ফেলে। আপনজন ও রক্তের সম্পর্কের মানুষগুলো যদি প্রতিবারই গিরগিটির রূপ ধারণ করে, তাহলে বিশ্বাস, ভরসা এগুলো কীভাবে অর্জন হবে? কোথা থেকে হবে? মানুষ তো রক্তের সম্পর্কের মানুষকেই সবচেয়ে বেশি আপন বলে জানে। বাবা-ভাইয়ের পর রক্তের সম্পর্কের মানুষেরাই তার আপন হওয়ার কথা ছিল, অথচ হচ্ছে উলটো। উজমাকে এত নীরব ও চিন্তামগ্ন দেখে রাইদাহ বলল,

-‘ছাড় ওসব। জীবন যতদিন আছে, ঝামেলাও আছে, থাকবে। চলতে পথে এগুলোকে ফেইস করতে হবে। ঝামেলা দেখলে মন খারাপ করে বসে থাকতে হবে, এমন তো কোনো কথা নেই। জীবন ছোটো, তাকে উপভোগ করতে হয়। যখন যে মুহূর্ত আসবে, তখনই সেটা গ্রহণ করে নিতে হবে। হতাশা ও বিরক্তি দিয়ে সামনে আসা সুখকর মুহূর্তটাকে কেন হেলাফেলা করছিস? প্রাণভরে জীবনের সুখটাকে উপলব্ধি করতে শিখ। দুঃখ-কষ্ট, ঝুট-ঝামেলা, দাঙ্গাহাঙ্গামা এসবের পরেও জীবনে আনন্দ আসে। সবকিছুকে সঙ্গী করেই আনন্দটাকে মুঠোবন্দী করা শিখতে হবে। জীবনের প্রত্যেকটা মুহূর্তেই সৎ ও সাহসী হয়ে বাঁচতে হবে।’

উজমা জবাব দিল না। মাইসারা বলল,
-‘চল ওঠ, শপিং শেষ করি। আর মন খারাপ করে থাকিস না। ভালো লাগছে না। যদি বেশি মন খারাপ হয়, তোর বরের সাথে কথা বলেনে। তা-ও এমন গোমড়ামুখো হয়ে থাকিস না, প্লিজ। এত সুন্দর চেহারার মেয়ে তুই, অথচ গালমুখ ফুলিয়ে বসে আছিস। তোর দিকে তাকানোও যাচ্ছে না।’

মাইসারার এই কথায় খিলখিলিয়ে হেসে উঠল উজমা। এমন দু’চারটে বন্ধু জীবনে থাকলে, না পাওয়া বলে কিচ্ছু থাকবে না আর। এরাই তো তার শক্তি, তার সাহস, তার মনের জোর। সে কৃতজ্ঞতাচিত্তে দু’জনের দিকে তাকিয়ে বলল,

-‘তোরা যেমন আছিস, তেমনই থাকিস, প্লিজ। তোদের ছাড়া আমার চলবে না।’

***

চলবে…

#মেঘের_খামে_উড়োচিঠি
লেখনীতে : তামান্না বিনতে সোবহান
পর্ব – বত্রিশ

কার্টেসিসহ কপি করা সম্পূর্ণ নিষেধ!

বিজয়ী হাসি মুখে নিয়ে দেশে ফেরার আনন্দে ফারশাদের সমস্ত মুখাবয়বে খুশি ও আত্মবিশ্বাসী একটা ছাপ ফুটে উঠেছে। এই মুখটায় এখন আনন্দ বিরাজ করলেও কয়েক ঘণ্টা আগে আতঙ্ক ছিল। চেহারায় নেমেছিল, ঘনকালো অন্ধকার। মনে হচ্ছিল, এবার আর জীবিত নয়, নিথর দেহটাই দেশে পৌঁছাবে। অ্যারোপ্লেন তখন মেঘের ভেতর দিয়ে উড়েউড়ে গন্তব্যের দিকে এগিয়ে চলছিল। ফারশাদের পাশের সিটে ছিল একটা বারো বছরের চঞ্চল কিশোর। এত সুন্দর করে কথা বলে সে। গল্পের ছলে ভাব জমিয়েছিল ফারশাদের সাথে, অটোগ্রাফ চাইছিল। একে-অপরের সাথে খুঁনসুটিতে মেতে থাকতে থাকতে একসময় প্লেনের ভেতরে সাইরেন বাজে। পরপরই আওয়াজ শোনা যায়, প্লেনের ডানায় আগুন লেগেছে, ইমার্জেন্সি ল্যান্ডিং প্রয়োজন। যাত্রীদের মধ্যে মৃত্যুর ভয় শুরু হয়। বেঁচে থাকার ক্ষীণ আশা নিয়ে সবাই-ই প্রার্থনা শুরু করে। কিশোরটা ভয়ে গুটিয়ে গিয়ে শব্দহীন কান্নায় ভেঙে পড়েছে দেখে ফারশাদ তাকে অভয় দিয়ে ইংরেজিতে বলল,

-‘ভয় পেও না, বাচ্চা। মনে সাহস রাখো। আল্লাহ যদি আমাদের সবার মৃত্যু এভাবে লিখে থাকেন, তাহলে এই মাঝ-আকাশেই মৃত্যু হবে আমাদের।’

কিশোরটি কাঁদোকাঁদো কণ্ঠে ইংরেজিতেই বলল,
-‘আমরা মৃত্যুকে ঠেকাতে পারি না? জানো, দেশে আমার দাদু-দীদা আছে। আমার মাসি-পিসি আছে। আমি তাদের সাথে দেখা করতেই যাচ্ছি। বাংলাদেশে এটা আমার দ্বিতীয় যাত্রা।’

-‘আমরা বাঁচার জন্য প্রার্থনা করতে পারি। কিন্তু মৃত্যুকে ঠেকাতে পারি না। প্রে কোরো।’

দু’হাত জোর করে বিড়বিড়িয়ে প্রার্থনা শুরু করল কিশোরটা। প্লেনের সব যাত্রীরাই তখন প্রার্থনায় ব্যস্ত। এদিকে আগুনের মাত্রা ক্রমাগত বাড়ছে। প্লেন হেলতে-দুলতে শুরু করেছে। দু’জন পাইলট প্লেনকে নিয়ন্ত্রণ করতে হিমশিম খাচ্ছেন। দু’জনেই ভিনদেশী ও ভীষণ অভিজ্ঞ পাইলট। যাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য ততক্ষণে অক্সিজেন মাস্ক দেয়া হয়েছে। নিউজিল্যান্ড ছাড়িয়ে ইন্দোনেশিয়ার একটা এয়ারপোর্টে ইমার্জেন্সি ল্যান্ডিংয়ের সঙ্গে সঙ্গে এ্যাক্সিট ডোর দিয়ে যাত্রীরা সবাই বেরিয়ে পড়লে চোখের পলকে সম্পূর্ণ বিমানটি ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়। ছোট্ট কিশোরটি বাবা-মায়ের সাথে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থেকে ভীষণ আবেগে কিছু একটা বলছিল। তার ব্যাগপত্র, কাছের মানুষদের জন্য কেনা কিছু গিফট, সবকিছু আগুনে পুড়ে ছাঁই হয়ে যাওয়া দেখে, নিষ্পলক চোখে চেয়ে থেকে মনের দুঃখগুলো প্রকাশ করছিল। ফারশাদ তার গালে হাত রেখে সহানুভূতি দেখিয়ে বলল,

-‘তুমি জানো, আমার লাগেজে কী কী ছিল? আমার বোন, হবু স্ত্রী, বন্ধু, বোনের একমাত্র মেয়ে, দুলাভাই সবার জন্যই কিছু না কিছু নিয়েছিলাম। এইযে, খালি হাতে ফিরছি, একটু খারাপ লাগছে। কিন্তু নিজের প্রাণের চেয়েও জিনিসের মূল্য অনেক কম আমার কাছে। যা কিনেছিলাম, তাতে ভীষণ আবেগ, যত্ন ও ভালোবাসা মিশেছিল। কিন্তু তবুও, সবকিছুর ওপর থেকে মায়া ত্যাগ করতে হচ্ছে। বেঁচে থাকলে এগুলো আবার কিনতে পারব। ভাবো তো, ওই জিনিসগুলোর সাথে সাথে যদি আমরাও পুড়ে ছাঁই হয়ে যেতাম। কী হতো?’

-‘ওগুলোর জন্য আমার ভীষণ মায়া হচ্ছে।’

-‘এটা স্বাভাবিক। আমাদের মন আছে, অনুভূতি আছে। কোনোকিছুর ওপর মায়া জন্মানো খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার।’

-‘আমি মাসি ও পিসিকে কী বলব?’

-‘বলবে যে, ‘দেখো, আমি তো বেঁচে আছি। তোমাদের জন্য সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে সবচেয়ে বড়ো গিফট হচ্ছে, আমার বেঁচে থাকা। তিনি চাইলেই ওই জিনিসগুলোর সাথে আমাকেও পুড়িয়ে ফেলতে পারতেন। কিন্তু তিনি করুণাময়। প্রাণের জীবন ও মৃত্যুদাতা। তিনি চেয়েছিলেন বলেই আমি বেঁচে আছি।’ বলতে পারবে না?’

-‘সৃষ্টিকর্তাই আমাদের বাঁচিয়েছেন না?’

-‘হ্যাঁ, আল্লাহ চেয়েছেন বলেই, আমরা প্রাণে বেঁচে গেছি। ওগুলোর মায়া ছেড়ে দাও। প্রতিমুহূর্তে এটা মনে নিয়ে বাঁচো যে, জীবন যেমন আছে তার মৃত্যুও আছে। প্রাণ যেমন আছে, প্রাণের অনুভূতিও আছে, ধ্বংসও আছে। চলতে পথে এমন অনেক কঠিন মুহূর্ত আসবে, সেসব মুহূর্তে কেবল মায়া কাটিয়েই বেঁচে থাকা শিখতে হবে।’

-‘আপনি ভীষণ ভালো একজন মানুষ। আপনার সাথে কথা বলে খুব ভালো লাগল। সৃষ্টিকর্তা আপনাকে দীর্ঘায়ু করুন।’

ফারশাদ কিশোরটার কপালে চুমু দিয়ে বলল,
-‘তুমিও ভীষণ সাহসী একটা ছেলে। ভালো থেকো সবসময়।’

সোমবার রাতে বাংলাদেশে ফেরার কথা থাকলেও নতুনভাবে টিকিট করা, নির্দিষ্ট ফ্লাইটের জন্য আবারও অপেক্ষা করা, এসব করতে গিয়েই চব্বিশ ঘণ্টারও বেশি সময় লেগে গেল। বাংলাদেশ টিম দেশে ফিরল মঙ্গলবার সন্ধ্যায়। দেশের মাটিতে পা রেখে প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিল ফারশাদ। পকেট হাতড়ে ফোন বের করে ম্যাসেজ লিখল,

-‘আ’ম অলরাইট, বাটারফ্লাই।’

না খেয়ে, না ঘুমিয়ে উজমার প্রাণ তখন ওষ্ঠাগত। এত ভয় জীবনে সে কখনও পেয়েছে বলে মনে হয় না। যখনই দুর্ঘটনার খবর টেলিভিশনের পর্দায় দেখেছিল, সঙ্গে সঙ্গে প্রিয়জন হারানোর ভয় চেপে বসেছিল মনে। মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও ভীষণ আশায় বুক বেঁধেছিল। দিনরাত এক করে শুধু প্রার্থনা করছিল, যাত্রীরা সবাই নিরাপদে গন্তব্যে ফিরুক। শুধু ফারশাদ নয়, ওইমুহূর্তে প্রতিটা যাত্রীর জীবন ঝুঁকিতে ছিল, নেক্সট ফ্লাইট কখন হয়েছে, এটাও নিশ্চিত ছিল না উজমা। নিউজে সবকিছু স্পষ্ট দেখায়নি। উড়ো খবর যতটা হাতের নাগালে এসেছে, ততটাই জানিয়েছে শুধু রিপোর্টারেরা। সেই থেকে একমনে টেলিভিশনের সামনেই বসেছিল সে। এখনও টেলিভিশনের সামনেই বসে আছে। লাইভ নিউজ ও ক্রিকেট টিমের সামনে সাংবাদিকদের ভীড় দেখে সব ভয় দূর হওয়ার পাশাপাশি মনে কিছুটা শান্তি পেল। ম্যাসেজ শো করে রিল্যাক্স হয়ে সোফায় হেলান দিতেই ঊষা বলল,

-‘লুকোও, লুকোও, আরও লুকোও। আরও মাস দু’য়েক আমার কাছ থেকে সত্য লুকোও। ফারিশাবু না জানালে তো আমি টেরই পেতাম না, আমার বোন আমাদের ছাড়াও আর কাউকে এত ভালোবাসতে পারে। সারাজীবন যাকে আমি বেরসিক বলে জানলাম, সে কি-না আমারই চোখের সামনে থেকে প্রেম করে, তা-ও আবার যাকে সে দেখতেই পারে না, তাকে। অথচ আমি টেরই পেলাম না। ডায়েরির পাতা ছিঁড়ে ছোটো বোনকে বোকা বানিয়ে রূপকথার গল্প সে একা একাই পড়ে, কিচ্ছুটি জানতে দেয় না। প্রেম লুকানোর বেলায় মনে থাকে না, আর নিখোঁজ সংবাদ পেলে লুকিয়ে-চুরিয়ে কাঁদে। আমিও দেখব, এই প্রেম কতদিন এমন গোপন থাকে।’

ঠাট্টাচ্ছলে উজমাকে হাসানোর চেষ্টাতেই এইভাবে বলল ঊষা। উজমা হাসলো না, কিছু বলল না। চোখ ঘুরিয়ে একটু তাকিয়ে ফের অন্যমনস্ক হয়ে রইল। বিয়ের দিন-তারিখ পাকা হওয়ার দিন, ফারশাদের ফুপি ও বড়ো চাচাকে দেখে ফারিশার কাছে জানতে চাইছিল, তারা কেন এসেছেন। বাড়িতে কেউ তাকে কিচ্ছু জানায়নি বলে, ফারিশার মুখ থেকে শোনে বেশ অবাক হয়েছিল, আবার খুশিও হয়েছিল। তবে সেটা প্রকাশ করেনি। অপেক্ষা করছিল, কবে বোন সত্য স্বীকার করবে। সামনে থেকে প্রেম করে, অথচ মুখফুটে বলে না সে ফারশাদের সাথে কমিটমেন্টে জড়িয়েছে। কী অদ্ভুত মানুষ এই মেয়ে! যখন টেলিভিশনের পর্দায় বাংলাদেশ ক্রিকেট টিমকে নিয়ে ভয়ানক দুর্ঘটনার খবর প্রচার হলো, তখনই খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিল উজমা। অনবরত যোগাযোগ করার চেষ্টা করছিল ফারশাদের সাথে। উসাইদও দুঃশ্চিন্তায় ছিল। বন্ধুর জন্য ভাইয়ের চিন্তা হওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু বোনের চিন্তিত হওয়া কতটা স্বাভাবিক? এরপরই ঊষা বুঝতে পারল, ফারশাদের প্রতি বোনের এই অনুভূতি গোপন থাকলেও এর সীমা-পরিসীমা অপরিসীম। সবকিছু বুঝে সরাসরি কিছু বলেনি বোনকে, শুধু বলেছিল,

-‘এত চিন্তা করছ, কেন? ওরা নিরাপদেই আছে হয়তো।’

যত যা-ই বলে বোনকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করুক না কেন, সে নিজেও ওই মুহূর্তে চিন্তিত ছিল। পরিস্থিতি যেমনই হোক, বেঁচে থাকাটাই আসল। ঊষা খুব করে চাইছিল, এবার অন্তত বোন সুখের মুখ দেখুক। নিউজে এখন বার বার একটা কথাই বলছে, পাইলটদের সাহস ও তাৎক্ষণিক ইমার্জেন্সি ল্যান্ডিংয়ের সিদ্ধান্ত যথোপযুক্ত ছিল বলেই প্রাণে বাঁচানো গেছে যাত্রীদের। একধ্যানে নিউজ শুনছিল উজমা। ঊষা বলল,

-‘আপু, এখন একটু স্বাভাবিক হও। ভাইয়া ঠিক আছে, সুস্থ আছে।’

***

রংপুরের বাসায় ফিরতেই দুই ফুপির আদর-আহ্লাদ ও স্নেহ-মায়ায় ভীড়ে আটকা পড়ল ফারশাদ। দু’জনেই কেঁদেকেটে ভাইপোকে আগলে নিয়ে ড্রয়িংরুমে বসে পড়েছেন। পথে এই দুর্ঘটনা ছাড়া আর কোনো বিপদ-আপদ হলো কি-না, তা জানতেও বাদ রাখলেন না। ক্লান্ত শরীর নিয়ে দুই ফুপির প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিল সে। দু’জনেই চিন্তায় চিন্তায় অস্থির। নাওয়া নেই, খাওয়া নেই, একাধারে শুধু মোনাজাত করে গেছেন। ফাবিহা সামান্য জুস নিয়ে এলে নিশ্চিন্তমনে তাতে চুমুক বসিয়ে ফুপিদের উদ্দেশ্যে ফারশাদ বলল,

-‘সব ঠিক আছে, ফুপি। আমিও সুস্থ আছি। কেন এত টেনশন করবে তোমরা? আমাকে নিয়ে যার চিন্তা করার কথা, তিনি তো দিব্যি ফুর্তি করে বেড়াচ্ছেন। কই, এখন পর্যন্ত কি একটা ফোন দেয়ার সময় পাননি তিনি? এত কীসের ব্যস্ততা জীবনে? সন্তানের জীবনের মূল্য কেন নেই তার কাছে? অথচ তিনি আমাদের গর্ভধারিণী, মা।’

বড়ো ফুপি সৈয়দা দিলারা রওশন চিন্তিত মেজাজেই বললেন,
-‘এখানে আসার পর আমি নিজেও দু’বার ফোন করেছি মুনমুনকে। ওতো রিসিভই করল না। বিয়ের আর মাত্র দু’দিন বাকি। শুক্রবার দিন ভোরে রওনা দিতে হবে। তোর বাবা নেই। মা-ও যদি না থাকে…।’

-‘ছাড়ো। ওনি আসবেন না। কেউ আসতে না চাইলে তাকে জোর করা যায় না।’

-‘বিয়ের মতো একটা পবিত্র কাজে থাকবে না। এটা কেমন কথা? আচ্ছা, বাদ দেই ওর কথা। আমি চাইছিলাম, তোর সব কাজিনদের ফোন করে আসতে বলি। ওরা যদি হলুদসন্ধ্যা করতে চায় তাহলে বৃহস্পতিবার রাতেই করুক…।’

বিশ্বস্ত মানুষ ছাড়া বাইরের কাউকে দাওয়াত দিতে নারাজ ফারশাদ। এজন্য বিয়েতে যারাই থাকবে, সবাই তার অতি আপন মানুষজন। যারা না থাকলে নয়, তারাই। চাচাতো, মামাতো, ফুপাতো সব কাজিনেরা, বাংলাদেশ টিমের সব প্লেয়ার, কোচ, আর মুরব্বি ক’জন মানুষ। যদিও ফারশাদ নিশ্চিত যে, নানাবাড়ির দিক থেকে কোনো আত্মীয়কেই সে পাবে না, তবুও মুখের কথা রাখতে দাওয়াত দেয়া। এই কাজ অবশ্য ফারশাদের বড়ো চাচা নিজ দায়িত্বে করেছেন। সে সবদিক ভেবে নিয়ে বলল,

-‘বেশি ঝামেলা করার দরকার নেই, ফুপি। আমি এত জাঁকজমক আয়োজন চাই না। ওরা যদি অল্পতেই ফূর্তি করতে চায়, আসুক। অসুবিধা নেই।’

***

ফ্রেশ হয়ে একটা নিউজপেপার হাতে নিয়ে তাতে চোখ বোলাচ্ছিল ফারশাদ। ভীষণ ক্লান্ত লাগছে বলে রুম ছেড়ে বের হতে ইচ্ছে করছে না। একাধারে অনেকক্ষণ বসে থাকাতে শরীরে যথেষ্ট ব্যথাও আছে। খানিকক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে ভেবেছিল বিয়ের আচার-অনুষ্ঠান নিয়ে যাবতীয় আলাপ ও কাজকর্ম সেরে নিবে। এখনও সম্পূর্ণ শপিং বাকি। যা কিনেছিল তা তো সব পুড়ে ছাঁই হয়ে গেল। হ্যান্ডব্যাগে ছাড়া কিচ্ছু বাকি থাকল না। হ্যান্ডব্যাগে অবশ্য বেশিকিছু ছিল না। পাসপোর্ট, ফোন ও কিছু কাগজপত্র ছিল। সেগুলোই রক্ষা পেয়েছে। নিউজপেপার হাতে থাকলেও মনোযোগটা খবরে নেই। সে অন্য ভাবনায় ডুবে আছে। বাবা-মায়ের অবহেলা, স্বেচ্ছায় মায়ের সংসার ও সন্তানদের ত্যাগ করা, দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের ভয়ে দূরে সরে থাকা, এতসব জটিল বিষয় ভাবতে গিয়ে নিজের ভাগ্য নিয়ে আজ সে ভীষণ হতাশায় আছে। বাবা-মাকে কেন এমন হতে হলো? কেন জীবনের প্রতিটা পদক্ষেপ সহজ-সুন্দর না হয়ে জটিল হয়ে গেল? কেন জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজে মাকে পাওয়া যাবে না? অন্য সবার মতো একটা সাধারণ ও সুন্দর জীবন হলে কী ক্ষতি হতো? এইসব মন খারাপ করা গল্প স্মরণ করেই চেহারার উজ্জ্বলতা হারিয়ে গেল তার। ফাবিহা এলো রুমে, চুপিচুপি। পর্দা সরিয়ে ভয়মিশ্রিত কণ্ঠে বলল,

-‘ভাইয়া, একটা কথা বলতাম।’

সম্বিত ফিরে পেয়ে নিউজপেপার সরিয়ে রাখল ফারশাদ। ফাবিহাকে রুমে আসার অনুমতি দিয়ে বলল,
-‘জরুরী কিছু?’

-‘আমি ভাবীর সাথে কথা বলতে চাইছি। পাঁচ মিনিট সময় নেব। কল ধরিয়ে দেবে একটু?’

এইটুকু আবদার করতে গিয়ে ভয়ে ভাইয়ের থেকে চোখ নামিয়ে রেখেছে ফাবিহা। ক’দিন ধরেই তার মন আঁকুপাঁকু করছে উজমার সাথে একটুখানি কথা বলার জন্য, কিন্তু মুখফুটে কাউকে বলতে পারছে না। ফারিশার পর একটা বিশ্বস্ত বন্ধুর খুব অভাববোধ করত ফাবিহা। মা কোনোদিন তার বন্ধু হয়নি, ভরসা হয়নি, আর ভাইকে সে ভরসার ভাবলেও বন্ধু ভাবতে পারেনি। বন্ধুত্ব এমন একটা সম্পর্ক যার কাছে মনের সব কথা খুলে বলে নির্ভার হওয়া যায়। ভরসার হলেও ভাইয়ের সাথে তার সম্পর্ক এতটাও ঘনিষ্ঠ নয় যে, নিজের একান্তই ব্যক্তিগত কথাগুলো বলে নিজেকে হালকা করবে। ভাই সবসময় তার কাছে ভীষণ সম্মানের একটা জায়গা। বয়স ও অভিজ্ঞতা, সবদিক থেকে ভাই তার ঊর্ধ্বে বলেই সম্মানের এই সম্পর্কটাকে এতটাও ক্লোজ করতে পারেনি সে। মুখফুটে এসব কথা না বললেও বোনের এই একাকীত্বের বেদনা ফারশাদ বুঝে। যে পরিস্থিতিতে সে বড়ো হয়েছে, সেখানে অন্য কেউ থাকলে হয়তো মানসিক বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়ে থাকত। সে ভীষণ ধৈর্য্যশীল ও শক্ত মনের মেয়ে বলেই কঠিন পরিস্থিতিতেও নিজেকে টিকিয়ে রেখেছে পর্যাপ্ত মনের জোর ও সাহসের মধ্য দিয়ে। উঠতি বয়সী তরুণ-তরুণীদের জন্য বাবা-মা সবচেয়ে ভালো বন্ধু হওয়ার কথা অথচ তাদের বেলায় উলটো ঘটেছে। বোনের ইচ্ছেটাকে প্রাধান্য দিতে হোয়াটসঅ্যাপ ওপেন করে ইনবক্সে লিখল,

-‘কল রিসিভ করুন, ফাবিহা কথা বলবে।’

সেদিন ‘তুমি’ বলার অনুমতি দিলেও উজমা তুমিতে নামেনি। সে-ও ‘তুমি’ পর্যন্ত এগোতে পারেনি। তবে ভেবে রেখেছে, সামনা-সামনি উজমাকে একটা চমক দিবেই। কত কথা জমা হচ্ছে, শব্দেরা মিছিল তৈরী করছে, দ্বন্দ্ব বাঁধিয়েছে, অথচ নির্দিষ্ট সময়টা এখনও আসেনি দেখে সব শব্দ ও অনুভূতিদের আটকে রেখেছে ফারশাদ। উজমা বোধহয় ফোন হাতে নিয়েই ছিল। ম্যাসেজ সিন হওয়া মাত্রই রিপ্লাই এলো, ‘ঠিক আছে।’ দেরী না করে কল কানেক্ট করে ফাবিহার হাতে ফোন তুলে দিল ফারশাদ। প্রচণ্ড আগ্রহী ও খুশিমনে ফোন হাতে নিয়ে বেলকনিতে চলে গেল ফাবিহা। হাসিমাখা মুখে, ভীরু ভীরু কণ্ঠে সালাম দিল। পরপরই মিষ্টি অথচ ধীরকণ্ঠে সালামের জবাব ভেসে এলো। আরও শোনা গেল,

-‘কেমন আছেন আপুনি?’

ফাবিহা একটু থমকাল ‘আপুনি’ ডাকটা শোনে, লজ্জাও পেল। অন্যান্য সম্পর্কের ছোটো ছোটো কাজিনেরা তাকে ‘আপুনি’ বলে ডাকে। সিনিয়র কেউ তাকে ‘আপুনি’ ডাকছে, এটা তারজন্য লজ্জার হয়ে গেল। সে লাজুকস্বরে বলল,

-‘আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি। আপনি ভালো আছেন?’

-‘কী জানি! বুঝতে পারছি না কেমন আছি। হয়তো ভালো, হয়তো না।’

ফাবিহা কিছু একটা বুঝল বোধহয়। মেয়েদের মন, পরিস্থিতি বিচার করে তার মাথায় এটাই এলো যে, হয়তো আপনজন ছেড়ে যাওয়ার কষ্টে তার হবু ভাবীর মন খারাপ অথবা ভাইকে নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় ভালো থাকতে ভুলে গেছে। সে অনভিজ্ঞ মনে বলল,

-‘অসুবিধা নেই। আমাদের এখানে এলে আমি এমন কিছু ম্যাজিক আপনাকে শেখাব, কখনও কোনো পরিস্থিতিতে আর মন খারাপ হবে না।’

-‘তাই? কেমন ম্যাজিক বলুন তো একটু।’

-‘আমি আপনার ছোটো, আমাকে নাম ধরে ডাকতে পারেন। তুমি করে বলতে পারেন। আমি রাগ করব না।’

-‘আচ্ছা, ঠিক আছে। ডাকি তাহলে। যেহেতু তুমি আমার ছোটো। এবার, বোলো তোমার ম্যাজিক।’

ফাবিহা বেশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে দীর্ঘশ্বাস আগলে নিয়ে বলল,
-‘আসলে এই ম্যাজিকটা আমি নিজের ক্ষেত্রে অ্যাপ্লাই করি বেশি। তারমধ্যে প্রথম হলো, কোনো পরিস্থিতিতে যখন আমি খুব বেশি রেগে যাই, তখনই নিজের পছন্দের জিনিসের ওপর অত্যাচার করি কিংবা সেটাকে ইগনোর করি।’

-‘আর কোনো মানুষের ওপর রাগ-অভিমান হলে? কিংবা কারও আচরণে কষ্ট পেলে?’

-‘মানুষকে তো অত্যাচার করতে পারব না, তা-ই ইগনোর করি। যখন আমি বুঝি যে, কারও কাছে আমার গুরুত্ব নেই। সঙ্গে সঙ্গে তার সাথে বিচ্ছেদ টেনে দিই। মন থেকে তাকে দূরে সরিয়ে দিই আর তার প্রতি যতটুকু ভালোবাসা কিংবা সম্মান জমা হয়েছিল, সবকিছুকে গলাটিপে হত্যা করি। জানেন, এই পৃথিবীতে দুটো মানুষকে আমি খুব বেশি ভালোবাসতাম, আর এখন সে-ই দুটো মানুষকে খুব বেশি ঘৃণা করি।’

-‘এক্ষেত্রে তুমি ধৈর্য্য কোথাও পাও?’

-‘পরিস্থিতি শিখিয়ে দেয় ভাবী, কীভাবে ধৈর্য্য ধরতে হয়।’

আচমকা ‘ভাবী’ ডাকে লজ্জা এসে ভর করল উজমার সর্বাঙ্গে। চুপ হয়ে গেল সে। ফাবিহা বলল,
-‘আমি একটা আবদার করি?’

-‘হুম… কোরো।’

-‘আমি কি আপনাকে আমার ভরসার সঙ্গী হিসেবে পেতে পারি কিংবা বিশ্বস্ত বন্ধু হিসেবে? স্কুল ও ভার্সিটি লাইফে আমার অনেক বন্ধুবান্ধব হয়েছে, কিন্তু তাদের কারও সাথেই আমি সহজে মেলামেশা করতে পারি না। এমন না যে তারা বন্ধু হিসেবে খারাপ। আসলে, চারদেয়ালের ভেতর থাকতে থাকতে আমি বাইরের জগতের সাথে মিশতে ভুলে যাচ্ছি। দীর্ঘদিন বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ হয় না, দেখা হয় না, কথা হয় না। এই কারণে বন্ধুবান্ধবরা সবাই আমাকে অহংকারী ভাবে। তারা ভাবে যে আমি উচ্চবিত্ত পরিবারের মেয়ে হওয়াতে তাদেরকে অবহেলা করছি। কিছু পরিস্থিতি আমাকে নীরব করে দিয়েছে আর প্রতিনিয়ত উদ্ভট কিছু চিন্তাভাবনার জন্য আমি নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছি। বলেছিলাম না, পছন্দের জিনিসের ওপর অত্যাচার করি? কিছু ক্ষেত্রে আমি নিজের ওপর অত্যাচার করি। কিছুদিন আগেই এরকম একটা কাজ করতে যাচ্ছিলাম।’

এইটুকু বলে কিছু সময়ের জন্য চুপ হয়ে গেল ফাবিহা। তারপর ধীরেসুস্থে বলল,
-‘ক’দিন আগে আমার ব্রেকাপ হয়েছে। আমাদের দু’বছরের রিলেশন ছিল। ব্রেকাপ হওয়ার মূল কারণ হচ্ছে, মায়ের কিছু অসামাজিক কার্যকলাপ। ও কোনোভাবে জেনে গেছে আমার মায়ের চরিত্রে দোষ আছে। আর ওর বক্তব্য হলো, যার মা খারাপ, সে নিজেও খারাপ। চরিত্রহীন, বেশ্যা। এই ধরনের অনেক মন্তব্য শোনার পর নিজের ওপর আমার এত রাগ ও ঘৃণা হচ্ছিল যে, তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিয়ে সুইসাইডের চিন্তা মাথায় এনে ফেলেছি। এরপর আবার ভাবলাম, নিজেকে আমি যতটা জানি, ততটা আর কেউ জানে না। নিজের কাছে আমি সৎ, স্বচ্ছ ও পবিত্র সবসময়। অন্যের কথায় নিজের ওপর কেন অত্যাচার করব, নিজের জীবন কেন বিসর্জন দেব? নিজের বিবেক আমাকে সেদিন পথ চিনিয়েছিল বলে, আত্মহত্যার মতো জঘন্য পাপ থেকে বেঁচে গেছি, নিজেকেও বাঁচিয়ে নিয়েছি।’

এত কথা শোনে উজমা বোবা হয়ে গেল। পরিস্থিতি একটা মানুষকে কোথা থেকে কোথায় নিয়ে যেতে পারে, ভাবতেই শিউরে উঠল সে। নিজের জীবন ও নিজেকে নিয়ে একেকটা ঘটনাই তাকে বুঝতে শিখিয়েছিল, সমাজ ও সমাজের মানুষকে চিনিয়েছিল। সে শুধু ভাবত, খারাপ শুধু তার সাথেই হয়। জীবন শুধু তাকেই ভুল সময় ও ভুল মানুষের সামনে দাঁড় করায়। অথচ আজ আবারও জানল, ছোট্ট জীবন শুধু তাকে নয়, আরও অসংখ্য মানুষকে এভাবে দুঃসময়ের মুখোমুখি টেনে নিয়ে যায়। ভুল ও সঠিকের মধ্যে পার্থক্য শেখায়, আলো ও অন্ধকার চিনতে শেখায়। ধৈর্য্যহারা ও আত্মবিশ্বাসহীন মানুষ এরকম পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে জানে না বলেই হেরে যায় জীবনের কাছে, হেরে যায় নিজের কাছে। ফাবিহার জীবনে যে একটা বিশ্বস্ত বন্ধু ও ভরসার মানুষ প্রয়োজন, সেই ভাবনাই মনে-মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়ল তার। না, এই বিশ্বস্ত বন্ধু কিংবা ভরসার মানুষ কোনো পুরুষ কিংবা জীবনসঙ্গী নয়, এই বিশ্বস্ত বন্ধু হতে পারে, ভাই-বোন অথবা ভাবী, বান্ধবী। হতে পারে অন্য সম্পর্কের কোনো কাছের মানুষ। ফাবিহার আশেপাশে এরকম কেউ নেই বলেই সে তাকে ভরসার সঙ্গী হিসেবে চাইছে আর সাহস নিয়ে এত কথা শেয়ার করেছে। অথচ এই কথাগুলো নিজের ভাইয়ের সাথে শেয়ার করতে পারত। পারেনি শুধু লজ্জা ও সংকোচের জন্য। ভাইয়েরা বোনদের ভরসার আশ্রয় হলেও সব কথা ভাইয়ের সাথে শেয়ার করা যায় না। অনেকক্ষণ চুপ থেকে উজমা বলল,

-‘তুমি এত কথা আমার সাথে শেয়ার করলে কেন? আমি তো বিশ্বস্ত কেউ না-ও হতে পারি। আমি কি পারব, তোমার প্রতি আমার সব দায়িত্ব-কর্তব্য পালন করতে?’

-‘আপনার আগমনের পর আমি ভাইয়াকে হাসতে দেখেছি, বাঁচতে দেখেছি, স্বপ্ন দেখতে দেখেছি। আমার প্রতি আপনার কোনো দায়িত্ব-কর্তব্য কিংবা দায়বদ্ধতা থাকবে না। আপনার সম্পর্কে যতটা জেনেছি, তাতে মনে হয়েছে, আপনি আমার বুবুর মতোই কেউ। যাকে ভরসা করা যায়, বিশ্বাস করা যায়। আমাদের সম্পর্কটা ননদ-ভাবীর না হয়ে, বন্ধুত্বের হোক। যেন আমি দিনশেষে এটা ভাবতে পারি যে, ভাইয়া ও বুবুর পর কেউ আমার জীবনে এসেছে, যে আমার খুব আপন, খুব কাছের।’

-‘বুবুর জায়গা নিতে পারব? কেউ কি কারও জায়গা নিতে পারে, কিংবা কারও শূণ্যতা পূরণ করতে পারে?’

-‘এটা অসম্ভব। বুবু ছিল আমার সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। মায়ের শূণ্যতার মুহূর্তগুলোতে বুবুই আমাকে লালন-পালন করেছে। বলতে পারেন, একটা সন্তান বাবা-মায়ের কাছ থেকে যতটুকু সাপোর্ট সহযোগিতা পায়, আমরা দুই ভাই-বোন সেটা বুবুর কাছ থেকেই পেয়েছিলাম। এরপর বুবু হারিয়ে গেল, ভাইয়াও চলে গেল অন্য শহরে। সেইসব মুহূর্তে আমি একটা জটিল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে দিন কাটিয়েছি। যতক্ষণ বাইরে থাকতাম, ভালোই কাটত সময়। ঘরে ফিরলে…।’

ফাবিহা চুপ করে থাকলে উজমা বলল,
-‘আমি হয়তো তোমার বুবুর মতো হতে পারব না। তবে ভালো একজন বন্ধু হয়ে ওঠার চেষ্টা করব। এমন যে, চলতে পথে প্রতিটা পদক্ষেপে তুমি আমাকে পাশে পাবে।’

-‘কথা দিচ্ছেন?’

-‘হুম… দিলাম।’

-‘এইযে, এত কথা শেয়ার করলাম, এগুলো কিন্তু ভাইয়াকে বলা যাবে না। শুনলে ভাইয়া কষ্ট পাবে।’

-‘বিশ্বাস রাখো, বলব না। আজ একটা কথা দিবে তুমি আমায়।’

-‘কী?’

ফাবিহার আগ্রহী স্বর শোনে, তাকে সাহসী ও মনের জোর বাড়িয়ে দিতে উজমা বেশ স্পষ্টস্বরে বলল,
-‘জীবন যেমনই চলুক, পরিস্থিতি যা-ই হোক, চলতে পথে যত বাধাবিপত্তি আসুক, নিজের ওপর থেকে ভরসা হারাবে না। নিজেকে ছোটো কিংবা জীবনকে তুচ্ছ ভাববে না। অন্যের সাথে নিজের তুলনা করবে না। মনে রেখো, ততক্ষণই তুমি টিকে থাকবে যতক্ষণ তোমার নিজের ওপর আত্মবিশ্বাস জোড়ালো থাকবে। তখুনি হেরে যাবে, যখন তুমি আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলবে। এজন্য, সবকিছুর আগে নিজেকে ভালোবাসতে হবে, নিজেকে বুঝতে হবে। পাছে লোকে নানান কথা বলে, বলতে দিও। লোকের কথা শোনে নিজের ওপর অবিচার করবে না। এগুলো ভুল সিদ্ধান্ত। কোনো বুদ্ধিমান, বিবেকবান, সচেতন মানুষ এরকম সিদ্ধান্ত নেয় না। পিছনে যা করতে চাইছিলে, সেরকম পদক্ষেপ আর নিবে না। মনে থাকবে?’

***

চলবে…