#হৃদয়_জানে_মনের_কথা
#পর্ব_৩
#লেখনীতে_মারিয়া_আক্তার_মাতিন
স্রোত কয়েকবার লেখাগুলো পড়লো। সে যেন নিজের চোখকে বিশ্বাসই করতে পারছে না। অন্বয় ভাই তার জন্য নতুন ফোন কিনে এনেছে? কাগজটা সে হাতের মুঠোয় চেপে ধরে বক্সটা খুলল। ভিতরে একদম নতুন ফোন। স্ক্রিনে কোম্পানির স্টিকার লাগানো।
স্রোতের বুকের ভিতরটা হঠাৎ কেমন মোচড় দিয়ে উঠলো। লোকটা তার বাবার কিনে দেওয়া ফোন ভেঙে এখন আবার নতুন ফোন কিনে এনেছে। সে কি রাগ করবে নাকি খুশি হবে বুঝতে পারছে না। আচ্ছা, অন্বয় ভাই এমন কেন? নিজেই আঘাত করবে, পরে নিজেই সেই ক্ষততে মলম লাগাবে। এর মাঝেই দরজার বাইরে কারো পায়ের আওয়াজ শোনা গেল। কেউ আসছে বোধহয়। স্রোত তড়িঘড়ি করে কাগজটা ভাজ করে পূর্বের জায়গায় রেখে দিল। রুমে ঢুকল অন্বয়৷ এক মুহূর্তের জন্য দুজনের চোখাচোখি হলো। অন্বয় ভ্রু কুঁচকে বলল,
-“আমার ফোন খুঁজতে এসে তুই কি পুরো রুম তল্লাশি শুরু করে দিয়েছিস?”
স্রোত ফোনের বক্স দেখিয়ে বলল,
-“এটা কী?”
অন্বয় দায়সারা ভাব নিয়ে বলল,
-“ এটা একটা ফোন। তোর কি জ্ঞানের এতোই অভাব যে একটা ফোনও চিনিস না?”
-“আপনি কি খোঁচা না মেরে কথা বলতে পারেন না? আপনার মতো এমন অসভ্য লোক আমি আর দুটো দেখিনি।”
অন্বয় ঠোঁট কামড়ে হাসলো। বলল সেভাবেই,
-“তোর ব্রেইন তো মারাত্মক! তোর সাথে কিছু না করার পরও বুঝে গেলি আমি অসভ্য!”
স্রোত শুধু অবাকের পর অবাক হচ্ছে। এ কোন অন্বয় ভাইকে দেখছে সে? ছোট হতে দেখে আসা গুরুগম্ভীর অন্বয় ভাইয়ের মুখে এসব কথা যেন মানাচ্ছে না। স্রোত কিছু বলল না। সে অন্বয়ের পাশ কেটে যেতে চাইলে অন্বয় তার হাত চেপে ধরে। বলে,
-“ ফোন পছন্দ হয়েছে?”
স্রোত দৃঢ় ভঙ্গিতে বলল,
-“ আপনি ভাবলেন কী করে আমি এই ফোন নেব?”
অন্বয়ের চোখমুখের পরিবর্তন হলো। চোয়াল শক্ত করে বলল,
-“কেন নিবি না?”
-“ আমি কারও দয়ার জিনিস নেই না। আপনি জুতা মেরে ভালোই গরু দান করতে পারেন।”
-“স্রোত!”
ধমকে উঠলো অন্বয়। স্রোতও কম নয়। সে ও দ্বিগুণ তেজ নিয়ে বলল,
-“ গলা নামিয়ে কথা বলুন, অন্বয় ভাই।আপনি গতো রাত থেকে আমার সাথে যা যা করেছেন এরপরও আমি আপনার কিনে দেওয়া ফোন নেব?”
-“ নিতে হবে না তোর। যা!”
অন্বয় স্রোতের হাত ছেড়ে দিল। স্রোতও দ্রুত নিচে চলে গেল। অন্বয় রাগে ফুঁসছে৷ সে রুম জুড়ে পায়চারি করে নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা চালাচ্ছে। সে তখন ইচ্ছে করেই নিজের ফোন রুমে রেখে গিয়েছিল যাতে করে স্রোতের ফোন আনার উছিলায় নতুন ফোন চোখ পড়ে। মেয়েটার মুখে তখন যে বিষণ্ণতা দেখেছিল, সেই বিষণ্নতা ভাব যেন দূর হয়ে যায়। কিন্তু তা হলো কোথায়?
__________________
দিন পেরিয়ে রাতের প্রহর চলছে। রাতের খাওয়াদাওয়া শেষে নিচে আড্ডায় মেতে আছে সবাই। অন্বয়ের সেসবে মন নেই। সে নিজের রুমের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে। তখনই রুমে প্রবেশ করে স্রোত। না তাকিয়েও অন্বয় স্রোতের উপস্থিতি বুঝতে পারলো। অন্বয় রুমে ঢুকতেই ভ্রু কুঁচকালো। স্রোত বালিশ, কম্বল নিয়ে চলে যাচ্ছে। অন্বয় তড়িঘড়ি করে ডাকলো,
-“ স্রোত!”
-“বলুন।”
-“ কোথায় যাচ্ছিস?”
-“গেস্ট রুমে।”
-“ কেন?”
-“এই রুমে থাকার কোনো অধিকার আমার নেই।”
-“ তুই কোথাও যাবি না। এখানেই থাকবি।”
-“কেন? গতকাল তো আপনি নিজে আমায় এই রুম থেকে বের করে দিচ্ছিলেন। তাহলে আজ কেন থাকতে বলছেন?”
-“আমি যখন বলেছি তখন তুই এখানেই থাকবি।”
-“ আমি আপনার কথা শুনতে বাধ্য নই। আমার আর কিছু থাক বা না থাক অন্তত আত্মসম্মান আছে। গতরাতে বাড়িভর্তি মেহমান ছিল তাই জোর করে এই রুমে থেকেছিলাম। কারণ, বিয়ের প্রথম রাতেই বর-বউয়ের আলাদা থাকাটা কেউ ভালো দৃষ্টিতে দেখবে না। কিন্তু আজ তো আর বাড়িতে কোনো অতিথি নেই। ফুফা, ফুফুকে আমি কিছু একটা বলে ম্যানেজ করে নিব।”
-“ তোকে আমি অন্য রুমে যেতে না করছি কিন্তু!”
-“ আমি যাবো। দেখি, আপনি কী করতে পারেন!”
এই বলে স্রোত ফের পা বাড়াবে, ওমনি অন্বয় এসে ওকে পাঁজা কোলে তুলে নেয়। স্রোত ছটফট করতে থাকে কোল থেকে নামানোর জন্য কিন্তু অন্বয়ের শক্তির সাথে পেরে উঠে না। অন্বয় অটল ভঙ্গিতে হেঁটে এসে স্রোতকে ছুঁড়ে মারে বিছানায়। ফলে, স্রোতের হাত থেকে বালিশ, কম্বল ছিটকে পড়ে যায়। স্রোতের উপর আধশোয়া হয়ে অন্বয় অত্যন্ত ধীর স্বরে বলল,
-“ সোজা আঙুলে ঘি না উঠলে আঙুল বাঁকাতে হয়।”
বলেই বিছানা হতে উঠে যায় অন্বয়। সোফার দিকে যেতে যেতে বলে,
-“ আজ অন্তত সোফায় ঘুমোনোর জন্য ড্রামা শুরু করিস না। রোজ রোজ তোকে কোলে করে বিছানায় নিয়ে যেতে আমার মোটেও ভালো লাগবে না।”
স্রোত দুচোখে বহ্নিশিখা জ্বলছে। সে গরম চোখে তাকিয়ে থাকে অন্বয়ের দিকে। স্রোতের চাহনি দেখে অন্বয় বাঁকা হাসে৷ তা দেখে স্রোতের রাগ যেন আরও দ্বিগুন বাড়লো। সে দাঁত কটমট করে বলল,
-“ আপনার সমস্যা কী? আপনি কি আমায় খেলার পুতুল পেয়েছেন যে যেভাবে নাচাবেন সেভাবেই নাচবো? এই মন চাইলো ঘর থেকে বের করে দিবেন তো এই ঘর থেকে বের হতে দিবেন না। কেন করছেন এমন?”
-“যে মেয়ে নিজের অধিকার আদায় করতে পারে না, তার মুখে এমন বড়ো বড়ো কথা মানায় না।”
-“ অধিকার? আপনি কোন অধিকারের কথা বলছেন?”
অন্বয় এবার কোনো কথা বলে না। এদিকে, স্রোত বারবার জিজ্ঞেস করেই যাচ্ছে। অন্বয় সোফায় বালিশ রেখে বলল,
-“ বেশি বকবক না করে ঘুমা।”
স্রোত বুঝলো, অন্বয় ভাই তার প্রশ্নের জবাব দিবে না। এমনকি এই রুম হতেও যেতে দিবে না। সে এই লোকটাকে বুঝতে পারে না কখনোই। এই লোকের মনে কখন কী চলে তা স্বয়ং আল্লাহ মাবুদই ভালো জানেন।
___________________
পাখির কিচিরমিচির শব্দে স্রোতের ঘুম ভাঙে৷ গতকালের মতো আজও ঘুম থেকে উঠে অন্বয়ের দেখা পেল না সে। সে উঠে ফ্রেশ হয়ে নিচে আসে। নিচে আসতেই কলিংবেল বেজে উঠে। স্রোতের ফুফু রান্নাঘরে ছিলেন তাই স্রোতই গেল দরজা খুলতে। দরজা খুলতেই সে বিস্মিত হয়ে যায়। কারণ, তার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে অর্ক। হাতে ফুলের তুড়া। স্রোতকে দেখেই অর্ক হেসে বলে,
-“ সারপ্রাইইইজ!”
স্রোত সেই বিস্ময়ভাব নিয়েই বলল,
-“ অর্ক, তুই!”
-“ হুম। কেমন লাগলো সারপ্রাইজ? বিয়েতে আসতে পারিনি তো কী হয়েছে! দেখ, ডিরেক্ট তোর শ্বশুরবাড়ি চলে এলাম।”
পিছন হতে ফারজানা বেগম জিজ্ঞেস করলেন,
-“ স্রোত, কে এসেছে?”
-“ ফুফু, অর্ক এসেছে। আমার ছোটবেলার বন্ধু।”
অর্ককে তিনি চেনেন। স্রোতের বাসার পাশাপাশি অর্কদের বাসা হওয়ায় তাদের সাথে মোটামুটি পরিচয় আছে। তিনি এসে হাসিমুখ করে বললেন,
-“ আরে, অর্ক বাবা! কেমন আছো? কতোদিন পর দেখলাম তোমায়! বাইরে দাঁড়িয়ে আছো কেন? ভিতরে আসো।”
অর্ক ফারজানা বেগমকে সালাম দিয়ে, কথা বলে ভিতরে প্রবেশ করে। ফারজানা বেগম বাড়ির সার্ভেন্ট রহিমার সাথে টেবিলে নাস্তা সাজাচ্ছেন। অর্ক সোফায় বসে স্রোতের সাথে টুকটাক গল্প করছে। হঠাৎ কোত্থেকে হাওয়ার মতো উদয় হলো অন্বয়। একদম স্রোতের গা ঘেঁষে বসে অর্কের দিকে ঠাণ্ডা চোখে চেয়ে বলল,
-“ হাউ আর ইউ, মিস্টার অর্ক?”
স্রোত অন্বয়ের দিকে চেয়ে ভয়ে ভয়ে ঢোক গিলল। অন্বয় ভাই এখন কোনো ঝামেলা না করলেই হয়!
চলবে…….

