#স্বপ্নছায়া (কপি করা নিষিদ্ধ)
#দ্বিতীয়_খন্ড
#৯ম_পর্ব
প্রচন্ড ঠান্ডার মাঝেও মাথার উপর ফ্যান ভনভন করে ঘুরছে। শওকত সাহেব এবং শারমিনের বেগমের মুখ থমথমে। ঐন্দ্রিলা তাদের সামনে নত মস্তকে বসে রয়েছে। টি টেবিলে সমনটি পড়ে রয়েছে। এতো শীতের মাঝেও শওকত সাহেব ঘামছেন। অভ্রকে ফোন করা হয়েছে, সে জানিয়েছে সে আসছে। কিছু সময় পূর্বে ঐন্দ্রির মোবাইলে অপরিচিত নাম্বার থেকে একটি ম্যাসেজ আছে,
“game on”
ঐন্দ্রিরার বুঝতে বাকি থাকে না ম্যাসেজটি কে পাঠিয়েছে। তবে অবাক হয় তার ফোন নাম্বার জ্যানেট পেলো কিভাবে? উপায়ন্তর না পেয়ে সমনটি সাইন করে রিসিভ করে সে। শওকত সাহেব বসার ঘরে থাকার জন্য তিনিও ব্যাপারটি সম্পর্কে অবগত হন। ঐন্দ্রিলা এবং অভ্র চেয়েছিলো ব্যাপারটা গোপনীয় রাখবে, কিন্তু এই চতুর জ্যানেট তা হতে দিলো না। শওকত সাহেব চিন্তিত কন্ঠে বললেন,
— “তোমরা কি কিছু ভেবেছো? কি করবে? আমার তো মাথায় ঢুকছে না কিছু। কোর্ট, মামলা, মুকদ্দমা। আমাদের দিশানটার বয়স ও বেশি না। ও কি এগুলো সইতে পারবে? ছোট মস্তিষ্কে না জানি কি প্রভাব ফেলবে? অভ্র কখনো কোর্টের ধারেও যায় নি। কি এক বিপদ!”
শওকত সাহেবের চিন্তা স্বাভাবিক। যে মানুষেরা সারাটা জীবন সমাজের বানানো ছাঁচে জীবন কাটাতে চায় তাদের জন্য কোর্ট, মামলা ব্যাপারগুলো অত্যন্ত জটিল লাগে। অভ্র নামকরা ব্যবসায়ী হলেও এই কোর্ট, থানা, পুলিশ ব্যাপারগুলোর ধারে কাছে কোনো সময় ছিলো না। তাই শওকত সাহেবের ভয় লাগছে। উপরন্তু দিশানকে হারাবার উদ্বিগ্নতাও তার মাঝে রয়েছে। বুড়ো বয়সে পরিবারের এমন ভাঙনটা ঠিক মানতে কষ্ট হচ্ছে। এর মাঝেই কলিংবেল বেজে উঠে। মাহফুজা দরজা খুলে দিতেই আহাশ এবং অভ্র একই সাথে বাড়ি প্রবেশ করে। আহাশ বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে গিয়েছিলো। সেখান থেকেই ফিরেছে। অভ্রকে বিভ্রান্তের ন্যায় গাড়ি থেকে নামতে দেখে সে তাকে জিজ্ঞেস করে, কিন্তু উত্তরে অভ্র বলে,
— “আগে বাসায় যাই, সব বলছি”
বসার ঘরে বাবা-মার চিন্তিত মুখখানা দেখে আহাশের কৌতুহল দ্বিগুন হয়। অভ্র এসেই সমনটা হাতে নেই। সামনের ১২ জানুয়ারী কেসের ডেট পড়েছে। অভ্র ক্ষিপ্র কন্ঠে বলে,
— “এই মহিলার স্পর্ধা দেখে আমি অবাক। এ সত্যি ই ভাবে ও এই কেস জিতবে?”
— “অভ্র আপনি শান্ত হন। এখন মাথা গরম করার সময় নয়। মাথা ঠান্ডা রেখে ছক কষতে হবে। উনার কাছে আমাদের দিশান দাবার গুটি কেবল। কিন্তু আমাদের কাছে সে অমূল্য, আমাদের সন্তান। তাই বলছি আপনি শান্ত হন”
ঐন্দ্রিলার কথায় কিছুটা শান্ত হয় অভ্র। বিপদে মানুষের মাথা কাজ করে না, ফলে সে ভুল করে বেশি। আহাশ তখন প্রশ্ন করে উঠে,
— “আচ্ছা, এটা নিয়ে উনি বাড়াবাড়ি টা করছেন কেনো? উনি কি জানেন না সন্তানের কাস্টেডি তার বাবার কাছেই থাকে? এই কেসে উনি হেরে যাবেন। অহেতুক কেনো উনি এই কাজগুলো করছেন?”
— “জ্যানেট মহিলাটা বোকা নয় আহাশ, প্রচন্ড ধূর্ত। সে জানে সে হারবে। অথচ সে এই কাজগুলো করছে। না চিন্তা করে সে কাজগুলো করবে না। কিন্তু কেনো? কেনো সে দিশানকে নিতে চায়। ওর মোটিভ কি? প্রতিটা মানুষের কাজের পেছনে কোনো না কোনো কারণ থাকে, দিশানকে নিয়ে ওর লাভ কি?”
এদিকে ছোট দিশান গোলগোল চোখে বসার ঘরের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। মা বাবার চিন্তার কারণটা সে বুঝতে পারছে না। কিন্তু ছোট বাচ্চাটি বুঝতে পারছে কিছু একটা মারাত্মক কিছু ঘটেছে তাই সবাই চিন্তিত।
রাত বারোটা,
বারান্দায় দাঁড়িয়ে একের পর এক সিগারেট টেনে যাচ্ছে অভ্র। তার চোখ নির্ঘুম। মাথাটা টনটন করছে ব্যাথায়। নিজেকে অসহায় লাগছে প্রচন্ড। হিম বাতাস ছুয়ে যাচ্ছে তার খোঁচা দাঁড়ি। কালো আকাশের এক কোনায় রুপালি চাঁদটি নিজের সর্বস্ব উজার করে আছে। আজ যে পূর্ণিমা। কিন্তু এই সুন্দর চন্দ্রমা ছেড়ে ক্লান্ত প্রগাঢ় চোখ জোড়া তাকিয়ে আছে নির্ঘুম শহরের সেই হলুদ ল্যাম্পপোস্টের দিকে। হঠাৎ কারোর স্পর্শ অনুভব হলো পিঠে। শূন্য চাহনী নিয়ে ফিরলো পেছনে। ঐন্দ্রিলা দাঁড়িয়ে রয়েছে। রুপালি আলোয় মনোমুগ্ধকর লাগছে তাকে, ধীর স্বরে বলে,
— “কেনো হৃদয়টাকে পুড়াচ্ছেন?”
অভ্র কথা বললো না, কিয়ৎকাল এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো তার বাঘিনীর দিকে। তারপর জ্বলন্ত অর্ধ সিগারেটটা ফেলে জড়িয়ে ধরলো ঐন্দ্রিলাকে। কপাল ঠেকালো কাঁধে, নিবিড় হলো হাতের বাধন। উত্তপ্ত নিঃশ্বাস পুড়াচ্ছে ঐন্দ্রিকে। তপ্ত শ্বাস ফেলে বললো,
— “খুব অস্থির লাগছে ঐন্দ্রি। কেনো যেনো মনে হচ্ছে আমি গোলকধাধায় ছুটছি। কিন্তু পথ পাচ্ছি না। ভীতু আমাকে কি একটু আলো দেখাবে? আমি সত্যি বুঝছি না অদূর ভবিষ্যৎ এ কি অপেক্ষা করছে”
— “অভ্র চৌধুরী বুঝি ভয় পায়?”
— “খুব ভয় পায় ঐন্দ্রি। আমার পরিবার যে আমার শক্তি। ওই মহিলাটা আমার শক্তির হাটু ভাঙ্গতে চাইছে। আচ্ছা আমি কি খুব ব্যর্থ বাবা?”
ঐন্দ্রিলা কিছু সময় চুপ করে থাকে। প্রিয় মানুষটিকে এরুপ উদ্রিব দেখবে এটা যেনো কল্পনাতীত। রুদ্ধশ্বাস ফেলে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো সে অভ্রকে। চুলে হাত চালাতে চালাতে বলল,
— “আপনি কখনোই ব্যর্থ নন। ব্যর্থ পিতা তো একেবারেই না। যে মানুষটির কাছে তার সন্তান সবার আগে সে ব্যার্থ কি করে হয় বলুন তো? এসব ফাও কথা। একেবারে কানে তুলবেন না। আমি বলছি সব আঁধার কেটে যাবে। আমাদের স্বপ্নছায়ায় কালো হাতগুলো উবে যাবে কুসুমপ্রভায়। মিলিয়ে নিবেন”
ঐন্দ্রিলার কন্ঠ যেনো শান্তির লহর বয়ে দিলো। বুকটা শান্ত হয়ে গেলো নিমিষেই। উত্তাল ঝড় শীতল হলো। অভ্র ঐন্দ্রিলাকে আরও নিবিড় ভাবে জড়িয়ে ধরলো। অভ্রের ইচ্ছে হলো প্রেয়সীকে এভাবেই নিজের মাঝে লেপ্টে রাখতে। মূহুর্তটা ঘন হলো ভালোবাসার উত্তাপে। চাঁদের রুপালি আলো সাক্ষী তাদের সেই একান্ত মূহুর্তের।
শওকত সাহেব বসে নির্ঘুম শুয়ে আছে বিছানায়। শারমিন বেগম পাশ ফিরতেই দেখলেন তার স্বামী এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন সিলিং এর দিকে। ক্ষীন চিন্তিত কন্ঠে বললোন,
— “কি গো, ঘুমোবেন না?”
— “ঘুম আসছে না গো। ভুল করে ফেললাম কি?”
— “কি ভুল?”
— “তখন দিশানের ওই এডাপশনের সিদ্ধান্তটা না নিলেই হয়তো ভালো হতো”
— “আপনি তো দিশানের ভালো ভেবেই কাজটা করেছেন। এখন জ্যানিফারের পরিবার যে এমন একটা বিপাকে ফেলাবে সেটা কি আমরা জানি?”
— “কিন্তু এই এক সুতো যে কত দূর যাবে?”
— “আরে আপনি খামোখা চিন্তা করছেন। কিছুই হবে না দেখবেন। অভ্র তো বললো, ও কোর্টে সব সত্যি বলে দিবে। জ্যানিফার আর অভ্রের বিয়েটাও তো হয়েছিলো”
শওকত সাহেব শব্দ করে নিঃশ্বাস ফেললেন। তার মনটা অস্থির করছে। কেনো যেনো মনে হচ্ছে একটা ঝড় আসছে। খুব সুবিশাল প্রলয়ংকারী ঝড়। যা তার পরিবারকে তছনছ করে দিতে সময় লাগাবে না____________________
সকাল এগারোটা,
আশরাফ গনির সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে নীলাদ্রি। আশরাফ গনি নীলাদ্রি বস। তিনি এই অফিসের একজন হর্তাকর্তা, বেশ কিছু মাস ধরেই নীলাদ্রির কাছের ঝামেলা চলছে। বেশ ক বার ওয়ার্নিং ও সে পেয়েছে। আর বর্তমানে নীলাদ্রির কাজের প্রতি অমনযোগীতা আশরাফকে প্রচন্ড বিরক্ত করছে। ফাইল ঘাটতে ঘাটতে বেশ রাগান্বিত স্বরেই সে বলে,
— “নীলাদ্রি, আমি সত্যি ই খুব অপ্রসন্ন হয়েছি তোমার উপর। এতোটা দায়িত্বহীনতা তোমার থেকে সত্যি আশা করি না। যখন তখন ছুটি নিচ্ছো। কাজে মন নেই। হুট হাট করে বাড়ি চলে যাচ্ছ। সমস্যা কি?”
— “স্যার, আসলে আমার স্ত্রী প্রেগন্যান্ট। হুট হাট ওর শরীরটা খারাপ হয়ে যায়। বাবা একা থাকে। আমারো বেশ চিন্তা হয় ওকে নিয়ে। তাই আমাকে যেতে হয়”
— “শুভকামনা। কিন্তু তুমি পৃথিবীতে একা বাবা হচ্ছো না। অনেক মানুষ বাবা হয়। তুমি যা করছো তা ইনটোলারেবল। তাই উপর থেকে অর্ডার এসেছে। তোমার চাকরি থাকলেও তোমাকে বদলি করা হচ্ছে…………
চলবে।
মুশফিকা রহমান মৈথি।