#স্নিগ্ধ_প্রেমের_সম্মোহন
–[পর্ব-০৭]
লেখিকাঃ#সাদিয়া_মেহরুজ_দোলা
উত্তপ্ত রৌদ্দুরে এড়িয়ে আকাশে আজ মেঘের আনাগোনা! ঘন কালো মেঘ। মাঝেমধ্যে গুড়গুড় করে আওয়াজ দিয়ে জানান দিচ্ছে পৃথিবীতে বৃষ্টি আসছে! স্নিগ্ধময় বৃষ্টি! যেই বৃষ্টিতে গরমের উত্তাপ ভাব, ধুলোমাখা রাজধানী ধুয়ে সচ্ছতায় পরিপূর্ণ হবে।
অন্য সময় হলে প্রকৃতির এই সৌন্দর্য উপভোগ করতাম আমি! হাতে ক্যামেরা নিয়ে ক্যাপচার করে নিতাম এই চমৎকার ক্ষন!
কিন্তু আজ, এখন, এই মূর্হতটা অন্যরকম! আমি ব্যাস্ত পূর্ব ভাইয়ার কোলে বসে তার বুকে মুখ গুজে কাঁদতে! কান্নাটা আজ যেনো থামতেই চাইছে না। ভাইয়ার নীল রঙের শার্টটা শক্ত করে চেপে ধরে একাধারে কেঁদে চলেছি সব সংকোচ এড়িয়ে! পূর্ব ভাইয়ার ভয়ে যেই আমি জরোসরো হয়ে লুকিয়ে থাকতাম সেই আমিই আজ তার বুকে মাথা রেখে ফুপিয়ে কাঁদছি!
পূর্ব ভাইয়া আমায় তার সাথে শক্ত করে চেপে ধরে আছেন। তার হাত পা কাঁপছে! কিন্তু কেনো কাঁপছে জানা নেই?তিনি আমায় তার বুক মাঝারে খুব শক্ত করে জরীয়ে রেখেছেন! তার কোলে বসা আমি। আমায় এতোটা জোরে তার সাথে চেপে ধরেছেন যেনো আমি কোনো মূল্যবান বস্তু! ছেড়ে দিলেই হারিয়ে যাবো অতল সাগরে।
সময় এগোতেই কান্নাটা থেমে যায়। কান্না থামতো না আমার আরো চার পাঁচ ঘন্টাতেও। কিন্তু পূর্ব ভাইয়ার ধমকে কান্না অটোমেটিকলি থেমে গিয়ে নিজ বাড়ি চলে গিয়েছে। আমি এখনো তার বুকে মাথা দেয়া।
মাথায় কারো স্পর্শ পেতে চমকে উঠি! এটা পূর্ব ভাইয়ার স্পর্শ। তিনি আমার মুখের সামনে আসা চুলগুলো কে পিছে ঠেলে দিয়ে চোখের পানি মুছে দেন!
পূর্ব ভাইয়া চোখের পানি মুছতে মুছতে বললেন,,,
— নারীদের চোখের পানির মূল্য অনেক বেশি! এভাবে অকারণে কেঁদে কেঁদে মূল্যবান জিনিসটা ওয়েস্ট করছিস কেনো?
আমি নাক টেনে বলি,,,,
— নারীদের চোখের পানির মূল্য তার প্রিয়জনদের কাছে বেশি! এখানে আমার কোনো প্রিয়জন নেই। সো, কাদতেই পারি হোয়াট ইউর’স?
আমার উত্তর শুনে ভাইয়া আমার চুলগুলো কানের পিঠে গুজে দেন! এবার লজ্জা আমায় ক্রমশ আক্রমণ করছে। আমি তাদের আক্রমনে নুইয়ে পড়ছি। অস্বস্তি হচ্ছে এবার তার কোলে বসাতে।
পূর্ব ভাইয়া ফের বললেন,,,
—তার চোখের পানি তার উন্মাদ প্রেমিক ব্যাতীত কেও দেখতে পারবে না! কারন সে তার একান্ত সম্পদ! তার সম্রাক্ষি!
চোখদুটো আমার বড় বড় হয়ে যায়। মুখ অটোমেটিকলি হা হয়ে যায়।মাই গড! পূর্ব ভাইয়া মাত্র এটা কি বললেন? কাকে উদ্দেশ্য করে বললেন?
আমি চট করে তার বুক থেকে মাথা তুলে বিষ্ময় নিয়ে বলি,,,
— আপনি মাত্র কি বললেন পূর্ব ভাই? কাকে উদ্দেশ্য করে বললেন?
আমার কথা শুনে পূর্ব ভাই হামি তুলে বললেন,,,
—ডাফার! এটা একটা উপন্যাস এর লাইন ছিলো।
শান্ত হয়ে যাই। এক মূর্হতের যেনো কেনো জানি আমার মনে হলো ভাইয়া এই কথাটা আমায় উদ্দেশ্য করে বলেছেন। তার চোখ তাই বলছিলো!
________________________________
পূর্ব ভাইয়া সোজা আমায় হসপিটাল এ নিয়ে আসেন। ড্রাইভার কে বাসায় ফোন দিতে বলেছেন। যাতে তারা হসপিটাল এ আসেন।
পূর্ব ভাইয়া আমায় গাড়ি থেকে কোলে করে নিয়ে হসপিটালে প্রবেশ করেন।তখন এক মূর্হতের জন্য মনে হয়েছিলো আমি মরে যাই! জাষ্ট এই লজ্জার মূর্হতটা থেকে স্কিপ হয়ে যাই। পুরো হসপিটালে উপস্থিত মানুষজন আমাদের দিকেই তাকিয়ে ছিলো।
অতীব লজ্জা নিয়ে পূর্ব ভাইয়াকে বলি,,,
— ভাইয়া প্লিজ নামান! সবাই তাকিয়ে আছে।
পূর্ব ভাইয়া একটা রাম ধমক দিয়ে বললেন,,,,
— সো হোয়াট ক্যান আই ডু ষ্টুপিড?
— নিচে নামিয়ে দিন আমি হেঁটে যেতে পারবো।
মিনমিন সুরে চোখ বন্ধ করে কথাটি বলি।
প্রতিত্তুর আসে,,,
— লাইক রিয়েলি?তুই উইক হওয়াতে ঠিকমতো দাড়াতে পারছিস না আর এতোটা পথ হেঁটে যাবি? ফ্যান্টাস্টিক জোক! নাউ সাট ইউর মাউথ, আদারওয়াইজ আই উইল স্লাপ ইউ!
থাপ্পড়ের কথাটা কানে আসতেই থম মেরে যাই। কারণ আপাতত ভাইয়ার হাতের থাপ্পড় খাওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই।
তিনি আমাকে একটা কেবিনে এনে বেডে শুইয়ে দেন। পকেট থেকে ফোন বের করে কাওকে পাঁচ মিনিটের মধ্যে আসতে বলেন! আর তখনিই দুই তিন মিনিটের মাঝে কেবিনে প্রবেশ করে তিন চারজন নার্স আর দুজন মহিলা ডক্টর! সবার মুখে কেমন আতংক আর ভয়ের ছাপ!
স্ট্রেঞ্জ! এরা ভয় পাচ্ছে কেনো?
পূর্ব ভাইয়া তাদের লক্ষ করে গম্ভীর কন্ঠে বললেন,,,
— চেক হার কুইকলি!
তার কথা শোনামাত্র দুজন ডাক্টার দ্রুতপায়ে আমার কাছে আসেন। আমার হাত, চোখ, পালস চেক করেন! অতঃপর একজন ডাক্তার চিন্তিত কন্ঠে বলেন,,,,
— স্যার, ম্যামের বডি একটু উইক! ওনাকে স্যালাইন দেয়া লাগবে। হাত ভাঙ্গেনি মুচড়ে গিয়েছে! ব্যান্ডেজ করে রাখলে সপ্তাহ খানেক এর মাঝে হাত ঠিক হয়ে যাবে।
পূর্ব ভাইয়া ডাক্তার এর কথা শুনে চট জলদি বললেন,,,
— যা করার জলদি করুন! আমি ওকে সুস্থ দেখতে চাই। এন্ড ইয়াহ, যা করার সাবধানে করবেন যাতে ও ব্যাথা না পায়! গট ইট?
সবাই মাথা নাড়ে!
আমি অবাক চোখে সব দেখছি। উনারা সবাই পূর্ব ভাইয়ার কথায় এভাবে কর্মচারীর মতো মাথা নাড়ছেন কেনো? এসব দৃশ্য দেখে মনে হচ্ছে পূর্ব ভাইয়া এখানকার রাজা আর ডাক্টার আর নার্সরা তারা কর্মচারী!
একজন নার্স এসে আমার বাম হাতে ক্যানেলা পড়াতে নিলেই তড়িৎ বেগে পূর্ব ভাইয়া আমার পাশে আসেন! কড়া কন্ঠে বললেন,,,
— আস্তে করবেন!
নার্স ভীত চোখে নাড়ায়!
ভাইয়া এবার আমার দিকে তাকায়! তার চোখে কষ্ট, অস্থিরতার ছাপ! এমন চাহনির মানে বুঝলাম না।
পূর্ব ভাইয়া বললেন,,,,
— তুই জলদি সুস্থ হয়ে যাবি। একদম টেনশন করবেন না।
— আমার তো টেনশন হচ্ছেনা পূর্ব ভাই। সামান্য চোট! কিন্তু আপনাকে এতোটা চিন্তিত দেখাচ্ছে কেনো?
— সেটার তোর না ভাবলেও চলবে! এখন চুপ থাক।
নার্স ক্যানেলা হাতে লাগিয়ে স্যালাইন দিয়ে দেন। অন্য একজন নার্স এসে ডান হাত ধরে ব্যান্ডেজ করতে নিবে তখনই ব্যাথায় আমি কিছুটা কুকিয়ে উঠি! আমার অবস্থা দেখে পূর্ব ভাই ভয় পান! নার্সের দিকে তাকিয়ে হুংকার ছেড়ে বললেন,,,
— বলেছিলাম না ও যাতে ব্যাথা না পায় সেভাবে কাজ করবেন?লুক, দোল ব্যাথা পাচ্ছে! কই থাকে ধ্যান? ঠিকভাবে কাজ করতে পারবেন তো নার্স কেনো হলেন?
নার্স ভয়ার্ত কন্ঠে বললেন,,,,,
— সরি স্যার! আর ব্যান্ডেজ করতে নিলে একটু তো ব্যাথা পাবে,,,
নার্সের কথা অর্ধ সম্পূর্ণ রেখে পূর্ব ভাইয়া দাঁতে দাঁত চেপে বললেন,,,,
— আমি কোনো কিছু শুনতে চাইনা! ও যাতে ব্যাথা না পায় সেভাবে ব্যান্ডেজ করুন!
নার্স অসহায় চাহনি দিয়ে হাতে ব্যান্ডেজ করা শুরু করে। আমি এবার নিজেকে শক্ত রেখেছি। ব্যাথাটা বাহিরে প্রকাশ করেনি। কারন দেখা যাবে পূর্ব ভাই আবার নার্স এর ওপর চিল্লানো শুরু করেছেন! বেচারা নার্স! কিন্তু তার এতোটা রিয়েক্ট করার রিজনটা বুঝতে পারছিনা কিছুতেই।
____________________________________
কারো কান্না শুনে চোখ খুলে নেই! সামনে তাকাতেই দেখি আম্মুকে। সাথে বাবা, বড় চাচু সবাই উপস্থিত! চোখ ঠিকমতো খুলে নিয়ে সবাইকে পরখ করি। স্যালাইনে ঘুমের ঔষধ মেশানো ছিলো যার ফলস্বরূপ ঘুমিয়ে পড়েছিলাম!
আশপাশে পূর্ব ভাইয়াকে খুজতে লাগলো আমার বেহায়া চোখ! কিন্তু তাকে দেখতে পেলাম না। তার মাঝেই আম্মু বলে উঠে,,,
— তোর কি হয়েছে বল তো?একটার পর একটা বিপদ আসছে। নিজের খেয়াল রাখতে পারিস না? কেনো গেলি ছেলেটাকে থাপ্পড় মারতে?বুঝলাম অন্যায় করেছে কিন্তু নিজের খেয়াল তো আগে দোলা! তোর বাবা বডিগার্ড দিতে চাইলো তাও শুনলি না!
আম্মুর কথা শেষ হতেই দেখলাম পূর্ব ভাই হাতে কিছু কাগজ নিয়ে ঢুকছেন। তিনি গম্ভীর কন্ঠে বললেন,,,
— বডিগার্ড দেয়ার দরকার নেই ছোট চাচী! দোলের খেয়াল এখন থেকে আমি রাখবো।
পূর্ব ভাইয়ার কথা শুনে আম্মুর মুখে প্রশান্তির রেশ দেখলাম। আমি অসহায়! এই লোকের পিছু কি ছাড়ানো যাবেনা?
পরিবারের সবাই মোটামুটি বেশ কয়েকটা বকা আর আদরমাখা কথা বলতে থাকলেন। তার মাঝেই পূর্ব ভাইয়া জানান আমার রিলাইজ এর কথা! রিলাইজ দিয়েছে হসপিটাল থেকে!
বেড থেকে নামতে যাবো তখনি মাথা ঘুরে পড়ে যেতে নেই। অমনি বলিষ্ঠ দুহাত আমায় আঁকড়ে নেয় পরম ভাবে! চোখ খুলে সামনে পড়ে পূর্ব ভাইয়ার কঠিন মুখ। তিনি চোয়াল শক্ত করে বললেন,,,
— কে বলেছিলো তোকে একা দাঁড়াতে? বেশি পাকনামি?পাকনি একটা!
রুমে উপস্থিত কারো দিকে না দেখে পূর্ব ভাইয়া আমায় একটানে কোলে তুলে নেন! আকষ্মিক কান্ডে আমি হতবিহ্বল! নির্বাক চাহনি দিয়ে তাকিয়ে আছি তার দিকে। পূর্ব ভাইয়া সেই চাহনি উপেক্ষা করে বললেন,,,
— তোমরা সবাই বাসায় চলে যাও। আমি ওকে আমার গাড়ীতে নিয়ে আসছি!
বড় চাচু, বাবা সবাই এতে সম্মতি জানান!
আমার লজ্জা পাচ্ছে! অতিরিক্ত রকমের লজ্জা! ইশ… আব্বু আম্মুর সামনে কোলে না নিলে হতোনা? পূর্ব ভাইয়াকে মনে মনে কঠিন গালি দিবো বলে ঠিক করলাম! কিন্তু আমি তো গালিই জানিনা।ধুরর…..!
_______________________________
গাড়ি চলছে আপন গতীতে!
আমি মুখ ফুলিয়ে বসে আছি। পূর্ব ভাইয়া আড়চোখে আমায় কয়েকবার দেখেছেন তবে আমি যে রেগে আছি তা কেনো রেগে আছি সেই কারণটা একবারও জিজ্ঞেস করলেন না।বদমাইশ লোক একটা! বউ জুটবে না এর কপালে!
কিছুদূর যেতেই গাড়ি থেমে যায়। জ্যাম লেগেছে! এতে বিরক্তিরা যেনো আমার ভিতরে আন্দোলন শুরু করেছে। গাড়ির সিটে হেলান দিয়ে মাথা এলিয়ে দেই। দৃষ্টি বাহিরে বহমান!
তখনি আমার নজরে আসে একটা আইসক্রিম এর দোকান! দোকান বলতে সেটা ফেরীকরে বিক্রিত একটা ভ্যান বলা হয়।
আইসক্রিম দেখে চোখ চকচক করে উঠলো! আমি চট করে তাকাই পূর্ব ভাইয়ার দিকে। তিনি আমার দিকেই তাকিয়ে ছিলেন। আমি তাকাতে খুব স্বাভাবিক ভাবে দৃষ্টি অন্যদিকে দেন।
আমি আবেগ মাখা কন্ঠে বলি,,,,
— পূর্ব ভাইয়া আমি আইসক্রিম খাবো!
আমার কথা তার কানে যেতেই তিনি ভ্রু কুচকে তাকান আমার দিকে। কড়া কন্ঠে বলেন,,,
—- ইম্পসিবল! ভুলে গেছিস তোর কোল্ড এলার্জি আছে?
— একবার খেলে কিছু হবেনা ভাইয়া! প্লিজজজ কিনে দিন না। আমার পার্সটা বাসায়।
পূর্ব ভাইয়া কঠিন স্বরে বললেন,,,
— নো ওয়ে!
বলেই গাড়ি স্টার্ট করেন। সামনে তাকাতে দেখি জ্যাম ছুটে গিয়েছে। কান্না পায় আমার। পূর্ব ভাইয়া একজন নিষ্ঠুর মানুষ! খুব নিষ্ঠুর!
খানিকবাদে আবার গাড়ি থামে!
আমি মাথা উচু করে গাড়ি থামার কারন দেখতেই চমকে উঠি। গাড়ি একটা আইসক্রিম পার্লার এর সামনে দাড় করানো!
পূর্ব ভাইয়ার দিকে তাকাতে তিনি গম্ভীর কন্ঠে বলেন,,,
— ফুটপাথের খাবার স্বাস্থ্যের জন্য ভালো না!
আমি হেসে দেই! লোকটা পাগল!
গাড়ি থেকে নামতে যাবো তখনই তিনি অন্য পাশ দিয়ে নেমে এসে আমার পাশে দাঁড়ান! দরজা খুলে দিয়ে ফট করে কোলে তুলে নেয়। ড্যাবড্যাব করে চেয়ে আছি। পরক্ষণে ফের আমায় লজ্জা আকড়ে ধরে!
তার বুকে মুখ লুকাতেই তিনি ফিসফিস করে বললেন,,,,
— লজ্জা নারীর ভূষণ! সে কি জানে তার উন্মাদ প্রেমিক তার লজ্জা মিশ্রিত মুখশ্রী তে মাতাল হয়েছে বারংবার? মাতোয়ারা হয়েছে তার প্রতি! সম্মোহীত হয়েছে তার স্নিগ্ধময় প্রেমে!
পূর্ব ভাইয়ার কথ্য কানে আসতেই মাথা তুলি! পরক্ষণে মাথা এলিয়ে দেই এই ভেবে হয়তো এটাও কোনো উপন্যাস এর লাইন ছিলো।কিন্তু এভাবে হুটহাট এসব বলার মানে কি?
চলবে,