#দৃষ্টির_অন্তরালে_নিস্তব্ধতা
#লেখনী_মায়মুনা_আক্তার_মারিয়া
#পর্ব:১৮
প্রথমাংশ
গুটি গুটি পায়ে রোদসী সবার সামনে উপস্থিত হলো।মাথা নত করা তার।মেহেক গালে ব্লাশঅন দিয়ে লাল করলেও লজ্জায় যেনো আরো লাল হয়ে আছে।আস্ত এক টমেটো মনে হচ্ছে রোদসীর মুখ খনা। সিজান ভাইয়ের পাশে বসিয়ে দিয়ে মেহেক উৎসর পাশ ঘেঁষে দাঁড়ায়।এতোটা কাছে আসাতে উৎস বিরক্ত হলো।এক কদম পিছিয়ে দাঁড়ায় সে।তাকে সড়ে যেতে দেখে মেহেকও এক পিছিয়ে দাঁড়ালো।এবার উৎসের রাগের পরিমাণ বাড়লো।কপাল কুচক্রে বলল,
-“লজ্জা – সরম বলতে আছে কিছু তোর?”
-“লজ্জা পেলে কী বিয়ে করতে পারবো নাকি?সিজান ভাইয়ের মতো রোমান্টিকের ছিটেফোঁটাও আপনার মধ্যে নেই।আপনার ভর্সায় থাকলে ইহজন্মেও আমার বিয়ে হবে না।তাই পাশাপাশি দাঁড়াচ্ছি এতে যদি কারো চোখে পড়ে আমাদের এই আর কি।”
-“বেশি বাড়িস না পড়ে বুঝতে পারবি এর ফল।”
-“দূর।আপনি চুপ করে দাঁড়ান তো।”
-“তোর পাশে দাঁড়াবো না আমি।”
বলেই উৎস সরে দাঁড়ালো।মেহেক আবার ধীরো পায়ে সবার দৃষ্টির অগোচরে গিয়ে দাঁড়ায়।
-“আমার সামনে থেকে সর বলছি।”
-“সরবো না।কি করবেন? ”
-“ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছিস।আমার হাত যখন চলবে তখন দম নিতেও কষ্ট হবে।”
মেহেক শুকনো ঢোক গিললো। কী বলছে এসব?তাকে সবার সামনে কিছু বলবে না তো।তার থেকে ভালো ভালোই ভালো কেটে পরুক না হয় তার ইজ্জতের বারোটা বাজিয়ে দিবে।ওদের ফিসফিসানি এতোক্ষণ ধরে দূর থেকে দাঁড়িয়ে লক্ষ্য করছিলো ফারাজ।কিন্তু হঠাৎ মেহেকের মুখ চুপসে যেতে দেখে অবাক হলো।মেহেক সরে দাঁড়ায়। এতে উৎস মুখ টিপে টিপে হাসলো।সে তো কথাটা অন্য কিছু বুঝাতে বলেছে কিন্তু তার বোকা হরীনি ভয়ে সরে দাঁড়িয়েছে।ফারাজ উৎসের কাছে যায়।ভাইকে দেখে উৎস স্বাভাবিক হলো।সে বুঝতে পারলো কেনো এসেছে, আর এতোক্ষণ আর কেউ কিছু খেয়াল না করলেও তার ভাই সবই দেখেছে।
-“আমাকে দেখে ঘোল পাল্ট নিচ্ছিস?যদি চাস তোদের বিয়েটাও করিয়ে দিতে পারি।”
-“আমার বিয়ে আমি দেখে নিবো।”
-“ওকে কিন্তু আমার আগে করে ফেলিস না।”
ফারাজ এক চিলতে হাসি দিয়ে সরে গেলো।
রোদসীর সিজানের পাশে সবার সামনে বসে থাকতে অস্বস্তি হচ্ছে। মাথা তুলে তাকাতে পারছে না।এমতাবস্থায় সিজান ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে।নিজেদের মধ্যে কথা বার্তা বলে নিবে এতেই তো হয় তা না করে পাএী দেখতে এসেছে সেই ভাবেই নাকি দেখতে হবে।মেহেক মিষ্টির বাটি নিয়ে এসে সিজানের মুখের সামনে ধরে বলল,
-“দুলাভাই আপুকে মিষ্টি খাইয়ে দাও।”
রোদসী হতবাক হয়ে মেহেকের দিকে তাকায়।চোখের ভাসায় বোঝাতে চায় বড়োদের সামনে কোনো মজা করতে না কিন্তু মেহেক সেই ভাষার কী কোনো ধার ধারে সে একটা মিষ্টি কেটে চামচ ধরিয়ে দিলো সিজানের হাতে।সিজানও ভদ্র ছেলের মতো রোদসীর মুখের কাছে এগিয়ে দিলো।রোদসীর লজ্জায় মাথা আরো নুইয়ে ফেললো।বড়োরা দৃষ্টি সড়িয়ে নিয়ে কথায় ব্যস্ত হলো।ফারাজ এগিয়ে এসে বলল,
-“বিয়ে করবি আর বিয়ের মিষ্টি খেতেই বাহানা।”
রোদসী সিজানের দিকে এক পলক তাকিয়ে মিষ্টির অংশটুকু খেয়ে নেয়।এবার রোদসীর পালা।তার হাতে মেহেক চামচ ধরিয়ে দিয়ে বলে সিজানকে খাইয়ে দিতে।খাইয়ে যে দিতেই হবে এই ছাড়া কোনো উপায় নাই তাই রোদসীও খাইয়ে দেয়।
বড়োরা মিলে তারপর কথাবার্তা বলে নেয়।যেহেতু তারা দু’জনেই দুজনকে পছন্দ করে তাই দ্রুত বিয়ে দিয়ে দেওয়াই ভালো।সাজ্জাদ চৌধুরী চলে গেলে আবার কবে ছুটি পায় বলা যায় না।সুতরাং তাদের বিয়েটা ঘরোয়া ভাবে সম্পন্ন করতে চায় সাথে কিছু আত্নীয়রা থাকবে।সবার মতামত নিয়ে ঠিক করা হয় তিন দিন পরেই বিয়ে।রোদসী তেমন সাজগোছ ও জাঁকজমকপূর্ণ ভাবে বিয়ে করতেও চায় না তাই ছোটোর মধ্যে বিয়ের কাজ সেরে ফেলবে।
——-
অনেক রাত হয়েছে এখনো উৎস ও ফারাজ বাসায় আসেনি।সবার চিন্তায় হাত পা ঠান্ডা হয়ে গেছে।জরুরি এক কল পেতেই হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে গেছে দুই ভাই।নিশাত সন্ধ্যার আগ দিয়ে বের হয়েছিল বাড়ির গাড়ি নিয়ে কিন্তু এখনো বাসায় আসে নি।নিশাতকে কল দিয়ে পাওয়া যাচ্ছে না।অপরদিকে উৎস ও ফারাজ কিছু না বলেই বেরিয়ে গেলো।বাড়িটা যেই না একটু খুশিতে ভরে উঠছিলো ঠিক তখনি আবহাওয়া বদলে গেলো।নিশাত যেমন মেয়ে সেখানে ওর দারা কোনো ভুল কাজ হতে পারেই না।মেহেক হলে না হয় ভাবা যেতো।কিন্তু অসংখ্য বার কল করেও ওকে পাওয়া যাচ্ছে না।বোন নিখুজ আর দুই ভাই কোথায় গেলো সেটাও বললো না।তার মধ্যে তাদেরকেও জানাতে পারছে না নিশাতের খবর।সুফিয়া চৌধুরীর মেয়ের জন্য চিন্তায় পেশার হাই হয়ে গেছে।বাড়ির কর্তারাও কী করবে বুজতে পারছেন না।সিজানও বেরিয়ে পরেছে কিন্তু সে কল করে জানিয়েছে এখনো নিশাতের কোনো খবর পাওয়া যায় নি।
চোখ উপচে অজস্র পানি ঝড়ে পড়ছে।চোখের পানি বাধ মানছে না।বাড়ির সবার সামনে কীভাবে দাঁড়াবে?তার উপর তার মার অগাধ বিশ্বাস সেই বিশ্বাসকে সে ভেঙে দিলো।ঠান্ডা বাতাস বইছে গা শিউরে উঠছে তার।নিশাতের গায়ে সাদিফের শার্ট।শার্টে তার শীত মানছে না। পুরো শরীর কেঁপে উঠছে বারংবার। কিছুক্ষণ আগের ঘটনা তাকে ভাবাচ্ছে। ভুলতে পারছে না তার সাথে কী চরম দুর্ঘটনা ঘটে যেতো।তবে যে এক দুর্ঘটনা থেকে বাঁচতে গিয়ে সে আরেক দুর্ঘটনায় পা দিলো।এর ফলস্বরূপ তার গোটা পরিবার তার উপর যদি আঙুল তুলে।নিজের উপর নিজের চরম অপরাধবোধ হচ্ছে। তার মতো একটা মেয়ে কীভাবে ভুল করতে পারলো?এতোটা অসহায় তার কখনো লাগে নি।দুই হাঁটুতে মুখ গুজে দুমড়ে কেঁদে উঠছো।একটা মেয়েকে সব সময় সাধারণ ভাবে দেখেছে।সেও যে কাঁদলে এতোটা নিকৃষ্ট লাগতে পারে তা ভাবতেই পারছে না সাদিফ।উৎস ও ফারাজ না আসলে আজ তাদের দুই জনের কাউকেই বাঁচানো যেতো না।ওদের পাশে দাঁড়িয়ে কথা বললেও সাদিফের পুরো মনোযোগ নিশাতের দিকে।মেয়েটার করুন অবস্থা দেখে নিজেকে আর থেমে রাখতে পারলো না।গম গম পায়ে হেঁটে গেলো নিশাতের কাছে।ছোট একটা কাঠের টুলে বসে নিশাত কেঁদেই যাচ্ছে।সামনে কারো উপস্থিতি পেতেই নিশাত চোখ তুলে তাকায়।কান্নার ফলে চোখ লাল হয়ে আছে।সাদিফ কথার ভাষা হারিয়ে ফেললো।নিশাত করুন স্বরে বলল,
-“ভাইয়ারা আমাকে নিয়ে আপনার কাছে লজ্জা পাচ্ছে তাই না কিন্তু বলতে পারছে না।আমাকে মাফ করে দিন।আমার জন্য আপনার শরীর থেকে রক্ত ঝড়ছে।আমার মতো একটা মেয়েকে আপনার”
কথার মাঝপথে থামিয়ে দিলো সাদিফ।পরের কথাটা সে শুনতে চায় না।
-“বেশি ভাবো কেনো?বেশি ভাবা বন্ধ করো তাহলে অপ্রয়োজনীয় কথা মুখ দিয়ে বের হবে না।”
মুখে তাচ্ছিল্যের হাসি টেনে নিশাত কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,
-“সত্যি তো আর বদলে যাবে না তাই না।”
-“এই সম্পর্কে আমি প্রতিশ্রুতি দিতে চাই।তোমাকে করুনা করে না বরং ভালোবেসে।পরিস্থিতি আমাদের অনেক জায়গায় নিয়ে যায় । কিন্তু আমরা পরিস্থিতিকে বুঝতে চাই না।”
একটু থেমে সে আবার বলল,
-” ভাইদের নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা বাদ দাও।তোমাকে কেউ দোষ দিচ্ছে না আর দিবেও না।বাড়ি চলো।”
-“বাড়ি!বাড়িতে কীভাবে জাবো?আম্মু, আম্মু কে কীভাবে মুখ দেখাবো?”
-“পুরো ঘটনা সবাই জানলে সব ঠিক হয়ে যাবে।এখন উঠো।গাড়িতে গিয়ে বসো।”
-“আপনি?”
অশ্রুশিক্ত চোখে প্রশ্ন করলো।
-“আমিও জাবো।তোমার দায়িত্ব আমার উপর যখন বর্তিয়েছে তখন সেই দায়িত্ব আমি নির্ধিদায় পালন করবো।”
-“আপনার তো আঘাত লেগেছে ডাক্তার দেখাতে হবে।”
-“সিজান আছে ও সামলে নিবে।”
ফারাজের শান্ত স্বরে নিশাত নড়েচড়ে বসলো।
-“ভাইয়া”
ফারাজ পানির বোতল এগিয়ে দিয়ে বলল,
-“মুখে পানি দিয়ে সাদিফের সাথে আয়।গাড়িতে উৎস অপেক্ষা করছে।”
নিশাত বাধ্য মেয়ের মতো চুপ করে বোতলটা নিলো।ফারাজ গাড়িতে গিয়ে বসলো।নিশাত অবাক হলো।সে কখনো ভাইদের সাথে তেমন খোলাখুলি ভাবে কথা বলে নি।শুধু সে না রোদসীও।তারা দুজনেই ভাইদের সাথে প্রয়োজন ব্যতীত তেমন কথা বলে না।উৎসের ভাব ভঙ্গি বোঝা সহজ না কিন্তু ফারাজকে শান্ত ও তাকে কিছু বললো না বরং মৃদু স্বরে কথা বলা এবং কথার ইঙ্গিতে বোনের প্রতি স্নেহ, ভালোবাসা দেখে নিশাতের বেহায়া চোখ বেয়ে পুনরায় দু’ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো।নিশাতকে কাঁদতে দেখে সান্ত্বনা দিবে সাদিফ বলল,
-“ভাইদের যেমন পাথর ভাবো তারা ততোতাও পাথর না।মুখে পানি দিয়ে পানি খেয়ে নেও।বাসার সবাই চিন্তা করছে তোমার জন্য।”
নিশাত দুই পাশে মাথা নেড়ে সিজানের কথা মতো করলো।সিজান আঘাত প্রাপ্ত শরীর নিয়েই নিশাতের হাত মলিন ভাবে ধরলো।নিশাতের গা কেঁপে উঠলো।
-“অধিকার নিয়েই ছুয়েছি।”
-“আপনার শরীরে ব্যাথা তো।”
-“কিছু মুহুর্ত আছে যা ব্যাথা ভুলিয়ে দেয়।”
কথাটা বলেই সাদিফ এগিয়ে গেলো।নিশাতও পায়ে পা মিলিয়ে অবাক চোখে তাকিয়ে আগায়।
#চলবে
#দৃষ্টির_অন্তরালে_নিস্তব্ধতা
#লেখনী_মায়মুনা_আক্তার_মারিয়া
#পর্ব:১৮
শেষাংশ
-“আপু”
মেহের ডাকে সবাই তার দৃষ্টি অনুসরণ করে সদর দরজার দিকে তাকায়।শরীরে ছেলেদের শার্ট।মুখ শুকিয়ে গেছে এই কয়েক ঘন্টায়।বাড়ি সুদ্ধ সকলে উপস্থিত তার সামনে।তাদের কী বলবে আজ সে? তা তার জানা নেই।চোখের নোনা জাল গড়িয়ে ঠোঁটে এসে জমা হলো।কিন্তু গড়িয়ে পড়ার আগেই শক্ত একটি হাত তাকে শক্ত ভাবে ধরলো।তার চোখে চোখ রাখতেই ইশারায় মাথা দুপাশে নেড়ে বুঝিয়ে দিলো তাকে কাঁদতে না।সাদিফের কনুই গড়িয়ে রক্ত পড়ছে,ঘাড়ে আঘাত পেয়েছে কড়া ভাবেই।কিছুক্ষণ আগে কাউকে বাঁচাতে মড়িয়া হয়ে পড়ায় উপলব্ধি হয় নি কিন্তু এখন বেশ ব্যাথায় কুঁকড়িয়ে যাচ্ছে। টান হয়ে দাঁড়াতে পারছে না।তার এই অবস্থা দেখে সবাই ভয় পেয়ে গেলো।কিন্তু তার থেকে বেশি অবাক হলো তার শরীরে কিছু নেই। নিশাতের শরীরে শার্ট কিন্তু কেনো?কী হয়েছে তা সম্পর্কে কেউই অবগত নয় তবে জানার আগ্রহ সবার মুখে কিন্তু মুখ ফুটে কেউ প্রশ্ন করতে পারছে না।ফারাজ সাদিফকে ধরে নিয়ে সোফায় বসায়।উৎস সিজানকে চোখের ইশারা করতেই সিজান সজাগ হয়ে যায়।তার কাছে সব সময় প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র রাখে।কারণ তাকে রাখতে হয়। কখন কী হয়ে যায় বলা যায় না।
-“মেহেক বোনকে নিয়ে বসা।”
উৎসর গম্ভীর স্বরে মেহেক ধীরে মাথা দুলিয়ে নিশাতকে টেনে নিয়ে বসায়।নিশাত এক মুহুর্তের জন্য হলে ও মাথা উঁচু করে তাকায় নি।তাকালে হয়তো দেখতে পেতো বাড়ির লোকদের নীরব ছটফটানি।তাকে নিয়ে কারো কখনো কোনো অভিযোগ ছিলো না।অগাধ বিশ্বাস, ভর্সার পাএী ছিলো তাই আজ তাকে কেউ কোনো প্রশ্ন করার সাহস পাচ্ছে না।তাদের মনে একটাই ধারণা নিশাত কিছু করতে পারে না তবে বর্তমান অবস্থা সেটাকে তো এড়িয়ে যেতে পারছে না।সিজান এসে ডেসিন করে দিয়ে বেন্ডেজ করে দেয়,রক্ত পড়া বন্ধ হয়।নিশাত এখনো ঠাঁই ওইভাবেই বসে আছে।শান্ত পরিবেশ কিন্তু সবার মনে প্রশ্ন।
-“নিশাতের বিয়ে হয়েছে সাদিফের সাথে।আজ থেকে ওরা স্বামী-স্ত্রী।”
বেছ এই টুকু কথাই জেনো বাজের মতো আকাশ থেকে পড়ে নীরব পরিবেশকে একটা শক দিয়ে দিলো।সুফিয়ার চোখ অশ্রুতে ভরে গেলো।শাহাদাত চৌধুরী হুমকির স্বরে বললেন,
-“তোমার মজা করার বয়স না উৎস।এসব কথা কেনো বলছো?”
-“আমি যে ফাজলামো পছন্দ করি না তা তুমি ভালো করেই জানো।সেখানে আমি কেনো মজা করবো?”
-“উৎস তুই যা বলবি আমি সব বিশ্বাস করবো কিন্তু আমার নিশাতকে নিয়ে তুই এসব কথা বলবি না।”
মায়ের বোনের প্রতি এতো পখর আত্নবিশ্বাস দেখে মেহেক বলল,
-“আম্মু আমি?”
-“তুই আর নিশাত এক না।”
মায়ের কথাটা মেহেকের হৃদয়ে গিয়ে লাগলো।মায়ের কাছে তো সব সন্তান সমান হয় সে শুনে এসেছে তাহলে তার মা কেনো দুই বোনের মধ্যে এতো তফাৎ করে?অশান্ত মেয়েটাকে শান্ত করে দিলো সুফিয়া এই কথার মাঝেই।মেহেক মুখ গোমরা করে দাঁড়িয়ে রইলো।আর একটি শব্দ ও উচ্চারণ করলো না।উৎস গলায় কাঠিন্য ভাব রেখে বলল,
-“আমার সামনে পার্থক্য করো না মেজো মা।জানোই তো আমি এসব বরদাস করবো না সেখানে মেহেকের বেলায় তো নয়ই।”
একটু থেমে উৎস শুরু থেকে সব ঘটনা খুলে বলতে লাগলো।
সবাই যখন সিজান,রোদসীর বিয়ের কথাবার্তায় ব্যস্ত তখনি নিশাতের কাছে একটা কল আসে।অচেনা নাম্বার হওয়ায় নিশাত ধরে নি।কিন্তু বারং বার কল আসছিলো তা উৎস লক্ষ্য করেছে। সে বিরক্ত হয়ে নিশাত কল ধরে সাইডে চলে যায়।সে কথা শেষ করে যখন ড্রয়িং রুমে উপস্থিত হয় তখন তার ভাব ভঙ্গি স্বাভাবিক ছিলো না।সে বার বার ঘেমে যাচ্ছিলো।তাকে চিন্তিত ও অন্যমনস্ক দেখে উৎসর মনে খটকা লাগে।সে ভেবেছিলো পড়ে জিজ্ঞাসা করে নিবে কোনো সমস্যা হয়েছে কী না কিন্তু তার আগেই নিশাত বাসা থেকে বেরিয়ে যায় কাউকে কিছু না বলে।নিশাত যখন বেরিয়ে যায় তখন উৎস অফিসের এক কলে ব্যস্ত ছিলো আর বাকিরা যে যার রুমে থাকায় ও গিন্নিরা রান্না ঘরে ছিলো বিধায় নিশাত প্রশ্নের সম্মুখীন হতে পারে নি।শুধু জানিয়ে গেছে বাহিরে যাচ্ছে প্রয়োজনীয় কাজে।নিশাতকে কিছু দিন ধরেই কিছু ছেলে পিছু লেগেছিল। রাস্তায় যেখানে সেখানে তাকে ইভটিজিং করতো।একদিন সাদিফ তাকে বাঁচায়।ছেলেগুলো মফিজের।ইকবালের নজর পড়েছে নিশাতের উপর।সে বুঝতে পেরেছে ইয়াফাকে স্বীকার না করে চৌধুরী বাড়ির কোনো এক রাজ কন্যাকে টোপ দিতে।কথা মতো তাই করে নিশাতকে উত্যক করতে থাকে।তার ক্লাস মেটদের থেকে নাম্বার নিয়েও কল করে।নিশাত এসবের জন্য প্রতিদিন ভয় সিঁটিয়ে থাকতো কিন্তু কাউকে কিছু বুঝতে দেয় নি।সাদিফ একদিন বাঁচালে উৎসকে জানাতে চাইলেও নিশাত বাঁধা দেয়।
নিশাতের কিছু ছবি দূর থেকে তুলে সেগুলো এক্সপার্ট লোকদের সাহায্যে এআই এ-র মাধ্যমে নোংরা ও অশ্লীল ছবি বানায়।এসব আজই জানতে পারে সে ওই কলের মাধ্যমে। নিজের সম্মান থেকেও তার পরিবারের সম্মান অনেক তার কাছে এসব চিন্তা করে অসংখ্য বার অনুরোধ করে কিন্তু পাষান ছেলেদের মন গলে না।তাকে একটা লোকেশন পাঠায় সেখানে গেলে এসব ছবি ডিলিট করে দিবে বিনিময় হিসাবে এক লাখ টাকা চেয়েছে।এই মুহুর্তে এতো টাকা কোথায় পাবে তা নিয়ে আরো চিন্তায় পড়ে যায়।বাধ্য হয়ে সাহায্য নেয় সাদিফের।বাড়ির গাড়ি নিয়ে যাওয়ায় ড্রাইভার ছিলো তার সাথে কিন্তু তাকে পাঠানো লোকেশনে একা যেতে বলে।তার এতোটা সাহস কখনো হয় নি কাউকে না বলে কোথাও যাওয়া কিন্তু আজ নিয়তির নির্মম পরিহাসের স্বীকার সে যেতে তো হবেই।তার আগে টাকা জোগার করতে হবে।সাদিফের সাথে দেখা করে।সাদিফ টাকা দিতে রাজি হয় কিন্তু এতো টাকা দিয়ে কী করবে হঠাৎ তারমধ্যে ওর হাবভাব ঠিক লাগছে না।নিশাত তো সেরকম মেয়ে না তাহলে কী হলো?
-“কিছু মনে না করলে একটা প্রশ্ন করতে পারি?”
-“আমি জানি আপনি কী বলবেন।কিন্তু আমি বলতে পারবো না।প্লিজ বাসায় জানাবেন না।আমি আপনার টাকা পরিশোধ করে দিবো।”
-“এখানে টাকার কথা উঠছে না নিশাত।আমার থেকে দ্বিগুন টাকা পয়সা তোমাদের আছে।আমার মনে হচ্ছে তুমি কোনো সমস্যায় পড়েছো।আমাকে সব খুলে বলো।”
-“আমার যেতে হবে।দেড়ি হয়ে যাচ্ছে।”
-“কোথায় যাবে?”
-“একটা কাজ আছে।”
-“নিশাত, প্লিজ বলো আমাকে।প্লিজ।আমার মনে হচ্ছে তুমি কোনো ঝামেলায় পড়েছো।”
-“……”
-“নিশাত বলো।”
নিশাত অবশেষে কাঁদো কাঁদো স্বরে সব খুলে বলে।সাদিফ এসব শুনে মাথায় হাত দেয়।
-“তোমাকে আমি একা যেতে দিবো না।আমিও যাবো সাথে।”
-“আপনি গেলে বিপদ বাড়বে বই কমবে না।আপনার যেতে হবে না।”
-“তোমার একা যাওয়া নিরাপদ না।বিপদে পড়লে এক সাথে পড়বো।চলো।”
-“না।আপনি যাবেন না আমার সাথে।”
-“কেনো?”
-“টাকা দিয়ে সাহায্য করছেন তার জন্য ধন্যবাদ।কিন্তু এর বেশি সাহায্য আমার প্রয়োজন নেই।”
নিশাত কথাগুলো রাগি স্বরে বললে সাদিফ সাধারণ ভাবেই হজম করে নিলো।নিশাত গিয়ে গাড়িতে বসলো।গাড়ি সোজা রাস্তা ছেড়ে উল্টো রাস্তার দিকে যেতে দেখতে পেয়ে সাদিফ দ্রুত তার গাড়িতে গিয়ে বসে।নিশাতের গাড়ি অনুসরণ করে সে ছুটে যায়।
গাড়ি এক পিচঢালা রাস্তায় থামে।নিশাত নেমে গিয়ে ড্রাইভারকে বলে এখানেই অপেক্ষা করতে।শুনশান পরিবেশ হওয়ায় ঝিঁঝি পোকা ডাক শোনা যাচ্ছে।নিশাত ফোনের ফ্লাশ অন করে সামনে দিকে হাঁটতে থাকে।নিশাতকে একা যেতে দেখে সাদিফ পিছু নেয়।নিশাত একটা ভাঙাচোরা গ্যারেজে আসে।ডিম লাইটের আলোয় চারিপাশ মৃদু মৃদু দেখা যাচ্ছে। সেখানে ইকবালকে দেখে নিশাত ঘাবড়ে যায়।
-“এসো এসো।চৌধুরী বাড়ির বিগ প্রিন্সেস।”
নিশাতের পা কাপছে। এক পা এগোনোর সাহস হচ্ছে না।এতোগুলো ছেলের মাঝে।ধীর পায়ে এগোলো।কয়েক কদম এগিয়েই বলল,
-“টাকা এনেছি।এখন ছবি গুলো পুড়ে ফেলুন আমি দেখতে চাই।”
-“এতো তাড়া কিসের?আসো আগে আমাকে একটু আদর করো।”
-“মানে”
-“আমার ডেরায় আসছো পবিএ ফুল হয়ে আর যাবে নর্দমার নোংরা হয়ে।”
নিশাত ভয়াতুর স্বরে বলল,
-“এসব কী বলছেন?”
-“তোর ভাই ফারাজ আমার ও আমার ভাইয়ের পথের কাঁটা।তাই একটু ভেঙে দিতে এতো আয়োজন।টাকা তো শুধু অজুহাত।”
এ কোন বিপদে সে পা দিলো।এক বিপদ থেকে বাঁচতে তার থেকে বড়ো বিপদে সে পড়ে গেলো।
মনের মাঝে অত্যাধিক সাহস সঞ্চয় করে বলল,
-“লজ্জা করে না একটুও।যেই মা জন্ম দিলো সে তো একজন নারী।সেই নারী জাতিকে খুবড়ে খাওয়ার এতো ইচ্ছা নরোপীচাশ।”
মুহুর্তের মধ্যে তার চারোপাশে কয়েক জন ছেলে মিলে ঘিরে ফেললো।নিশাত ভয়ে বড়ো বড়ো শ্বাস নিলো।আজ যে সে বড়ো বিপদে পড়ে গিয়েছে এখান থেকে তাকে কে বাঁচাবে।সাদিফকে আসতে মা বললো।বাসায় ও জানিয়ে আসে নি।
-“বড্ড মুখে কথা ফুটেছে না।এই মুখ বন্ধ করবো আজই।”
ইকবাল রহস্যজনক হাসি দিয়ে নিশাতের দিকে এগোয়।নিশাত বাঁচার জন্য উচ্চস্বরে বলল,
-“বাঁচাও। কেউ আছো?বাঁচাও।”
-“এখানে কেউ নেই।যতোই চিৎকার করিস না কেনো কোনো লাভ হবে না।”
বলেই ইকবাল নিশাতের হাত খপ করে ধরে।নিজেকে ছাড়ানোর জন্য ছটফট করতে থাকে।তাকে টানতে থাকে কিন্তু নিশাত সড়িরের সকল শক্তি দিয়ে ইকবালের পেটে লাথি মারে।ইকবাল আকস্মিক ব্যাথায় ছিটকে পড়ে।বাকি ছেলেগুলো তেড়ে আসে নিশাতকে ধরার জন্য তখনি সেখানে হাজির হয় সাদিফ।তাকে দেখে নিশাত অবাক হয়।সে আসতে নিষেধ করেছিলো তবুও এতোটা পথ পিছু নিয়ে এখানে এসেছে।
-“তোকে না বলেছিলাম কাউকে সাথে নিয়ে আসবি না, শুনলি না আমার কথা এর ফল ভালো হবে না।”
-“যে জন্য ডেকেছিস তা মিটিয়ে নে।”
-“মিটাবো তো ওই পুতুলের ওপর।কিন্তু তুই আমাদের মাঝে আসলি কেন? ওই দিন ও এসেছিলি।”
-“বাজে বকিস না।আমাদের যেতে হবে।”
-“তো যা।তোকে কে আসতে বলেছে?”
সাদিফের রাগে মাথা গরম হয়ে গেলো।সে ইকবালের ছেলেদের সাথে মুহুর্তের মধ্যে হাতাহাতি শুরু করে দেয়।নিশাত এক কোনায় গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে।হঠাৎ ইকবাক রুষ্ট গলায় বলল,
-“শেষ করে দিবো।ওকে শেষ করে দিবো।থাম।”
সাদিফ ইকবালের দিকে তাকাতেই তারা দেখে ও বন্দুক তাক করে রেখেছে নিশাতের দিকে।নিশাত বন্দুক দেখে তার চোখ বড় হয়ে গেছে।সাদিফ থেমে যায়।
-“ছেড়ে দে।”
-“চু চু চু ছেড়ে দিতে বললেই কী ছেড়ে দেওয়া যায়।আগে একটু চু*সে দেখি।”
-“জা*নো*য়া*রের বাচ্চা মুখ সামলে কথা বল।”
সাদিফের গর্জন পুরো গ্যারেজ ক্যাপে উঠলো।
-“এখানে তোর দম কোনো কাজ দিবে না।হাত তুলে সাইডে দ্বারা আর দেখ কীভাবে শেষ করি।”
সাদিফ নিশাতের ভয়ে জুবুথুবু হতে দেখে বলল,
-“গান নামা বলছি।”
-“হুম নামাবো তো সাথে আরো কত কিছু যে”
নিজেকে নিয়ে যে মেয়ে কখনো কারো থেকে কোনো নোংরা কথা বা ইঙ্গিত শুনে নি আজ তাকে নিয়ে বাজে কথা বলে যাচ্ছে এসব সয্য করতে পারছে না।
-“আমাকে মেরে ফেলুন তবুও এসব কথা বলবেন না।ছেড়ে দিন উনাকে আপনি কেনো আসলেন আপনাকে আমি না করেছিলাম।আমার মতো মেয়ের মৃত্যু ঠিক আছে।”
-“এসব কী বলছো তুমি।তুমি ভয় পেয়ো না আমি আছি তো।”
-“ও লে লে লে চৌধুরী রাজ কন্যার দেখি লা** আছে।তা বাড়ির সবাই কী জানে?”
-“উনি উৎস ভদইয়ের বন্ধু আমার”
নিশাতের কথা পূর্ন করতে না দিয়েই ইকবাল বলল,
-“ওহ ভাই জুটিয়ে দিয়েছে।তাহলে ফারাজ কেনো আমাকে তিনটার থেকে একটা দিলো না।”
-“আমাকে নিয়ে বলছেন বলুন কিন্তু আমার বোনদের দিকে চোখ তুলে তাকানোর সাহস দেখাবেন না।তাহলে ওই চোখ আর চোখ থাকবে না।”
-“একটু পর মরণ যন্ত্রণা সয্য করবি আর এখন সাহসী পনা দেখাচ্ছিস!”
সাদিফ আর থেমে থাকতে পারলো না। তাকে ইকবালের ছেলেগুলো চেপে ধরে ছিলো কিন্তু এবার নিজেকে ছাড়িয়ে ইকবালের উপর হামলিয়ে পড়লো।সে জানে নিশাতকে সহজে মারবে না।নিশাতকে এখানে আনার কারণ চৌধুরী বাড়িকে ধ্বংস করা।সাদিফ একা সবার সাথে ধস্তাধস্তি করতে থাকে।সবার সাথে তারা একা পেরে উঠা মুশকিল তখনি ইকবালের লোকদের মধ্যে একজন ছুড়ি বসায় তার কাঁধে।সাদিফ শব্দ করতেই নিশাত চিৎকার দিয়ে উঠে।নিচে পড়ে থাকা এক রড নিয়ে ইকবালের মাথায় আঘাত করে।ইকবাল মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ে।সাদিফের কাঁধ বেয়ে রক্ত ঝড়ে পড়ছে।কিন্তু সে কোনো তোয়াক্কা না করে ইকবালের হাত থেকে গান কেড়ে নিয়ে ছেলেদের দিকে তাক করে।আরেক হাতে নিশাতকে ধরে।
-“এক পা এগোলে তোদের সব কয়টা কে শেষ করে দিবো।”
সাদিফ নিশাতকে নিয়ে সাবধানতায় বেড়িয়ে গেলো।ইকবাল ব্যাথায় উঠে দাঁড়াতে পারছে না।তার ছেলেগুলোকে উদ্দেশ্য করে বলল,
-“ধর এদের।দুইটাকেই ধর।”
বাহিরে ঘুটঘুটে অন্ধকার কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না।ফোনে নেটওয়ার্ক পাচ্ছে না।পিছনে ইকবালের লোক।রাস্তা হারিয়ে ফেলেছে তারা।তাই প্রাণপনে তারা দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে এসে পড়লো এক লোকালয়ে।সাদিফ আর দৌঁড়াতে পারছে না।নিশাত ও হাঁপিয়ে গেছে।এক বাড়ির পাশে এসে মাটিতে বসে পড়লো তারা।সাদিফ ফোন বের করে উৎসকে সংক্ষেপে সব খুলে বললো।নিশাত বাধা দিলো না কারন তার প্রথমেই উচিত ছিলো সবাইকে জানানো।যদি জানিয়ে দিতো তাহলে এসব কিছু হতো না।বড়োরা মিলে সমাধান করার উপায় খুঁজত।
দুই জন মেয়ে ছেলেকে দেখে বাড়ির কর্তী তার স্বামীকে নিয়ে বেরিয়ে আসলো।নিশাতের জামা ছিড়ে গেছে।কোনো আগ পাশ না তাকিয়েই তারা ছুটেছে এতোক্ষণ হয়তো এই জন্যই ছিঁড়ে গিয়েছে খেয়াল করে তো সে দৌঁড়ায় নেই।কিন্তু এই জামা ছেড়া নিয়ে এখন তারা পড়ে যায় ঝামেলায়।বাড়ির কর্তী বললেন,
-“এতো রাতে এখানে নষ্টামি করতে এসেছো।ছি ছি ছি।বাসায় এই শিক্ষা দেয়।”
তার স্বামী বললেন,
-“এসব কী করছো তোমরা এখানে? আমার ঘরে মেয়ে-ছেলে ও আছে।তারা সন্ধ্যার পর ঘর থেকে পা বাহিরে পা রাখার সাহস পায় না।”
-“আপনারা যা ভাবছেন সেরকম কিছু না।ভুল ভাবছেন।আমরা বিপদে পড়ে এখানে এসেছি।”
সাদিফের কথায় বাড়ির কর্তী বললেন,
-“বুজি বুজি।হোটেল মোটেল গিয়ে থাকো আর ধরা খেলে এভাবে এসে সবার দরজায় পড়ো।”
-“আন্টি ভুল বুজছেন।আমার কথাটা শুনুন।”
নিশাত সব খুলে বলতে চাইলে তাকে সুযোগ না দিয়ে তাকে প্রশ্ন করলো,
-“তাহলে বলো এ কে স্বামী তোমার?”
-“না।আমার ভাইয়ের বন্ধু।”
-“বুজেছি সব।কর্তা”
-“জি গিন্নি।”
-“ব্যবস্থা করুন না হয় এদের পাপ কাজে আমরা সম্মর্থন করার দায় হবে আমাদের।”
সাদিফ হতবাক হয়ে বলল,
-“কী বলছেন? কীসের পাপ কাজ?আর আপনাদের কেনো দায় হবে।ওর ভাই আসছে আসলেই আমরা চলে যাবো।”
-“না তা তো হবে না।”
-“মানে?”
তাদের কথার জবাব না দিয়ে প্রতিবেশীদের ডেকে এনে জোর জবরদস্তি করে তাদের বিয়ে দিয়ে দেয়।এই বিয়েতে তারা কারোরই মত নেই তবুও বাধ্য হয়ে বিয়ে করে নিতে হয়।দুজনের কবুল বলার পর সেখানে উপস্থিত হয় উৎস তাই আর আটকাতে পারে না বিয়েটা।উৎস এসব এসে দেখে হতভম্ব হয়ে যায়।তার বুঝদার বোনটা কী করে বসলো আজ?সে কিছু বলার মতো কিছু খুঁজে পেলো না।তার খানিকক্ষণ পার হলে ফারাজ আসে।সে ও অবাক হয়।কিন্তু এখন তো আর কিছু করার নেই যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে।এখন বোনকে স্বান্তনা তো দিতে হবে।নাহলে কখন কী করে বসে বলা যায় না।এমনিতেই নিজেকে দায়ী করছে এসবের জন্য।নিজের সাথে পরিবারের সম্মান তার সাথে সাদিফের সম্মান সব এক সুতোয় যে বেঁধে গেলো।
চলবে।
#দৃষ্টির_অন্তরালে_নিস্তব্ধতা
#লেখনী_মায়মুনা_আক্তার_মারিয়া
#পর্ব:১৯
সম্পূর্ণ ঘটনা সম্পর্কে সবাই অবগত এখন।শাহাদাত চৌধুরী অনড় হয়ে তাকিয়ে রইলেন ফ্লোরের দিকে।সাফওয়ান চৌধুরী মেয়ের পাশে গিয়ে বসলেন।মেয়ের মাথায় হাত বুলাতেই নিশাত হামলে পড়লো তার বাবার বুকে।কী আশ্চর্য তাই না যেখানে মার বুকে কেঁদে অশ্রু বিসর্জন দেওয়ার কথা ছিলো সেখানে তার মা বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।ঘড়ির কাটা তো কারো জন্য থেমে থাকে না।সে আপন মনে ছুটে চলছে।রাত ও গভীর হচ্ছে। কিন্তু সেই দিকে কারো কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।পরিস্থিতিকে মেনে নিতেই হবে।কিন্তু সবাই হাত মুড়িয়ে বসে থাকলে তো হবে না।তাই সাজ্জাদ চৌধুরী বললেন,
-“যা হওয়ার তা তো হয়ে গেছে।এসব নিয়ে বসে থাকার কোনো কারণ দেখছি না।অনেক রাত হয়েছে খেয়ে নাও সবাই।”
-“আমার গলা দিয়ে তো খাবার নামবে না।”
কথাটা বলেই সুফিয়া নিশাতের উদ্দেশ্যে বললেন,
-“তোকে নিয়ে আমার গর্ব ছিলো আর তুই কী না।তোর মতো মেয়ে থাকার চেয়ে না”
-“ছোট মা।”
উৎস ধমকের স্বরে বলল।
শাহাদাত চৌধুরী ছেলেকে বাধা দিয়ে বললেন,
-“উৎস,শান্ত হও।উঁচু গলায় কথা বলতে পারো না।”
-“তাই বলে ওকে যা ইচ্ছা তাই বলবে।”
-“আমার মেয়ে আমি বুঁজে নিবো।আমার মেয়েদের মাজে তুই আসবি না।”
উৎস রুক্ষ গলায় বলল,
-“একশ এক বার আসবো।তুমি যতবার না করবে ঠিক ততবার আসবো।তুমি বললেও আসবো আর না বললে ও।”
সাদিফ ব্যাথায় টান হতে পারছে না।কিন্তু সে বুঝতে পারলো এই সম্পর্ক কেউ সহজে মেনে নিবে না।উৎস রেগে উল্টো পাল্টা কিছু বললে আরেক মুশকিল হবে।তাই সে বলল,
-“উৎস মাথা গরম করিস না শান্ত হো।”
শাহাদাত চৌধুরী বললেন,
-“নিশাত মা।তোমাকে তো আমরা সবাই ভিষণ ভালোবাসি।শুধু তোমাকে না তোমাদের তিন বোনকেই।আর বিশ্বাস ও করি আমরা।তাহলে তুমি কেনো একবার ও বললে না আমাদের?”
নিশাত কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,
-“আমি ভেবেছিলাম তোমরা সত্যি ধরে নিবে আর আর রোদসীর বিয়ে এর মধ্যে যদি আমার জন্য সবার সমস্যা পড়তে হোক তা আমি চাই নি।”
-“তা না হয় বুঝলাম। কিন্তু কাউকে তো বলতে পারতে।”
-“আমি বুঝতে পারি নি বড় আব্বু।”
-“এসব কিছু হয়েছে তোর বন্ধুর জন্য।ও না গেলে কিচ্ছু হতো না।”
সুফিয়া উৎসর উদ্দেশ্য কথাটা ছুঁড়ে মারলেন।
উৎসর চোয়াল শক্ত হলো।যে ছেলে তার মেয়েকে বাঁচালো তার কাছে কৃতজ্ঞ না থেকে তার উপর দোষ চাপাচ্ছে।একটা মানুষ অসুস্থ, নিজের জীবনের পরোয়া না করে এসব করলো আর তাকেই অপমানিত হতে হচ্ছে।
-“চাইছো টা কী তুমি মেজো মা?আজ সাদিফ না থাকলে তোমার মেয়ের কী হতে পারতো কোনো আইডিয়া আছে তোমার?”
-“এখানে তো একদম পরিষ্কার হয়ে গেছে ফারাজের বিরোধী পক্ষের লোকরাই এসব করিয়েছে।আর সাদিফ গিয়ে বাঁচিয়েছে।তারপর ও ছেলে মেয়েদের উপর রেগে যাচ্ছিস কেনো মেজো?”
-“বড় ভাবি তুমি এসব বুজবে না।তোমার তো কোনো মেয়ে নেই তাই বলছো।ওর জন্য এখন আমি পাড়ায় মুখ দেখাতে পারবো।”
-“তোর মেয়ে আমার মেয়ে এসব ভেদাভেদ করে কী বুঝাতে চাইছিস?আমরা কী তোর মেয়েদের ভালোবাসি না,পরোয়া করি না ওদের?”
এবার ফারাজ ও মুখ খুলতে বাধ্য হলো।
-“ওর এখানে কোনো ভুল আমি দেখছি না তো।ওর বিয়ে হয়ে গেছে। এখন থেকে ও সাদিফের স্ত্রী।সাদিফ তো ভালো ছেলে আমরা সবাই জানি।”
-“আমার মেয়ের জামাই এই ছেলে?আমি মানি না।”
-“চুপ।একদম চুপ করো।আর একটা কথা যদি বলেছো আমার থেকে খারাপ আর কেউ হবে না।”
সাফওয়ান চৌধুরীর হুমকিতে কেঁপে উঠলো চৌধুরী নিবাস।ছোট ভাইয়ের নীরব ধমকে শাহাদাত চৌধুরী বুঝতে পারলেন পরের পদক্ষেপ তাই তিনি শান্ত স্বরে বললেন,
-“জন্ম তুই দিয়েছিস।তুই ওর আসল পিতা।তুই যা বলবি তাই হবে।আমি তোদের মাজে আসবো না।”
-“এসব কী বলছেন ভাইজান?জন্ম দিলেই বাবা হওয়া যায় না।আমাদের বাড়ির সব সন্তানদের একটা নয় তিনটা করে বাবা মা আছে।সবার অধিকার আছে।যেখানে হিরার টুকরো দুই ভাই আছে সেখানে তাদের সিদ্ধান্ত আমি অমান্য করবো না।”
-“আপনি কী বলছেন?”
-“সুফিয়া বিয়েটা মেনে নাও।আমার নিশাত মা ভালো থাকবে সাদিফের সাথে।উৎস,ফারাজ চাইবে না তাদের বোন কষ্টে থাকুক।নিশাতের খারাপ যেমন আমরাও চাই না তেমনি এই বাড়ির কেউই চায় না।”
-“আঙ্কেল আমি কথা দিচ্ছি আমি নিশাতকে আগলে রাখবো।শুধু ওকে কিছু বলবেন না।”
সাদিফের নিশাতকে নিয়ে এখন থেকেই ভাবছে এতেই সবাই অবাক হলো।সাদিফ ও এই সম্পর্কটাকে মেনে নিচ্ছে।
নিশাত বিমূর্ত হয়ে দেখে গেলো পারিবারিক সিদ্ধান্তকে।কিছু বলতে গিয়েও মুখের কথা ভিতরে নিয়ে গেলো।
সাদিফ যে ভদ্র ও দায়িত্বশীল ছেলে তা সবাই জানে।তাহলে মানতে সমস্যা কোথায়।সবাই মেনে নিলো।সুফিয়াকে বুঝানো হলো। সবাই মিলে কথা বলে নিলো।কিন্তু সুফিয়া বাধা দিয়ে বললেন,
-“এই বিয়ের কোনো প্রমাণ নেই তাই ওদের বিয়ে সবাইকে জানাতে চাই।”
সর্বশেষ তাকে রাজি হতে দেখে সবাই খুশি হলো।
উৎস বলল,
-“বেশ তাই হবে।রোদসী সিজানের সাথে নিশাত সাদিফের বিয়েও হয়ে যাবে।”
———————
বিভিন্ন ঝামেলার কারনে মেহেককে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাওয়া হয় নেই।হেলায় ফেলে রাখলে গুরুতর অবস্থায় পড়তে হতে পারে।এই মেয়ে নিজের যত্ন নেই না।যদি নিতো তাহলে একাবার ও তো মনে করিয়ে দিতে পারতো তার ডাক্তারের কাছে যেতে হবে। উৎস না পাড়লে ও অন্ততপক্ষে অন্য কেউ তো নিয়ে যেতে পারতো।উৎস সকাল সকাল উঠে যায়।মেহেককে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার পর সে অফিসে যাবে।ওয়াশরুম থেকে এতো সকালে উৎসকে বেরোতে দেখেই সাদিফ ঠাট্টার স্বরে বললো,
-“কীরে সকাল সকাল গোসল ব্যাপারটা কী?”
-“ফাজলামো বাদ দিয়ে ঘুমা।রেস্ট দরকার তোর।”
-“সে নেওয়ার অনেক টাইম পাবো।এখন তোর সকালে গোসল করার কারণটা জানতে ইচ্ছে করছে।বিয়ের আগেই কী…”
উৎস হাতের তোয়ালে সাদিফের মুখে ছুড়ে মারলো।কটমট করে বলল,
-“মেহেককে ডাক্তার কাছে নিয়ে যাবো।”
সাদিফ অবাক হয়ে চটপটে বলল,
-“কাম খাতাম।খাতাম।টাটা।বায় বায়।”
সাদিফ যে কী ভেবে বসে আছে তা উৎস বুঝতে পেরে ওর ভুল ধারণা ভাঙতে বলল,
-“আরে ভন্ড ওর চোখের জন্য যাবো।তারপর অফিসে যেতে হবে।তুই আজ বের হবি না।আন্টি সন্ধ্যায় আসবে আমি চলে আসবো।”
সাদিফ মাথায় এক হাত রেখে বলল,
-“এই আন্টিকে তো কিছু বলাই হয় নাই।টেনশন করছে আমাকে নিয়ে।”
-“টেনশন করার কোনো চান্স নেই।সব বলে দিয়েছি।তুই এখন আমার বোনকে নিয়ে টেনশন কর।”
-“এমনি এমনি কী বলি বন্ধু আমার অলরাউন্ডার।কিন্তু তোর বোনকে নিয়ে আবার কিসের টেনশন?কিছু হয়েছে?”
-“হয়নি কিন্তু হবে।”
-“কী!দাঁড়া আমি এক্ষুনি যাচ্ছি।”
সাদিফ উঠে বসে।তাকে উঠতে দেখে উৎস ভ্রু কুচক্রীয়ে বলল,
-“আহাম্মক।এই হওয়া সেই হওয়া না।”
-“তো কী?”
-“আমার চোখের আড়ালে আমার বোনকে ভালোবাসবি আর আমি অন্ধদের মতো চশমা পড়ে বসে থাকবো।”
-“তুই সব জানতি?”
উৎস নির্বিকার ভঙ্গিতে উওর দিলো,
-“হুম।বিয়েটাও আমি দিয়েছি।”
উৎসের কথায় সাদিফ আকাশ থেকে যেনো পড়লো।হতভম্ব হয়ে প্রশ্ন ছুড়লো
-“বিয়ে? তুই!বুঝলাম না।”
-“তোর দেওয়া ঠিকানায় আমি আগেই চলে গিয়েছিলাম আর ইচ্ছে করে বুদ্ধি খাটিয়ে বিয়েটা দিয়ে দিলাম।”
সাদিফ উৎসের দিকে হা হয়ে তাকিয়ে থাকলো।শক্ত ধাতুর এই ছেলেটা ও এসব করাতে পারে!
-“তোর বোন তো আমাকে ভালোবাসে না তাহলে?”
-“তাই তো বললাম এবার হবে।ভালোবেসেছিস এবার ভালোবাসা শিখাও বন্ধু।”
উৎস শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে বেরিয়ে গেলো।
মুখ গোমরা করে উৎসের পাশে মেহেক বসে আছে।তার রাগের মাএা যেনো বাড়ছে বই কমছে না।সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠিয়ে নিয়ে আসলো আবার ডিম সিদ্ধ, ছোলা সিদ্ধ খাইয়েছে।তার মতো একজন সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ কেনো এগুলো খাবে?তার খেতে ইচ্ছে করলে সে খাক। না সে তো খাবে না। নিজে খাবে মজার মজার খাবার আর মেহেককে দেয় সাধহীন খাবার।মেহেক বিড়বিড় করে উৎসকে বকতে লাগলো।ড্রাইভিং করলেও উৎসর সমস্ত ধ্যান মেহেকের দিকে।মেহেক এক পর্যায়ে একটু জোরেই বলল,
-“এ কার পাল্লায় পরলাম আমি।আস্ত এক দানব।কোনো দয়ামায়া নেই। পাষান,হৃদয়হীন।”
মেহেকের কথা উৎসর কানে পৌঁছাতেই ক্ষিপ্ত চাহনি নিক্ষেপ করলো।অমনি বরাবরের মতো মেহেক চুপসে গেলো।শুকনো ঢোক গিলে বলল,
-“এভাবে তাকান কেনো?আমার হার্টবিট বেড়ে যায়।”
উৎসর চাহনি শীতল হলো কিন্তু কিছু বললো না।
-“আজকে কি চুপ থাকার নিয়ত করেছেন।”
-“…”
-“ও বুজেছি।একটা কবিতা পড়েছিলাম।সেখানে একটা লাইন ছিলো ‘সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি সারাদিন আমি যেনো ভালো হয়ে চলি।’তাই বুজি আপনি ভালো হয়ে গেছেন।”
-“ভেবেছিলাম তোকে আজ কিছু বলবো না।কিন্তু আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম তুই তো ভালো হবি না।”
-“আহ! আজব তো!আমি কী করলাম?আপনাকে আমি কখনো ভালো”
-“মেহেক”
উৎস ধমকের স্বরে থামিয়ে দেয়।মেহেক থেমে যায়।কিছুক্ষন চুপ করে বসে থাকে।তারপর আর চুপ করে বসে থাকতে পারলো না।কথা বলতে না পারলে তার দম বন্ধ হয়ে আসে।তাই কথা বলার ধান্দা খুঁজলো।
-“আচ্ছা উৎস ভাই আপনার হাতে সব সময় সাদা ঘড়ি কেনো থাকে?না মানে অন্য রঙের তো কোনো ঘড়ি পড়তে দেখি না।”
উৎস প্রতুত্তরে শান্ত স্বরে উওর দেয়
-“সাদা আমার পছন্দের রং।”
মেহেক নাক ছিটকে বলে,
-“সাদা আবার কারো পছন্দের রং হয়?”
-“কারো পছন্দ দিয়ে আমার যায় আসে না।আমার পছন্দের জিনিস নিয়ে কথা বলা আমি পছন্দ করি না।এসব বেড হেবিটস যেনো দ্বিতীয়বার না দেখি।
কী এমন বললো যে খোঁচা মেরে কথা বলতে হবে।মেহেক ভেঙচি কেটে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে বাইরে তাকায়।তখনি তার নজর কাড়ে রাস্তার ফুটপাতে বসে থাকা একজন মাকে দেখে।তার কোলে কয়েক মাসের সন্তান হয়তো।
#চলবে

