মেঘে ঢাকা তারা পর্ব-০২

0
665

#মেঘে_ঢাকা_তারা
#দ্বিতীয়_পর্ব
#আয়াত_আফরা

আজ বেশ বেলায় ঘুমটা ভাঙে তন্দ্রার।এত দেরি তো তার কখনো হয়না।সবসময় সে আজানের আগে ঘুম থেকে উঠে।তবে আজ..
ঘুম থেকে উঠে কিছুক্ষণ ঝিম মেরে বসে থাকে তন্দ্রা।ধীরে ধীরে মাথাটা পরিষ্কার হয়।তার মনে পড়ে আজ যে তার বিয়ে!কিন্তু এ বাড়ি তো বিয়ে বাড়ি বলে মনে হচ্ছেনা।আত্মীয়দের হুল্লোড় নেই,সানাইয়ের শব্দ নেই আর পাঁচটা সাধারণ দিনের মতোই মনে হচ্ছে আজকের দিনটাকে।তন্দ্রা বিছানা ছেড়ে নেমে নিজ কক্ষের বাইরে আসে।ঘরের কোনায় কোনায় ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে।ড্রয়িং রুমে কিছু নতুন ভ্যালভ্যাটের সোফা পাতা হয়েছে।তন্দ্রা বুঝতে পারে এই সোফাগুলো ডেকোরেশন হাউস থেকে ভাড়া করে আনা হয়েছে।সে রান্না ঘরে গিয়ে দেখে তার মামী রান্না করছেন।

–আরে মামী তুমি কেন রান্না করছো?আমাকে ডাকোনি কেন? জলখাবার আমিই বানাচ্ছি দাও,বলে তন্দ্রা তার মামীকে সরিয়ে চুলার কাছে যেতে চায়।

কিন্তু বীণা বেগম তাকে ঠেলে দিয়ে বলেন,
–আরে মেয়ের কান্ড দেখ।আজ তোর বিয়ে তু্ই ভুলে গেছিস? যা যা তৈরী হয়ে নে গিয়ে।বরপক্ষ চলে আসবে যে।মাইশা কোথায়? ওই মেয়ে এখনো ঘুমাচ্ছে? তোকে তৈরী করবে কে? যা তো মা গিয়ে মাইশাকে ডেকে তুলে বল তোকে তৈরী করে দিতে।

–না মামী আমি একাই তৈরী হয়ে নেবো।

–তা বললে কি হয়? তোর জিনিসপত্র তো সব মাইশা তুলে রেখেছে।ওগুলো তো সব বের করে দিতে হবে নাকি।তোর জন্য নতুন কত জিনিস কিনে আনা হয়েছে।তোর আলমারি নেই তাই ওর আলমারিতে তুলে রেখেছি।আর হ্যাঁ মাইশাকে বলে দিয়েছি ওর যে নতুন ছোট সুটকেসটা আছে তাতে তোর প্রয়োজনীয় সব জিনিস গুছিয়ে দিতে।শ্বশুরবাড়িতে যাচ্ছিস ,কখন জামাইবাবা কি কিনে দেয় না দেয় নিজের জিনিসপত্র নিজেকেই তো ঠিকভাবে রাখতে হবে নাকি। যা যা তোল গিয়ে মাইশাকে।

মামীর কোথায় ডানে বায়ে ঘাড় নাড়িয়ে তন্দ্রা রান্নাঘর থেকে বের হতেই যাচ্ছিলো এমন সময় বীণা বেগম তাকে আবার ডেকে বলেন,

–ও হ্যাঁ তন্দ্রা তোকে তো একটা কথা বলতে ভুলেই গিয়েছিলাম।

–কি কথা মামিমা?

–শোন না মা তুই যে আমাদের আপন মেয়ে না সেটা যেনো ও বাড়িতে কেউ জানতে না পারে।দ্যাখ তোকে আমরা ছোট থেকে বড় করেছি এখনো কি আমরা তোর মা বাবা হওয়ার যোগ্য হইনি বল? এখনো কি আমরা তোর মামা মামী-ই রয়ে গেছি?

–ছিঃ ছিঃ মামীমা এসব তুমি কি বলছ? তুমি তো আমার মায়ের মতোই।তোমাকে আর মামাকে আমি সবসময় মা বাবার মতোই দেখেছি।আর মাইশা দিদিকে বোনের মতো।তোমরাই তো এই পৃথিবীতে আমার আপনজন।

বীণা বেগম তন্দ্রার হাত তার মাথায় রেখে বলেন,
–তাহলে এই আমার মাথায় হাত রেখে কথা দে তুই ওই বাড়ির কাউকে জানাবি না যে তুই আমাদের আপন মেয়ে না।তুই আমাদের ভাগ্নি ,তোকে আমরা শুধু বড় করেছি এসব তুই কাউকে জানাবি না কথা দে।এমনকি নীলাদ্রিকেও না।

–কথা দিলাম মামীমা।কাউকে কিচ্ছু বলবোনা।সবাই জানবে তুমি আমার মা আর মামা আমার বাবা, বীণা বেগমের হাত ধরে আশ্বস্ত করে তন্দ্রা।

এর মধ্যেই মাইশাও এসে উপস্থিত হয় রান্নাঘরে।তার ঘুম ঘুম ভাব এখনো কাটেনি।সে তন্দ্রাকে রান্নাঘরে দেখে বলে,

–কিরে তন্দ্রা তুই রান্নাঘরে কি করছিস?আজ না তোর বিয়ে? চল, তৈরী হবি না? পাত্রপক্ষ যে চলে আসবে।

–হ্যাঁ এই মাইশা নিয়ে যা তো ওকে।নীলাদ্রিরা এই এল বলে।তাড়া দেন বীণা বেগম।

মাইশা তন্দ্রাকে নিয়ে নিজের ঘরে চলে আসে।এরপর আলমারি খুলে কিছু গয়নার বাক্সের সাথে একটা লাল বেনারসি বের করে।বেনারসিটা সে তন্দ্রার হাতে দিয়ে বলে,
–তন্দ্রা জানিস এই বেনারসিটা কার?

তন্দ্রা মাথা নাড়ে।

–এটা তোর মায়ের বেনারসি রে।

–সত্যি মাইশা দি! অবাক হয়ে শাড়ীটার হাতে নেয় তন্দ্রা।একবার বুকের কাছে জড়িয়ে ধরে সেটার গন্ধ নেবার চেষ্টা করে।এতে কি তার মায়ের গন্ধ আছে?

মাইশা বলে,
–দ্যাখ নীলাদ্রি কিন্তু তোর জন্য দামি শাড়ি পাঠিয়েছে।সেটাও আছে।কিন্তু তুই জানিস এই শাড়িটা ফুফি তোর বিয়ের জন্য রেখেছিলেন।উনি চেয়েছিলেন যে এটা তুই তোর বিয়েতে পড়বি।তবে তুই চাইলে নীলাদ্রির পাঠানো দামি শাড়িটাও কিন্তু পড়তে পারিস।

তন্দ্রার দিকে একবার আড়চোখে তাকায় মাইশা।তন্দ্রার চোখ দিয়ে তখন অশ্রুর বন্যা নেমেছে।সে ধরা গলায় বলে,

–না মাইশা দি আমার দামি শাড়ি চাইনা।আমি এটাই পরবো।এটাই পরবো।

মনে মনে খুশি হয় মাইশা।সে জানতো একটা পুরাতন শাড়ি দিয়ে তন্দ্রার মায়ের মিথ্যা গল্প বললে তন্দ্রা নীলাদ্রির পাঠানো দামি শাড়ির পরিবর্তে এই পুরোনো রং উঠা ময়লা শাড়িই পরে নেবে।আর নতুন দামি শাড়িটা হয়ে যাবে তার।তবুও মুখে মাইশা বলে,

–দেখ আমি কিন্তু বলছি নীলাদ্রি কিন্তু দামি শাড়ি পাঠিয়েছে।তুই এই পুরাতন শাড়ি পরে যদি ওর বাড়ি যাস তাহলে ও রাগ করলে কিন্তু সেই দায়ভার এই পরিবারের কারো না, ঠিক আছে?

—তুমি ভেবো না মাইশা দি আমি উনাকে বুঝিয়ে বলবো, বলে তন্দ্রা শাড়িটা পড়ার জন্য নিজের কামরায় চলে যায়।

মাইশা মনে মনে হাসে,
–তন্দ্রা তুই তো জানিসও না যে তুই যাচ্ছিস সিংহের সামনে।আর সিংহের সামনে কোনো কিছু বুঝিয়ে বলার সুযোগ যে থাকেনা।স্টুপিড গার্ল! নিজের মনেই কথাগুলো বলে মাইশা।ভাবে, কেউ কি অতটাও বোকা হয়?

********

তন্দ্রার চুল খোঁপা করে তাতে বেলি ফুল গেঁথে দেয় মাইশা।গলায় পরিয়ে দেয় সোনার হার।চোখে কাজল।গালে রুজ লাগাতে গিয়েও আর লাগায় না।আয়নার দিকে তাকিয়ে একটু লজ্জা পেয়ে যায় তন্দ্রা।তন্দ্রা এমনিতেই ফর্সা।হাসলে গালে টোল পরে।লজ্জা পেলে গাল দুটো টুকটুকে লাল হয়ে যায়।কেউ সহজেই বুঝে ফেলতে পারে যে সে লজ্জা পেয়েছে।এমনকি মনের গোপন ভাবের সব অনুভূতিগুলোও এক এক করে ধরা পরে যায় তন্দ্রার চোখে।সে হাসি কান্না ,দুঃখ ,ভয়,লজ্জা কোনো কিছুই মনের মধ্যে চেপে রাখতে চাইলেও পারেনা।সব তার চেহারায় ফুটে উঠে।তন্দ্রার বুকটা উত্তেজনায় কাঁপছে।বিয়ের আগে বুঝি সবারই এমন অনুভুতি হয়! তন্দ্রা তার মা বাবার ছবিটা বের করে একবার দেখে।ভাবটা এমন যেন তাদের বলছে, দেখো তো মা বাবা তোমাদের মেয়েকে বিয়ের সাজে কেমন লাগছে? নীরবে তন্দ্রার চোখ দিয়ে দু ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পরে ছবিটার উপর।

–কি রে তৈরী হলি? পাত্রপক্ষ যে অপেক্ষা করছে।

মামীর গলা পেয়ে ছবিটা আবার সু্টকেসে ঢুকিয়ে নেয় তন্দ্রা।শাড়ীর কুঁচিটা একটু ঠিক করে বলে,

–এইতো মামী আমি তৈরী।

–চল বাপু চল তাড়াতাড়ি চল।ছেলের বাড়ির লোকেরা সেই কখন এসেছে।

–এইতো যাচ্ছি মামী,বলে মাইশার কক্ষ থেকে বেরিয়ে যায় তন্দ্রা।তার পিছু পিছু মাইশা বেরুতে যেতেই বীণা বেগম খপ করে মেয়ের হাত ধরে চাপা গলায় বলেন,

–তুই কোথায় যাচ্ছিস হতভাগী?সব ভুলে গেছিস নাকি?

মাইশা আমতা আমতা করে বলে,
–মা আমি শুধু একবার নীলাদ্রিকে দেখবো।

বীণা বেগম ধমকে উঠে বলেন,
–তোর কাউকে দেখতে হবেনা।চুপচাপ এই ঘরে বসে থাক।খবরদার যদি ঘর থেকে বেরিয়েছিস তাহলে আমার থেকে খারাপ আর কেউ হবেনা।মেয়েকে ধমকে চলে যান বীণা বেগম।

তন্দ্রা ড্রয়িং রুমে এসে দেখতে পায় মাত্র জনা চারেক লোক বসে আছে।তাদের মধ্যে একজন কাজী।আর বাকিরা অচেনা।তবে এর মধ্যে কেউই নীলাদ্রি নয়।নীলাদ্রিকে তো সে চেনে।যদিও সামনা সামনি দেখা হয়নি তবুও ছবিতে তো দেখেছে।কিন্তু এখানে নীলাদ্রি কেন নেই?বিয়েতে কি বর-ই আসেনি? বর ছাড়া কি করে বিয়ে হবে?

চলবে…….