#তুমি_বৃষ্টি_হয়ে_নামলে
#পর্বঃ৩
#লেখনীতে_তানিয়া
“আমাকে ভেতর বাহির থেকে শেষ করে দেওয়ার জন্যই তোমার এতো অভিনয়? তুমি প্রচণ্ড জেদী, একরোখা এবং আত্নকেন্দ্রীক মেয়ে এইটা আমি জানি। যা মুখ দিয়ে বের করো সেটাই করে দেখাও। সেটাই তোমার চাই। তুমি কি তোমার জেদের চাওয়াতে আমাকেও নিলামে তুলেছো তুরফা? আমাকে যে ভালোবাসার দাবি করো সেটা নিজের জেদের জন্য। বন্ধুদের কাছে বাজি ধরেছো আমাকে নিয়ে। তাই তোমার এতো নাটক”।
সম্পর্কের একটা বছর পর নিয়াজ প্রচন্ড রাগে, দুঃখে, ক্ষোভ আর হতাশার আহাজারি নিয়ে তুরফাকে কথাগুলো বললো নিয়াজ। প্রচন্ড মানসিক ভাবে ভেঙে পড়া একজন মানুষ হিসেবে তাকে মনে হচ্ছে এখন। যদিও নিয়াজ ভীষণ শক্ত মনের আর সাহসী মানুষ। এতো সহজে কোনো অস্থিরতা তাকে কাবু করে না। ইন্টার্নশীপ শেষের দিকে । ক্যারিয়ার নিয়ে অনেক ধরনের চিন্তা ভাবনা তার। এরই মধ্য তুরফার বিষয়টা তাকে অনেক ভাবাচ্ছে। সম্পর্কের একটা বছর পর গিয়ে মনে হচ্ছে তুরফার সাথে সম্পর্কে আসাটা তার জন্য ভুল সিদ্ধান্ত ছিলো। যতটা যত্ন নিয়ে সে তুরফাকে ভালোবাসে তুরফার মধ্য সেটা অনেক কম। তুরফার চোখেমুখে বিরক্তির ছায়া। কফির কাপটা মুখ থেকে নামিয়ে রেখে বললো,
” তুমি কি আমাকে এসব বলার জন্য এখানে ডেকেছো? তুমি জানো না সামনে থার্ড প্রফ ফাইনাল। এখন পড়াশোনা নিয়ে কি পরিমাণ ব্যস্ততা। অযথা সময় নষ্ট করার জন্য তোমার এই সময়টাই মনে হলো”?
নিয়াজের চোখে মুখ যেনো আরও বিষাদে ভরে গেলো। সে প্রশ্নের উত্তরে প্রশ্ন করলো,
“মানুষ কি দিন রাত ২৪ ঘন্টা বইয়ে মুখ গুঁজে থাকে তুরফা? তোমার প্রফ ফাইনালের এখনো দুই মাস বাকি। তুমি এখন আমাকে পরীক্ষার ব্যস্ততা দেখাচ্ছো? ভুলে যেওনা এই পরীক্ষাগুলো আমারও পার করতে হয়েছে। আমি জানি মানুষ কখন পড়ে”।
তুরফা যেনো আরও বেশি বিরক্ত হলো। তার এসব ভালো লাগছে না। সে ভেবেছিলো প্রেম ভালোবাসা এসব জীবনের একটা ফ্যান্টাসি। একটা আ্যাডভেনচার। একটা ভাব দেখানো কাজ। যাতে নিজেকে অন্যদের সামনে আরও বেশি শো অফ করা যায়। সে নিয়াজকে যতটা সহজভাবে হেলা ফেলা করে নিতে চেয়েছিলো ততটাও সহজভাবে সব মেনে নেওয়ার পাত্র নিয়াজ নয়। তুরফার জেদ নিয়াজকে আরও বেশি কঠিন করে ফেলেছে। এই এক বছরে প্রেমের শুরুর দিনগুলো বেশ ভালোই যাচ্ছিলো তাদের। কথা বলা, ঘুরতে যাওয়া সিনেমা দেখা সবই হচ্ছিলো। নিয়াজের ব্যস্ততা বেড়ে যাওয়ার পরেও সে যথাসাধ্য চেষ্টা করে তুরফাকে সময় দেওয়ার। অন্যদিকে তুরফা এই বিষয় নিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে থাকে। আগের মতো কথা বলে না, দেখা করতে চায় না। কিছু বললেই এই পড়া সেই পড়া। আজকে পরীক্ষা কালকে ভাইবা হাবিজাবি কত কিছু। নিয়াজও এসব মেনে নিয়েছিলো সরল মনে। ডাক্তারি পড়াশোনা মানেই অনেক ব্যস্ততার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। কিন্তু না নিয়াজের ভুল ভেঙে যায় একসময়। দিনের পর দিন তুরফা যখন অবহেলা আর এড়িয়ে যাওয়ার মাত্রা বাড়িয়ে দিলো তখন থেকেই নিয়াজের আর কিছু ভালো লাগে না। নিজের চোখের সামনে তুরফাকে যেদিন সে মিথ্যা কথা বলতে দেখেছে সেদিন থেকে এই সম্পর্ক থেকে সে বেড়িয়ে আসতে চেয়েছে। তুরফা বললো,
” সবাই কখন পড়ে আমি জানিনা কিন্তু আমি পড়ি। আমার পড়তে হবে। আমি কখন কিভাবে পড়বো সেই জবাবদিহিও এখন তোমাকে করতে হবে?
নিয়াজ হতবাক হয়ে গেলো তুরফার কথা শুনে। এই সেই তুরফা যে নিজে থেকে বলেছিলো সে নিয়াজকে ভালোবাসে। ওকে ছাড়া বাঁচবেনা। সেদিনের প্রেম নিবেদন করা মেয়েটা আর আজকের তুরফার মধ্য সে অনেক তফাত দেখতে পাচ্ছে। নিয়াজ সংযত স্বরে বললো,
” সাধারণ প্রশ্নকে জবাবদিহি বলছো কেনো? যদি আসলেই জবাব চাই তাহলেতো আমি অন্য কিছু নিয়ে তোমার কাছে জবাব চাইতে পারি”।
_ কি নিয়ে জবাব চাইতে পারো? কি জবাব চাও তুমি আমার কাছ থেকে?
_তুমি যে তোমার বন্ধুদের সাথে রিসোর্টে লেট নাইট পার্টি করতে গিয়েছিলে সেটা বলার প্রয়োজন মনে করোনি কেনো? সেদিন যখন আমি দেখা করতে বলেছিলাম মিথ্যা বলেছিলে কেনো? তুমি অসুস্থ বের হতে পারবে না।
_ তুমি বললেই দেখা করতে হবে? আমার কি ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নাই? কোথায় যাবো কি করবো সব তোমাকে বলে যেতে হবে?
নিয়াজ এর মাথা কাজ করছে না। তার আর কিছু বলার রুচি হচ্ছে না। তবুও বললো,
_ ব্যক্তিগত স্বাধীনতা থাকবে না কেনো? অবশ্যই থাকবে। এর জন্য নিজের বয়ফ্রেন্ডকে মিথ্যা বলে অজুহাত দেখিয়ে লেইট নাইট পার্টি করার দরকার ছিলো না। সত্য বললেও আমি তোমাকে আটকাতাম না নিশ্চয়ই?
তুরফার আর কিছু বলতে ভালো লাগছে না। নিয়াজের সাথে বকবক করতে ইচ্ছে করছে না। তুরফার এমন বিরক্তি দেখে নিয়াজ কঠিন কিছু বলার সিদ্ধান্ত নিলো। চোখ মুখ শক্ত করে সে বললো,
” আমার মনে হয় আমাদের এই সম্পর্কে জোরালো কোনো অনুভূতি নেই যেটা সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। তাই আমাদের এখানেই থামা প্রয়োজন। Let’s breakup and end this matter here”.
এইটা বলেই দ্রুত উঠে রেষ্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে গেলো সে। তুরফাকে কিছু বলার সুযোগও দেয়নি সে। তুরফা প্রথমে বুঝতে পারেনি কি হলো। যখন বুঝলো হতভম্ব হয়ে গেলো। নিয়াজ যে সত্যিই এতোটা সিরিয়াস হয়ে গিয়ে এভাবে ব্রেক আপ করে ফেলবে এটা আশা করেনি সে। সে ভেবেছিলো নিয়াজ তাকে প্রচন্ড ভালোবাসে। কোনো কিছুর বিনিময়ে হলেও তাকে ছেড়ে যাবে না। এখন তুরফা যত যাই করুক না কেনো। যত ভাবেই এড়িয়ে যাক না কেনো নিয়াজ তার সাথে ব্রেক আপ এর চিন্তা করবে না। তুরফার সেই ভাবনাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিয়াজ চলে গেলো। তুরফা তবুও দমে গেলো না। বিড়বিড় করে আওড়ালো,
_ কতক্ষন আর রাগ করে থাকবে? এক দিন, দু দিন বা খুব বেশি হলে সাতদিন। তারপর ঠিকই লেজ নাড়াতে নাড়াতে এই তুরফার কাছেই আসতে হবে। ওসব ভেলকিবাজি দেখা আছে অনেক।
রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে নিয়াজের প্রচণ্ড খারাও লাগতে শুরু করলো। মন মেজাজ খারাপ হয়ে আছে। যে ছেলেটা জীবনে প্রেম কি জিনিস বুঝতে চায়নি, প্রেমে পড়তে চায়নি সেই ছেলে হঠাৎ করে প্রেমে পড়লো। ভালোবাসলো। তাও একজন ভুল মানুষকে। যে কিনা কখনো তাকে ভালোবাসার চেষ্টাই করেনি। নিছক ছেলেখেলা করে এসেছে এতোদিন অথচ কত শত প্রেমের প্রস্তাবের ভীড়ে সে শুধু চেয়েছিলো এমন একজন মানুষ যে শুধু তাকে ভালোবেসে ভালোবাসা দিয়ে যত্নে রাখবে। তুরফার মিথ্যা কথা, বাহানা আর অবহেলা যখন কষ্ট দিচ্ছিলো নিয়াজকে তখন আরও এক সত্যি তার সামনে আসলো। তুরফাকে খুঁজতে নিয়াজ একদিন তার ক্লাসের সামনে যায় কিন্তু না পেয়ে এদিক ওদিক খুঁজতে থাকে। ঠিক তখনই তুরফার বন্ধু বান্ধবদের কথা শুনতে পায় সে। তাদের একজন বলছিলো,
_ তুরফা আজকাল নিয়াজ ভাইয়াকে একদম সময় দেয় না। কেমন অবহেলা করে। আবার মিথ্যা কথা বলে এড়িয়েও চলে। সেদিন রিসোর্টে যাওয়ার বিষয়টা নিয়াজ ভাইয়ার কাছ থেকে পুরো লুকিয়ে গেছে। শুধু কি তাই ও যে ওখানে গিয়ে ড্রিংকস করেছে তারপর ভাইয়াকে নিয়ে কত কি বললো আমাদের সামনে।
রিমি বললো,
_ “তুরফার এইটা জেদ ছিলো নিয়াজ ভাইয়াকে ওর পেছনে ঘুরানোর জন্য। কারন নিয়াজ ভাইয়া শুরুতে ওকে পাত্তা দিতো না ইভেন কোনো মেয়েকেই প্রেমের জন্য পছন্দ করেনি এইটাই ওর ইগোতে লেগেছিলো। এজন্যই সে ভাইয়াকে শুধু ভালোবাসার নামে নিজের পেছনে ঘুরিয়েছে। এখন আর কোনো আগ্রহ কাজ করছে না তাই ভাইয়াকে আর পাত্তা দিচ্ছে না। এদিকে নিয়াজ ভাইয়া সত্যিই তুরফাকে অনেক ভালোবাসে। খুব কেয়ার করে। ভাইয়া ভীষণ ভালো মানুষ। এইটা আসলেই ভালো হচ্ছে না”।
ওদের মধ্য সুমন নামের ছেলেটা বলে উঠলো,
_ তোর মনে নেই তুরফা আমাদের সাথে ডেয়ার নিয়ে বাজি ধরেছিলো যে সে দেখিয়েই ছাড়বে ভাইয়া ওকে নিজে থেকে ভালোবাসবে। ও এই বাজিতে জিতবেই। ও হার মানবে না। হলোও তাই। আসলে তুরফা নিজের ইগো স্যাটিসফাই করার জন্যই এসব করেছে। ও ভাইয়াকে ভালো টালো কিছুই বাসে না।
বন্ধুরা আরও কিছু বলছিলো। যা শুনলো সেটার পর আর কিছু শুনতে ইচ্ছে করছে না। নিজেকে অনেক বড় বোকা মনে হলো নিয়াজের। জীবনের এতোগুলো দিন এতো সুন্দর মুহুর্তগুলো ভুল মানুষের পেছনে ব্যয় করেছে সে। সেই দিন থেকে তুরফার উপর তার মন বিষাদে তিতা হয়ে গেছে। সে শুধু আজকে দেখা করতে চাইছিলো এই ব্রেক আপ করবে বলে। সে আর এই মানসিক অশান্তি নিতে পারছে না। সামনে তার বিসিএস পরীক্ষা। অনেক পড়াশোনা আছে। ভালো ডাক্তার হতে হবে। প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। মানুষের সেবা করার যে ইচ্ছা সেটা পূরন করতে হবে। অনেক কিছু করার আছে তার। এসব ভাবলে আর চলবে না। যা গেছে সেদিকে আর ফিরে তাকাতে গেলে শুধু কষ্টই পেতে হবে। ভুল ছিলো সেসব সব ভুল।
_________________________
ছয় মাস পরে…..
“কিরে দোস্ত আজকালতো তোর খবরই পাওয়া যায় না। এতো ব্যস্ত থাকিস। বিসিএস ক্যাডার হয়ে আমাদের ভুলেই গেছিস ব্যাটা। কোনো খোঁজখবর নেই। ফোন কল নেই। একদম চুপ হয়ে গেছিস। বৈরাগী হয়ে গেলি নাকি নতুন চাকরি পেয়ে”?
অনেকদিন পর নিজের অনেক কাছের বন্ধুর এমন অভিযোগ শুনে নিয়াজ হেসে ফেলে। আসলেই সে আর আগের মতো নেই। হঠাৎ করে জীবনের সব কিছু কেমন চেইঞ্জ হয়ে গেলো। তুরফার সাথে ব্রেক আপের পর কয়েকটা দিন সে খুব বেশি মনম/রা হয়ে থাকতো। বার বার তুরফার কথা মনে পড়তো। পড়াশোনা বা কাজ কোনো কিছুতেই মন বসতো না। খাওয়া দাওয়ার ঠিক ছিলো না। কেমন ঝিম মেরে থাকতো। এভাবে কয়েকদিন চলে যাওয়ার পর সে নিজেকে গুছিয়ে নিতে পেরেছিলো। তারপর বিসিএস পরীক্ষা ডাক্তারদের জন্য বিশেষ যে সার্কুলার সেটা হয়ে গেলো। এই সুযোগ হাত ছাড়া করতে চাইলো না নিয়াজ। নিজের সব খারাপ লাগা এক পাশে রেখে পড়াশোনা শুরু করলো। দিন রাত এক করে পড়তে লাগলো। উদ্দেশ্য একটাই পরীক্ষায় পাশ করা। পরীক্ষা নিয়ে এতো বেশি ডুবে গিয়েছিলো যে দিন দুনিয়ার খেয়াল ছিলো না তার। পরিশ্রমের বিনিময়ে ফল সে পেয়েছে। বিসিএস পরীক্ষায় পাশ করেছে সে। এখন সে একজন বিসিএস ক্যাডার। আর কিছু তাকে মন খারাপ করতে পারে না। তবুও থেকে থেকে তুরফার কথা তার ভীষণ মনে পড়ে। মেয়েটাকে দেখতে ইচ্ছে করে। নিয়াজ তাকে সব জায়গা থেকে ব্লক করে রেখেছে যাতে কোনো সুযোগ আর পিছুটান থাকে৷ তবুও মনে পড়ে। এই অনুভূতির প্রতি সে খুব বিরক্ত। আজকে বন্ধুদের আড্ডায় অনেক দিন পর এসেছে সে। গেজেট পাশ হয়ে গেছে। নতুন কর্মস্থলে যেতে হবে আর কিছুদিন পরেই। তাই সবার সাথে দেখা করতে আসা। আড্ডার আসরের হৈ চৈ এর মধ্য রিমন নিয়াজের হাতে তার বিয়ের কার্ড ধরিয়ে দিয়ে বললো,
_” সামনের সপ্তাহে আমার বিয়ে। পারিবারিক ভাবেই হঠাৎ করে বিয়ে ঠিক হয়েছে। আমি চাই তুই আসবি। অনেকতো ছুটলি এতোদিন। এখন একটু আনন্দ কর আমাদের সাথে। কোনো না শুনবো না। আবার কবে এভাবে একসাথে মিলে কোনো অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া হবে কে জানে “?
নিয়াজ রিমনের দিকে চাইলো। ছেলেটা অনেক আশা করেই বিয়েতে যাবার জন্য বলেছে। বাকি বন্ধুদের মুখের দিকে চাইলো। তাদেরও চোখের চাহনি একই কথাই বলছে। নিয়াজও মনে মনে ভাবলো ঠিকইতো অনেকতো লুকোচুরি হলো। এবার একটু মনটাকে বিশ্রাম দেওয়া যাক। নিয়াজ ঠোঁট প্রসারিত করে হাসলো রিমনের কাধঁ চাপড়ে বললো,
” কিরে তাহলে তুই জীবিত থেকে বিবাহিত হওয়ার জন্য রেডি হচ্ছিস? ব্যাচের প্রথম বন্ধুর বিয়ে বলে কথা। অনেকদিন বিয়ে শাদীর দাওয়াত পাইনা। বোরহানি আর কাচ্চি বিরিয়ানি মিস করা যাবে না। তুইতো জানিস আমার আবার বিরিয়ানি খুবই পছন্দ। আমি অবশ্যই যাবো বেচেঁ থাকলে ইন”শা”ল্লাহ”।
অনেকদিন নিয়াজের হাসিমুখ দেখে সবার অনেক ভালো লাগলো। আরও কিছুক্ষণ চায়ের কাপে আড্ডা জমলো। বেশ অনেকটা সময় পার হয়ে যাওয়ার পর সবাই বিদায় নিয়ে যে যার ঘরে ফিরছে। নিয়াজ রাস্তায় রিকশার জন্য দাঁড়িয়ে আছে। এমন সময় তাকে প্রায় ছুঁই ছুঁই করে একটা রিকশা পাশ দিয়ে চলে গেলো। স্পীড কিছুটা কম ছিলো। নিয়াজ বেখায়ালে এক পলক তাকিয়েছিলো। কেনো যেনো তার মনে হলো রিকশায় তুরফা ছিলো। অনেকদিন পরে সেই গলার স্বর শুনতে পেয়েছে সে। মনের ভ্রমও হতে পারে। আজকাল তুরফাকে মনে পড়ছে। মনে করতে চায় না তারপরেও মনে পড়ে। বিরবির করে নিজের মনেই আওড়ালো,
” ভালোই যখন বাসো নাই কেনোই এসেছিলে মন নিয়ে রং তামাশা করতে”?
নিয়াজ এর পরবর্তী দুদিন খুব ব্যস্ততার মধ্য দিয়ে গেলো। যেহেতু বিয়ের দাওয়াত তাও আবার কাছের বন্ধুর বিয়ে। তাই ভালো কাপড় পড়তেই হবে দাওয়াত এর জন্য কিন্তু নিয়াজের গায়ে আগের কোনো পাঞ্জাবি বা স্যুট অস্বাভাবিকভাবে হলেও আর ফিট হচ্ছিলো না। ওজন বেড়ে যাওয়ার জন্য এমন হয়েছে। তাই নতুন করে আবার শপিং করতে হলো। বিয়ে হচ্ছে শহর থেকে দূরে। গাজীপুর এর এক নামকরা রিসোর্টে। মেয়ের ইচ্ছা সে ডেস্টিনেশন ওয়েডিং করতে চায়। বন্ধুও রাজি। তাই নিয়াজ সবার সাথে সেখানেই যাচ্ছে। তাদের রিসোর্টে পৌছাঁতে বেশ অনেক রাত হয়ে গেলো। সেদিন খেয়েদেয়ে যে যার বরাদ্দকৃত রুমে ঘুমিয়ে পড়লো। সকাল হলেই বিয়ের অনুষ্ঠান শুরু হয়ে যাবে। সকালবেলা থেকেই বিয়ের নানান কাজে এদিক ওদিক সবাই ছুটছে। সবাই বরকে নিয়েই ব্যস্ত। এর মধ্য কনে পক্ষরাও রিসোর্টে পৌছে গিয়ে যে যার মতো বিশ্রাম নিচ্ছে৷ বিয়ে পড়ানো শুরু হবে যোহরের নামায এর পর। বরপক্ষ হই হই করতে করতে হলরুমে প্রবেশ করলো। গেট ধরেছে মেয়েপক্ষ। সবাই অনেক উচ্ছ্বসিত মুখে বাক বিতন্ডা করছে। মেয়ে পক্ষের দিকে মেয়েরা বলছে বিশ হাজার টাকা না দিলে তারা ভেতরে ঢুকতে দিবে না। এটা শুনে সবার মধ্য হুলুস্থুল লেগে গেলো। নিয়াজ অবস্থা বেগতিক দেখে বললো
” বিশ হাজার টাকা দিয়ে ঢুকতে হবে? মগের মুল্লুক নাকি? পাচঁ হাজার টাকা দিবো। রাজি থাকলে বলেন না হলে বরকে আমরা বউ ছাড়াই নিয়ে যাবো”।
ভীড় ঠেলে একজন মেয়ে দ্রুত পায়ে মনে হচ্ছে যেনো ঝড়ের বেগে আসছে। সে বলতেই বলতেই আসলো,
” আমরাও আমাদের মেয়েকে মাগনা মাগনা কারো হাতে দিবো না। আমাদের মেয়ে কি বানের জলে ভেসে আসছে নাকি? বরের যদি সুন্দরী বউ হাত ছাড়া করার শখ থাকে তাইলে তাকে বিয়ে ছাড়াই যেতে হবে। গিয়ে পস্তাতেও হবে। কিরে ঠিক কিনা বল?
হঠাৎ চেনা নারীকন্ঠ শুনেই নিয়াজ থমকে গেলো। এই কন্ঠ তার চেনা। অনেক চেনা। এটাতো!!! পাশ ফিরে সামনে তাকাতেই সে দেখতে পেলো সেই চেনা নারীকে যার সাথে তার বহুদিন যোগাযোগ নেই। সেই নারী নিজেও তার দিকে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে। নিয়াজ মনে মনে আওড়ালো,
_ ” তুরফা এখানে? এখন কি করবো? তার মুখোমুখি হবো নাকি এড়িয়ে যাবো? বিয়ে বাড়ি থেকে চলে যাবো?
তুরফা চুপ হয়ে আছে। সে একটা কথাও বলছে না। সে নিজেও আশা করেনি এইভাবে নিয়াজের মুখোমুখি হতে হবে। ছয় মাস আগে নিয়াজ ব্রেক আপ করে চলে যাবার পর সে এতোদিন প্রচুর আত্নগ্লানিতে ভুগেছে। প্রথম কয়েকদিন গায়ে না লাগালেও পরে নিয়াজকে প্রচুর মিস করতো সে। কথা বলার চেষ্টা করেও লাভ হয়নি। সব জায়গা থেকে ব্লক করে রেখেছিলো নিয়াজ। কোনোভাবেই যোগাযোগ হয়ে উঠেনি আর কিন্তু নিয়াজকে তার ভীষণ মনে পড়তো। তারপর যখন শুনলো নিয়াজের বিসিএস হেলথ ক্যাডারে হয়ে গেছে তখন সে বেশ খুশি হয়েছিলো। বারবার মনে হতো যদি একবার দেখা করার সুযোগ পেতো সে তাহলে স্যরি বলতো। সুযোগ কি পেলো সে? তুরফাকে চুপচাপ হয়ে যেতে দেখে মেয়েরা আর সুবিধা করতে পারে নাই। তারা পাচঁ হাজার টাকা নিয়েই গেট ছেড়ে দেয়। তারপর তারা যে যার মতো হলে গিয়ে বসলো।
নিয়াজের বন্ধুরাও অবাক হয়ে গেছে তুরফাকে দেখে পরে জানতে পারলো তুরফা কনের মামাতো বোন হয়। সবাই নিয়াজকে বুঝালো এইটা একটা কাকতালীয় ঘটনা ছাড়া কিছুই না। তুই খাবি দাবি আনন্দ কর নিজের মতো। বিয়ে শেষ হলে যে যার মতো আবার চলে যাবো। নিয়াজ এইভেবেই বসে ছিলো একমনে। বসে থাকতে থাকতে নিয়াজ এর ভালো লাগছিলো না। তাই এদিক ওদিক একটু হাটাঁহাটির জন্য বের হলো। সামনে বেশ বড় খোলা জায়গা। মানুষজন নেই সেখানে। নিয়াজ গিয়ে দাঁড়াতেই কে যেনো তার হাত টেনে আড়ালে নিয়ে গেলো। নিয়াজ হাত ধরার মালিককে ভালো করে চেনে। এটা আর কেউ নয় তুরফা। কি চায় সে? কেনো এই আচরণ? কিছু করবে নাতো উল্টো পালটা? নিয়াজ কিছু বলার আগেই তুরফা বললো,
“আমাকে মাফ করে দাও নিয়াজ”
তুরফার বিচলিত গলা। নিয়াজ মুখ তুলে চাইলো। ঠিক কতদিন পর এই মুখটা দেখছে তার হিসেব জানা নেই তার। নিয়াজ শান্ত স্বরে বললো,
“কিসের জন্য মাফ চাইছো? কি করেছো তুমি আমার সাথে”?
তুরফা চোখ নামিয়ে নত মুখে বললো,
” তোমার ভালোবাসাকে নিজের রুপের দম্ভের সাথে বাজি ধরে নিলামে তুলেছিলাম তার জন্য।
নিয়াজ তাচ্ছিল্যের সুরে হেসে বললো,
” আর তোমার করা অবহেলা, অপমান সেসব কিছুর হিসেব কিভাবে দিবা? আমার দিন রাতের সেই ভেতর বাহিরে জমে থাকা অভিযোগ অনুযোগ এর খাতাও বাকিতে জমা আছে”।
তুরফা হঠাৎ করে আকস্মিক এক কাজ করে বসলো। দিগবিদিক ভুলে নিয়াজকে জাপটে জড়িয়ে ধরে বললো
” সুদ সমেত উসুল করে নাও। তবুও আর অভিমান করে থেকো না। তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচতে পারবো না। জীবন শুন্য লাগে”।
নিয়াজ কোনো কথা না বলে চলে আসতে চাইলো। তার কিছু বলতে ইচ্ছে করছে না। সে আর কোনো নাটকের মহড়া হতে চায়না। একবার বিশ্বাস করে ভালোবেসে ঠকেছে। আর চাউনা সেটার পুনরাবৃত্তি হোক। তুরফা আ/হ/ত দৃষ্টিতে খেই হারিয়ে নিয়াজের দিকে তাকিয়ে আছে। নিয়াজ অনেক কঠিন মনের হয়ে গেছে। তবে কি তাদের মধ্যে যা ছিলো সব শেষ? কিছুই কি আর বাকি নেই? নিয়াজ যেতে নিলে তুরফা তাকে আটকায়। কান্না জড়ানো গলায় বলে,
” কিছুতেই আরেকবার সুযোগ দেওয়া যায় না? বলছিতো ভুল করেছি। ক্ষমা করে দাও”।
নিয়াজ নিজের মনকে সংযত করে বলে,
” ক্ষমা করেছি কিন্তু আর ফিরতে চাইছিনা। আর সম্ভব না “।
তুরফা বলে উঠলো,
” তুমি যদি আজকে এখান থেকে আমাকে শুন্য হাতে ফিরিয়ে দাও তাহলে তুমি আগামীকাল বাড়ি পৌছাঁতে পৌছাঁতে আমার দুনিয়া ছাড়ার খবরটাও পেয়ে যাবে। তখন আমাকে আবার মাটি দিতে আসতে হবে তোমার এই আমি বলে রাখলাম। আর তুমি জানো আমি এটা করতে একটুও পিছ পা হবো না”।
নিয়াজ তুরফার জেদ সম্পর্কে অবগত। সে জানে এমন কিছু সে করতেই পারে নিজের জেদ বজায় রাখতে। নিয়াজ পেছনে ফিরলো। তুরফার মুখোমুখি হলো। তারপর একটা জোরে শব্দ হলো। যার ফলাফল তুরফা নিজের ডান গালে হাত দিয়ে আছে। তুরফা কাঁদছে নিঃশব্দে। নিয়াজ কি যেনো ভেবে তুরফার হাত টেনে ধরে বুকের সাথে মিশিয়ে নিলো। লোকের ভয় লাজ লজ্জা ভুলে নিজের অধরে তুরফার অধর ছোয়াঁলো। অতঃপর নিয়াজ নিজেকে বললো
” আমি স্বেচ্ছায় আর স্বজ্ঞানে আবারও নিজের সর্বণাশ করলাম।”।
চলবে…………

