Home "ধারাবাহিক গল্প "হৃদয় জানে মনের কথা হৃদয় জানে মনের কথা পর্ব-০৪

হৃদয় জানে মনের কথা পর্ব-০৪

0
659

#হৃদয়_জানে_মনের_কথা
#পর্ব_৪
#লেখনীতে_মারিয়া_আক্তার_মাতিন

অন্বয়ের তীক্ষ্ণ চাহনী ও ঠাণ্ডা প্রশ্নে অর্ক খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে গেলেও মুখে হাসি বজায় রাখলো।

-“আলহামদুলিল্লাহ! আপনি কেমন আছেন?”

-“ ভালো।”

সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল অন্বয়। তার দৃষ্টি বারবার অর্কের হাতে থাকা ফুলের তোড়ার দিকে যাচ্ছে। বিষয়টা খেয়াল করলো স্রোত। সে মনে মনে দোয়া করছে যেন কোনো ঝামেলা না হয়। অর্ক ফুলের তোড়া স্রোতের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
-“এটা তোর জন্য স্রোত। বিয়ের শুভেচ্ছা উপহার বলতে পারিস।”

স্রোত ফুলের তোড়াটা নিতে যাবে তার আগেই অন্বয় হাত বাড়িয়ে নিয়ে নেয়। অর্কের দিকে চেয়ে বলে,
-“থ্যাংক ইউ!”

অর্কের হাসিটা মলিন হয়ে গেল। সে কিছুটা অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে বলল,
-“আমি এটা স্রোতকে দিতে চেয়েছিলাম।”

-“ স্রোত আমার স্ত্রী। ওকে দেওয়া মানে আমাকেই দেওয়া।”

কথাটা এমন স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল যে অর্ক আর কিছু বলার সুযোগ পেল না। তবে, স্রোতের বুকের ভিতরটা ধক করে উঠে। অনুভূতির দোলাচলে হৃদয় কেঁপে উঠে। ফারজানা বেগম এসে হাসিমুখ করে বললেন,
-“এসো সবাই। নাস্তা করবে।”

সবাই টেবিলে বসল। অর্ক আর স্রোত ছোটবেলার নানা গল্প করছে৷ কোনদিন স্কুল পালিয়ে ফুচকা খেতে যাওয়া, কোনদিন বৃষ্টিতে ভেজা। সব শুনে ফারজানা বেগমও হাসছেন। কেবল অন্বয়ের মুখটাই গম্ভীর। হঠাৎ অর্ক বলে উঠে,
-“ মনে আছে স্রোত? ক্লাস নাইনে থাকতে একবার সাইকেল থেকে পড়ে গিয়ে তুই হাঁটুতে অনেক ব্যাথা পেয়েছিলি? পরে সেই সাইকেল আমি চালিয়ে তোকে বাসায় দিয়ে এসেছিলাম। তুই সেদিন সাইকেলেও ঠিকমতো বসতে পারছিলি না। বারবার আমার উপর পড়ে যাচ্ছিলি।”

স্রোত হেসে বলল,
-“ আর বলিস না। সেদিন আম্মু আমাকে অনেক বকেছিল যে কেন সাইকেল চালাতে গেলাম।”

দুজন একসাথে হেসে উঠল। অন্বয় বেশ শব্দ করেই চামচটা টেবিলে রাখলো। টুন শব্দ হতেই সবাই তার দিকে তাকায়। অন্বয় নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,
-“ সরি! হাত ফসকে গেছে।”

কিন্তু তার দৃষ্টি দেখে মোটেও মনে হয়নি যে চামচটা হাত ফসকে গেছে। কাজটা যে সে ইচ্ছে করেই করেছে তা খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারলো স্রোত। সবার খাওয়া প্রায় শেষের দিকে। স্রোত তার ফুফুকে জিজ্ঞেস করে,
-“ ফুফা কোথায়? ফুফাকে তো দেখছি না!”

ফারজানা বেগম হতাশ ভঙ্গিতে শ্বাস ছেড়ে বললেন,
-“কী আর বলব! তোর ফুফা আজ ভোরে ব্যবসার কাজের জন্য সিলেট গিয়েছে। এক সপ্তাহ পর নাকি আসবে। অন্বয়টাও হয়েছে তোর ফুফার মতো। তাদের কাজের কোনো শেষ নেই।”

হঠাৎ অর্ক বলে উঠে,
-“ কী রে স্রোত, মানলাম তুই তোর ফুফাতো ভাইকে বিয়ে করেছিস! কিন্তু এখন তো সে তোর স্বামী। তাহলে এখনও তুই ফুফু, ফুফা বলে ডাকিস উনাদের? উনারা এখন তোর শ্বশুর, শাশুড়ি। বাবা-মা বলে ডাকবি। নাকি এখনও মানিয়ে নিতে পারছিস না?”

কথাটাতে একটা সূক্ষ্ম খোঁচা ছিল যা আর কেউ বুঝতে না পারলেও অন্বয় ঠিকই বুঝতে পেরেছে। সে গম্ভীর কণ্ঠে জবাব দিল,
-“সেটা নিয়ে আপনার ভাবতে হবে না। আমার বউয়ের যখন ইচ্ছে হবে, তখনই সে বাবা-মা বলে ডাকবে।”

ফারজানা বেগমও বললেন,
-“ হ্যাঁ, ঠিক বলেছিস। তাছাড়া স্রোতের ছোট থেকে আমাদের ফুফু, ফুফা ডেকে অভ্যাস। ডাক পরিবর্তন করতে একটু তো সময় লাগবেই।”

অর্কের মুখটা ছোট হয়ে গেল। সে আর কিছু বলল না। নাস্তা শেষে অর্ক স্রোতের দিকে চেয়ে বলল,
-“ স্রোত একটু এদিকে আসবি। তোর সাথে কথা ছিল।”

অন্বয় ফট করে বলল,
-“ কী কথা?”

-“ ব্যক্তিগত।”

রাগে অন্বয়ের চোখমুখ ফুঁসে উঠল। বলল,
-“আমার বউয়ের সাথে কারো এমন কোনো ব্যক্তিগত কথা থাকতে পারে না যা আমি জানতে পারব না।”

অর্কের চোখমুখ এবার বেশ গম্ভীর ঠেকলো। বারবার অন্বয়ের করা ‘আমার বউ’ সম্বোধনটা তার একটুও পছন্দ হচ্ছে না। সে বলল,
-“ আপনি একটু বেশিই করছেন না? সবকিছুরই একটা সীমা আছে। আমি স্রোতের ছোটবেলার বন্ধু।”

অন্বয় দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
-“ আর আমি ওর স্বামী।”

পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে দেখে স্রোত তড়িঘড়ি করে বলল,
-“ আপনারা কী শুরু করেছেন বলুন তো? এই অর্ক, তোর যা বলার এখানেই বল।”

অর্ক কিছুক্ষণ চুপ থেকে নিজের ব্যাগ থেকে ছোট একটি বাক্স বের করল।

-“ এটা তোর জন্য এনেছিলাম।”

-“ কী এটা?”

স্রোত বাক্সটা নিয়ে খুলতেই ভিতরে দেখতে পেল একটা ডায়েরি ও কলম।

-“ তুই তো গল্প লিখতে ভালোবাসতি। তাই ভাবলাম বিয়ের জন্য এটাই হবে তোর জন্য বেস্ট উপহার।”

স্রোতের চোখ চিকচিক করে উঠলো। সে মিষ্টি হেসে বলল,
-“ধন্যবাদ, অর্ক!”

-“ ধন্যবাদ দিতে হবে না। তোর মুখের হাসিটাই যথেষ্ট।”

কথাটা শুনে অন্বয়ের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। এর মাঝেই অন্বয়ের ফোনে কল আসে। ফোনের নাম্বারের দিকে চেয়ে অন্বয়ের চোখেমুখের পরিবর্তন ঘটে। সে দ্রুত ফোন রিসিভ করে। ওপাশ হতে কিছু বলতেই অন্বয় উত্তেজিত হয়ে বলল,
-“ কী বলছিস তুই? আমি এখনই আসছি।”

ফারজানা বেগম তখন রান্নাঘর হতে আসছিলেন। ছেলের শেষোক্ত কথা শুনে জিজ্ঞেস করলেন,
-“ কোথায় যাচ্ছিস তুই?”

অন্বয় কয়েক সেকেণ্ড চুপ থেকে বলল,
-“ অফিসে সমস্যা হয়েছে৷ আমাকে এখনই যেতে হবে।”

তারপর স্রোতের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। একই সময়ে স্রোতও অন্বয়ের দিকে তাকালো। অন্বয়ের দৃষ্টি দেখে মনে হলো স্রোতকে সে কিছু বলতে চায় কিন্তু বলতে পারছে না। তার ব্যাকুল দৃষ্টি দেখে স্রোতের কেমন বুক কেঁপে উঠে। অন্বয় কিছু না বলে বেরিয়ে গেল।

স্রোতের কেন যেন মনে হচ্ছে, সমস্যাটা অফিসের না, অন্যকিছু। কিন্তু সেই অন্যকিছুটা আসলে কী? উনার সেই চাহনী, মুখের ভাবভঙ্গি দেখে স্রোত স্পষ্ট বুঝতে পারছে বড় ধরণের কিছু একটা হয়েছে যা অন্বয় লুকোতে চাচ্ছে।

ড্রয়িংরুমে তখন স্রোত আর অর্ক। অর্ক স্রোতের সামনে হাত নাড়িয়ে বলল,
-“ কোথায় হারিয়ে গেলি?”

স্রোত নিজেকে স্বাভাবিক করে বলল,
-“ আরে, কোথাও না।”

-“ তুই মিথ্যে বলছিস। তোকে আমি ছোটবেলা থেকে চিনি। তুই যখন কোনোকিছু নিয়ে ভাবিস, তখন এমন শূন্যে তাকিয়ে থাকিস।”

কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর অর্ক জিজ্ঞেস করলো,
-“ তুই খুশি?”

স্রোত ভ্রু কুঁচকে বলল,
-“ মানে?”

-“ এই বিয়েতে?”

স্রোত সাথে সাথে কোনো উত্তর দিতে পারলো না। তার নীরবতাই যেন বুঝিয়ে দিল সব। অর্ক গভীর নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল,
-“ আমি জানতাম।”

-“ কী জানতি?”

-“ তুই নিজের ইচ্ছায় এই বিয়ে করিসনি।”

স্রোত এবার চোখ তুলে তাকালো। বলল কেমন করে,
-“ তুই সবকিছু জানিস না, অর্ক। তাই না জেনে মন্তব্য করিস না।”

-“ তাহলে তুই-ই বল, তুই এই বিয়েতে খুশি? তুই কি এখন খুব সুখে আছিস? তোর কি মনে হয় না, অন্য একজনের কাছে বিয়ে হলে তুই আরও সুখী হতি?”

স্রোত চুপ করে রইলো। অন্বয় ভাইকে সে ঠিক বুঝতে পারে না। লোকটাকে সে ভয় পায়, মাঝে মাঝে রাগ হয়, অভিমান হয়। আবার, লোকটার কিছু কর্মকাণ্ড তার মনে অদ্ভুত অনুভূতির জন্ম দেয়। নিজের মনের এই জটিল অবস্থার ব্যাখা সে নিজেই জানে না। তবে, স্বামী-স্ত্রীর ভিতরকার টানাপোড়েনের কথা সে অবশ্যই কাউকে বলবে না, বুঝতেও দিবে না। সে বলল,
-“ অর্ক, তুই কি এই মানুষগুলোকে দেখে বুঝতে পারছিস না, আমি হ্যাপি কি না? দেখলিই তো, আমার স্বামী আমাকে নিয়ে কতোটা পজেসিভ। এমন একজনকে নিজের স্বামী হিসেবে পেয়ে আমি ধন্য। আর অবশ্যই আমি খুব সুখী এই পরিবারে।”

অর্ক কাতর চোখে তাকালো। সময় নিয়ে বলল,
-“ বেশ, শুনে খুব খুশি হলাম৷ কিন্তু একটা কথা। কোনোদিন যদি তোর কারো প্রয়োজন হয়, আমাকে একটা ফোন দিবি। আমি সবসময় তোর পাশে আছি।”

তারপর, স্রোত ও তার ফুফুর থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেল। সারা দিন পেরিয়ে রাত হলো। অন্বয়ের কোনো খোঁজখবর নেই। ফারজানা বেগম কতবার কল দিলেন, কলও রিসিভ করছে না। শেষে স্রোতকে এসে অস্থির কণ্ঠে বললেন,
-“ স্রোত, তুই একবার কল করে দেখ না। যদি তোর কল রিসিভ করে।”

স্রোত পড়লো মহাবিপাকে। তার তো ফোনই নেই। অন্বয় ভাই তো ফোনের বারোটা বাজিয়েছে। এখন কী করবে সে? হঠাৎ মনে পড়লো, অন্বয় ভাই তাকে গতকাল নতুন একটা ফোন কিনে দিয়েছে। কিন্তু সে পণ করেছিল এই ফোন সে ব্যবহার করবে না। এখন তো ব্যবহার না করেও উপায় নেই। বাধ্য হয়েই সে ফোন হাতে নিল। খেয়াল করলো, ফোনের পাশে নতুন সিম রাখা। স্রোতের বুঝতে অসুবিধা হলো না এটা অন্বয় ভাইয়েরই কাজ। আগের সিমে অর্কের নাম্বার আছে তাই নতুন সিম এনে রেখেছে। সে ফোনে সিম সেট করে ফুফুর থেকে অর্কের নাম্বার নিয়ে কল করে। কিন্তু ফলাফল শূন্য। কল রিসিভ হয়নি। তারও খুব টেনশন হচ্ছে। অন্বয় ভাই ঠিক কোথায় গেলেন? উনার ফিরতে কেন এতো দেরি হচ্ছে?

রাত তখন সাড়ে দশটা। বাড়ির সামনে গাড়ি আসার শব্দে স্রোত দৌড়ে বারান্দায় গেল। গাড়ি গেট পেরিয়ে বাড়ির আঙিনায় ঢুকেছে। গাড়ি থেকে নামলো অন্বয়। কিন্তু অন্বয়কে দেখে অবাক হয়ে গেল স্রোত। তার শার্টের হাতা ছিঁড়ে গেছে, কপালের একপাশ কেটে গেছে যেখান থেকে রক্ত চুইয়ে পড়ছে। শার্টের বিভিন্ন জায়গায় রক্তের ছোপ ছোপ দাগ। এ কি! অন্বয় ভাইয়ের এমন অবস্থা হলো কীভাবে?

চলবে…..