স্বপ্নছায়া ২ পর্ব-০৪

0
596

#স্বপ্নছায়া
#দ্বিতীয়_খন্ড
#৪র্থ_পর্ব

ঐন্দ্রিলা এক রাশ বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে রয়েছে অভ্রের দিকে। দিশানের ম্যাডামের দেওয়া আংটিটা মেঝেতে পড়ে রয়েছে। তার উপরের লাল পাথরটা ভেঙ্গে চুরমার হয়ে মেঝেতে বিক্ষিপ্ত হয়ে গিয়েছে। দিশান জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার বাবার এমন রুপ তার অজানা। প্রচন্ড শীতের মধ্যেও কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জড়ো হয়েছে অভ্রের কপালে। তার শান্ত চোখ জোড়া ঈষৎ লাল হয়ে গিয়েছে। মসৃণ কপালে চিন্তার রেখা। সে তীব্র রোষ নিয়ে বললো,
— “আমি তোমাকে কত বার নিষেধ করেছি দিশান? অপরিচিত মানুষের কাছ থেকে কিছুই দিবে না তুমি। তবুও কেনো এই গিফট টা নিয়েছো?”
— “বাবা, উনি তো আমার ম্যাডাম”
— “কত দিন থেকে চেনো তাকে?”

দিশান আঙ্গুল গুনে বললো,
— “সাত দিন, উনি নতুন এসেছেন৷ ইংলিশ এর জন্য”
— তাহলে? তুমি কেনো তার থেকে এই এক্সপেন্সিভ জিনিসটা নিতে গেলে?”

অভ্র রুঢ় কন্ঠে প্রশ্ন ছুড়লো। দিশান উত্তর দিতে পারছে না। সে আংটিটা নেবার সময় এতোকিছু চিন্তা করে নি। ঐন্দ্রিলা পরিস্থিতিকে শান্ত করতে অভ্রকে বললো,
— “একটা আংটি নিয়েছে তাতে এতোটা রাগার তো কিছু হয় নি অভ্র। ব্যাপারটা খুব ই সামান্য।”
— “আমি কথা বলছি তো ঐন্দ্রিলা। প্লিজ কথার মাঝে কথা বলো না।”

অভ্রের শীতল কন্ঠে বলা কথায় চুপ হয়ে গেলো ঐন্দ্রিলা। অভ্রের রুঢ় আচারণে খানিকটা আহত ও হলো সে। অন্যসময় হলে হয়তো সে অভ্রকে দু কথা শুনিয়ে দিতো। কিন্তু দিশানের সামনে ঝগড়া কথাটা উচিত হবে না। তাই কথা না বাড়ানোই শ্রেয়। অপরদিকে অভ্র কঠিন কন্ঠে বললো,
— “এই শেষ বার দিশান। ওই ম্যাডামের আশেপাশেও তুমি থাকবে না। আমি কাল ই স্কুলে কমপ্লেইন জানাবো৷ কোন টিচার তার স্টুডেন্টদের এমন অদ্ভুত জিনিস এজ গিফট দেয়! আর যদি কখনো এমন আচারণ দেখি আমি তোমার স্কুল বদলে দিবো”

অভ্রের শরীর রাগে কাঁপছে। সে আড়চোখে আংটিটি একবার দেখে হনহন করে ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে গেলো। দিশান ঐন্দ্রির কাছে ছুটে আসলো। কাঁদো কাঁদো স্বরে বললো,
— “মাম্মাম, আমার স্কুল বদলিও না। এটা খুব ভালো স্কুল। আমার অনেক বন্ধু আছে”

ঐন্দ্রিলা অভ্রের কথার মর্মার্থ বুঝলো না। সামান্য ব্যাপারে স্কুল বদলানোর কি দরকার! কিন্তু দিশানের সামনে তার চিন্তা দেখাতে পারছে না সে। তাই দিশানের আকুল নিবেদনে সে তাকে স্বান্তনা দিয়ে বললো,
— “তোমার স্কুল বদল হবে না সোনা, শুধু তুমি ওই ম্যামের কাছ থেকে কিছু নিও না। বাবা রেগে আছে তো! মাম্মাম বুঝিয়ে বলবো তাকে পরে, ওকে?”
— “ওকে”
— “গুড বয়”

বলেই তার কপালে চুমু একে তাকে পড়তে বলে ঐন্দ্রিলা। তারপর নিজ ঘরে চলে আসে। ঘরে প্রবেশ করতেই দেখে অভ্র বিছানাতে বসে রয়েছে। হাতদুখানা জড়ো করে মাথা ঠেকিয়ে চোখ বুজে আছে সে। ঐন্দ্রিলা শান্ত গলায় প্রশ্ন ছুড়ে দিলো,
— “একটা সামান্য আংটি নিয়ে এতোটা হাঙ্গামা করাটা কি ঠিক হয়েছে?”

ঐন্দ্রিলার প্রশ্নে মাথা তুলে অভ্র, তীর্যক দৃষ্টিতে তাকায় তার দিকে। শীতল কন্ঠে উত্তর দেয়,
— “তোমার কাছে সেটা হাঙ্গামা মনে হলেও আমার কাছে তা মনে হয় নি। আর আমার সন্তানের জন্য আমার চিন্তা হওয়াটা কি খুব অস্বাভাবিক ঐন্দ্রিলা?”
— “সেই কারণটাই আমি জানতে চাচ্ছি, অভ্র, কারণ এখানে তো আমি চিন্তার কোনো কারণ দেখছি না”
— “কোনো টিচারকে কি কখনো আংটি এজ এপ্রিসিয়েশন গিফট দিতে দেখেছো? কলম দিতে পারতো অন্য কিছুও দিতে পারতো। এটা কি অস্বাভাবিক নয়?”

তীব্র রোষে কথাটা বললো অভ্র। ঐন্দ্রিলার খানিকটা উটকো লেগেছিলো। কিন্তু সে ততোটা গভীর ভাবে চিন্তা করে নি। অভ্র আবার বললো,
— “আজকাল কতো ধরণের ঘটনা ঘটছে। স্কুল থেকে বাচ্চা কিডন্যাপ হচ্ছে, আরো না জানি কতো কি! দিশান যদি এমন কোনো ট্রাপে পড়ে? কি করবো আমরা?”
— “কিন্তু এতো রেপোটেটেড স্কুলে এমন কেনো হবে? আর আপনি এতোটা ভয় পাচ্ছেন কেনো? অভ্র আমি আপনাকে কখনোই এতোটা ডেস্পারেট দেখি নি। এতোটা বিচলিত কেনো হচ্ছেন আপনি?”

ঐন্দ্রিলার স্বর তীক্ষ্ণ হয়, তার চোখে জিজ্ঞাসা। সে তার প্রশ্নের উত্তর চায়। অভ্র এবার খানিকটা দমলো। চোখ বুজে নিজের রাগ দমন করার চেষ্টা করলো। তারপর উঠে দাঁড়ালো। আলমারি থেকে কাপড় বের করে ওয়াশরুমে যেতে নিলে ঐন্দ্রিলা পুনরায় প্রশ্ন করে উঠলো,
— “আমি আমার উত্তর পাই নি অভ্র”
— “আমার পরিবারের প্রতি আমি সর্বদাই এতোটাই ডেস্পারেট”

ঠান্ডা কন্ঠে কথাটা বলে সে ওয়াশরুমে চলে যায়। ঐন্দ্রিলা অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে অভ্রের যাবার পানে। অভ্রের অদ্ভুত আচারণ তাকে পাগল করে দিচ্ছে। কেনো অভ্র তাকে কিছু জানাতে চাচ্ছে না, কেনো বারে বারে তার থেকে লুকিয়ে যাচ্ছে, কেনো! উত্তরগুলো অজানা। হতাশায় বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে আসে ঐন্দ্রিলার। কেনো যেনো চোখ জ্বালা করছে। অদ্রি হবার পর থেকে নিজ আবেগের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। সামান্য কথা কাটাকাটিতে তার হৃদয় ব্যাকুল হয়ে পড়ে। চোখে হাজারো জলরাশি জড়ো হয়। যেমনটা এখন হয়েছে! চেনা মানুষটিকে অচেনা লাগছে তার_______

৪.
ভর দুপুর। পৌষের রোদে তাপ নেই। ভার্সিটি গেটের ঝড়া কৃষ্ণাচূড়া গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছে দিশা, রিক্সার অপেক্ষায়। তার ক্লাস শেষ হয়েছে মাত্র। কিন্তু ভর দুপুরে গেটে রিক্সা পাওয়াটা একটু দুষ্কর ব্যাপার৷ অবশ্য শীতের রোদে দাঁড়িয়ে থাকতে মন্দ লাগছে না তার। বরং গা টা গরম হয়ে যাচ্ছে। এই ক দিন নিন্মচাপের জন্য শীতটা বেড়েছে। শাল পড়েও শীত মানছে না তাই। দিশা এখন অনার্স থার্ড ইয়ারে পড়ে, বিষয় গণিত। গণিতে নাকি মেয়েরা পারদর্শী হয় না। কিন্তু দিশার ক্ষেত্রে সেটা সম্পূর্ণ ভুল। সে তার ক্লাসের হাইয়েস্ট সিজিধারী। দিশার মনে হয়, জীবনটাই একটা গণিত। উদ্দেশ্য এই গোবেচারা “x” খোঁজা। কেউ পায়, কেউবা সারাটা জীবন খুজেই যায়।

হঠাৎ একটা রিক্সা এসে থামলো দিশার সামনে। রিক্সার দাঁড়ানো দেখে মনে হলো তাকে কেউ নির্দেশনা দিয়ে যেনো দিশার সামনে থামানো হয়। দিশার দিকে তাকিয়ে বৃদ্ধ চালক বললেন,
— “মা উঠে পরুন”
— “কিন্তু আমি তো আপনাকে ডাকি নি! আপনি কিভাবে জানেন আমি কোথাও যাবো?”

অবাক কন্ঠে প্রশ্নটি করলো দিশা। তার প্রশ্নের প্রতিত্তোরে লোকটি এক গাল হেসে বললো,
— “আমারে স্যার পাঠাইলো, বললেন, সামনে একটা মেয়ে আছে তারে ভাড়া নিতে, উঠেন উঠেন। রিক্সা জমা দিমু।”

দিশা অবাক হলো, কে পাঠালো! কোন স্যার! দিশা স্পষ্ট স্বরে বললো,
— “আমি যাবো না, কোন স্যার না কে পাঠিয়েছে। আপনি চলে যান। আপনার রিক্সায় উঠবো না।”
— “কিন্তু ওই যে গণিত ভবনের ওই টিচার বললেন”

এবার দিশার বুঝতে বাকি রইলো না রিক্সাটা কে পাঠিয়েছে। এই লোকটির কি সমস্যা বুঝে না দিশা। হুটহাট এমন অদ্ভুত অদ্ভুত কাজ করবে! কখনো ছাতা তো কখনো নোট এখন রিক্সা। দিশা এক রাশ বিরক্তি নিয়ে বলল,
— “চলে যান চাচা, আমি যাবো না।”
— “কিন্তু”
— “বললাম তো যাবো না”
— “উনি তো টাকাও দিয়ে দিলো”
— “আচ্ছা জ্বালা, উনি কি আপনাকে পরে দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞেস করবে নাকি? আপনি রেখে দিন”
— “গরীব হলেও আমি খোদ্দার মানুষ মা”

এবার দীর্ঘশ্বাস ফেললো দিশা। উপায়ন্তর না পেয়ে বুড়োর রিক্সাতে উঠতে হলো তার। কিন্তু মনে মনে এক হাজারটা গালি বকলো সেই মানুষটিকে। মানুষটি আর কেউ নয়, বরং আহাশ। তার ডিপার্টমেন্টের এসিসট্যান্ট টিচার সে। সত্যি বুঝে না দিশা, লোকটির সমস্যা কি! সে কেনো বুঝে না দিশা তাকে পছন্দ করে না। আর করলেও বা কি! তাদের পরিবার কখনোই এই সম্পর্ক মেনে নিবে না। গতবারের ঘা ভরলেও দাঁগটা রয়ে গেছে। বদরুল সাহেব এবং নীলাদ্রি তার পা ভেঙ্গে দিবে যদি এই প্রেম নিবেদন সে গ্রহণ করে। কেনো যে লোকটা বুঝে না? আর শিক্ষকের সাথে কি ছাত্রীর প্রেম হয়!

রাত ২টা,
পিনপতন নিস্তব্ধতা বেধ করলো চাঁপা স্বর। ঐন্দ্রিলার ঘুমটা ভেঙ্গে গেলো। ক্ষীন উত্তেজিত স্বর শোনা যাচ্ছে। ধীরে ধীরে স্বর গাঢ় হলো। ঐন্দ্রিলা উঠে বসলো। চোখ কচলে তাকালো অদ্রির দিকে। সে নিবিড় ঘুমে লিপ্ত। ঐন্দ্রিলা খেয়াল করলো অভ্রের কন্ঠ শোনা যাচ্ছে। সে কারোর সাথে চিৎকার করছে। ঐন্দ্রিলা ধ্বনি অনুসরণ করে এগিয়ে গেলো বারান্দার দিকে। অভ্র ফোনে করা বলছে। তার কন্ঠের রোষ স্পষ্ট৷ ঐন্দ্রিলা কাছে যেতেই শুনতে পেলো,
— “আমার ছেলের থেকে দূরে থাকো। শেষবারের মতো বলছি। তোমার ছায়াও যদি আমার ছেলের উপর পড়ে আমার থেকে খারাপ কেউ হবে না। আর আমার লাস্ট ওয়ার্নিং.………..

চলবে।