#মুখোশ || ৬ষ্ঠ পর্ব
মানুষটাকে দেখে পিয়াসের চোখজোড়া চকচক করে উঠলো। সে কি ভুল দেখছে? নিজের চোখ দুটো কচলে নিয়ে আবার তাকালো। না, কোনো ভুল নয়।
-এতদিনেও যেন বয়সটা একটুকুও বাড়েনি।
সেই চিরচেনা শান্ত মুখ; সরু ভ্রু জোড়ার উপরে চওড়া কপাল,বলিষ্ঠ শরীর,পরিপাটি করে আঁচড়ানো কাঁচা-পাকা চুল, শান্ত অথচ গভীর একজোড়া চোখের ওপর পাতলা ফ্রেমের চশমা। কাঁধের একপাশ দিয়ে ঝোলানো সেই পরিচিত ব্যাগটা, যেটা রুদ্র দা সবসময় নিজের সহচরীর মতো সঙ্গে রাখতেন। আজ এতবছর পরও যেন মানুষটাকে সেই প্রথমদিনের সাক্ষাৎকারের মতনই লাগছে। একটুকুও বদলায়নি।
‘এসে কি খুব বিপদে ফেলে দিলাম?’ হালকা হাসি নিয়ে প্রশ্ন করলেন তিনি।
ঘোর কাটিয়ে পিয়াস তাড়াতাড়ি বলে উঠলো,‘ছি ছি, কী বলেন আপনি! আপনার মতো একজন মানুষ যে এত তাড়াতাড়ি আমার ডাকে সাড়া দিয়ে এতদূর চলে আসবেন, সেটা ভেবেই একটু অবাক হয়েছি। তবে প্রশান্ত যে বলেছিল আপনি আমাকে ফোন করে তারপর আসবেন।’
রুদ্র দা মৃদু হেসে বললেন, ‘সব কথা কি এভাবে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বলবো? এতটা পথ এসেছি, আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না তো।’
নিজের বোকামির জন্য পিয়াস জিহ্বায় কামড় দিল।
‘দেখুন তো, কথায় কথায় আপনাকে বসতে বলাটাই ভুলে গেছি!’
তারপর তাড়াতাড়ি একটা কাঠের চেয়ার এগিয়ে বললো,’ বসুন দাদা।’
রুদ্র দা পিয়াসের দেওয়া চেয়ারটায় আরাম করে বসলেন। তারপর মুখ তুলে একবার দোকানটার ভেতরটায় চোখ বুলিয়ে নিয়ে পিয়াসের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বললেন,‘প্রশান্তর মুখে তোমার বোনের মৃত্যুর খবরটা শুনে খুব খারাপ লেগেছে। প্রশান্তর কাছ থেকে সবটা শোনার পর ভেবেছিলাম,তোমার সাথে কথা বলে তারপর আসবো কি-না সিদ্ধান্ত নেবো। কিন্তু পরে মনে হলো, ফোনে শোনার চেয়ে সামনাসামনি শুনলেই ভালো হবে। তাই আর দেরি না করে চলে এলাম।’
পিয়াস গলা ভারী করে বললো,‘খুব ভালো করেছেন। এই কদিন আপনার আসার পথই চেয়ে ছিলাম। বোনটা যে কেন এমন করলো। রিম্পার মৃত্যুর পর বাবা-মা একেবারেই ভেঙে পড়েছেন।’
রুদ্র দা এবার চোখ তুলে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দোকানের দুই কর্মচারীর দিকে তাকালেন। দুজনায় অল্প বয়সীর। একজনার বয়স পঁচিশ অন্যজনার বাইস কি তেইশ হবে। তারপর আবার পিয়াসের দিকে ফিরে একটু হালকা হাসি দিয়ে বললেন,
‘আশপাশে কোথাও খাবারের হোটেল আছে নাকি? পেটের ভেতরে তো খিদের চোটে ইঁদুর দৌড়াচ্ছে।’
এই কথা শুনে পিয়াস নিজের ওপরেই বিরক্ত হলো। কী সাংঘাতিক বোকামিটাই না করছে সে! মানুষটা এত দূর থেকে এসেছে,অথচ আগে তার খোঁজখবর নেওয়ার বদলে নিজের দুঃখের কথাই বলতে শুরু করে দিয়েছে সে।
‘হোটেলে কেন খাবেন,আমার বাড়ি থাকতে। প্রশান্ত অবশ্য বলেছিলো আপনি না-কি কারও বাড়িতে উঠেন না এমনকি খেতেও পছন্দ করেন না। কিন্তু আমি এসব শুনবো না।’
‘ঘটনার মূল কেন্দ্র যেহেতু তোমার বাড়ি,তখন তো আমাকে তোমার বাড়িতে যেতেই হবে। তবে আপাততঃ হোটেলেই চলো। তারপর পেটভরে খেয়ে সবটা শুনে তারপরই না হয় তোমার বাড়িতে গেলাম। সমস্যা নাই যে কদিন আছি আর বাইরে কোথাও খাব না।’
পিয়াস আর কথা বাড়ালো না। দোকানের কর্মচারী দুজনকে দোকান বন্ধ করে দিতে বলে রুদ্র দাকে সঙ্গে করে পাশের একটি খাবারের হোটেলে ঢুকে গেলো।
ভরপেট খাওয়ার পর তারা পাশের এক চা-দোকানে গিয়ে বসলো। তারপর দু কাপ চা অর্ডার দিয়ে একটা কাঠের বেঞ্চে বসলো।
-গরম ধোয়া ওঠা চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে রুদ্র দা গম্ভীর স্বরে বললেন,‘এখন সবটা খুলে বলো। কেন তোমার মনে হলো রিম্পা নিজে আত্মহত্যা করেনি,তাকে খুন করা হয়েছে? ছোট থেকে ছোট বিষয়ও বাদ দিও না। কারণ তোমার কাছে যেটা অপ্রয়োজনীয় মনে হতে পারে, সেটাই আমার কাছে গুপ্তঘরে ঢোকার সিড়ির প্রথম ধাপ হতে পারে।’
পিয়াস একটু দম নিয়ে বলা শুরু করলো,‘ফোনে আপনাকে সবটা বলা হয়নি। ঘটনার শুরু আসলে একটা ছায়ামূর্তিকে নিয়ে। সে নারী নাকি পুরুষ, নিজের আপন কেউ নাকি নিছক একটা চোর, আদৌও কি চুরি করাটাই তার আসল উদ্দ্যেশ্য ছিলো নাকি অন্যকিছু সেসব কিছুই এখন পর্যন্ত ধোয়াসা হয়ে আছে।
আপনি তো জানেনই আমি চাকরির সুবাদে শহরে থাকি।
আমাদের যেহেতু এখনো কোনো বাচ্চা কাচ্চা হয়নি তাই আমি যখন বাড়িতে থাকতাম না তখন রিম্পা আর আমার স্ত্রী আমাদের ঘরে একসাথেই ঘুমাতো। আর আমি বাড়ি ফিরলে তখন রিম্পা তার নিজের ঘরে ঘুমাতো। গত মঙ্গলবার মধ্যরাতে মা আমাদের ঘরের বাইরে একটা ছায়ামূর্তিকে দেখতে পেয়ে সে আমার স্ত্রীর ওপর সন্দেহ আরোপ করে বসে। মায়ের ধারণা ছিলো আমার অনুপস্থিতিতে আমার স্ত্রী হয়তো কোনো পুরুষের সাথে অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়েছে আর গভীর রাতে লোকচক্ষুর আড়ালে তাকে ডেকে এনেছে।’
পিয়াস একটু থামলো। রুদ্র দা চায়ের কাপে চুমুকের ফাঁকে পিয়াসের মুখের দিকে তাকালো একবার। দেখলো চোখের কোণে জমে থাকা ক্লান্তি স্পষ্ট ফু্টে উঠেছে।
আবার বলা শুরু করলো পিয়াস,‘এই সন্দেহ থেকেই আমার স্ত্রীকে দোষী বানিয়ে সালিসি পর্যন্ত বসানো হয়। খবরটা পেয়েই আমি তড়িঘড়ি করে গ্রামে ফিরে আসি। আসার পর মায়ের সাথে প্রচণ্ড বাক-বিতর্ক হয়। শেষ পর্যন্ত সালিসে উপস্থিত সবাইকে চলে যেতে বলি আমি।
আর সেদিন রাতেই ঘটে দ্বিতীয় ঘটনাটা। রাত তখন আনুমানিক দশটার মত হবে।
মায়ের ঘর থেকে হঠাৎ চিৎকার চেঁচামেচি শুনে সবাই মিলে ছুটে যাওয়ার পর জানতে পারলাম,মায়ের আলমারিতে রিম্পার বিয়ের জন্য যেই গয়নাগুলো রাখা হয়েছিলো সেগুলো আর পাওয়া যাচ্ছেনা। সেখানে আর কিছুই নেই। সব গয়না নাকি উধাও!
গয়না হারানোর পর মা আরেকদফা আমার স্ত্রীকে দোষারোপ করে বসলো। আমার স্ত্রীকে সরাসরি গয়না চুরির দায় না দিলেও আমাদের ঘরটা খুঁজে দেখার কথা জানালে আমিও তাকে নির্দ্বিধায় খুঁজে দেখার কথা জানাতেই মা ছুটে গেলো আমাদের ঘরে। তারপর ঘরের এদিক সেদিক খুঁজেও যখন গয়নাগুলো পেলো না তখন পর পর দুটো ঘটনা মিলিয়ে মা নিজের ভুল বুঝতে পেরে আমার স্ত্রীর উপর দেওয়া মিথ্যা আরোপের জন্য অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা চেয়ে নিলেন।
আমিও সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, এ বাড়িতে আর সারাকে রাখবো না। ভেবেছিলাম রিম্পার বিয়েটা ভালোই ভালোই মিটে গেলে সারাকে আমার সঙ্গে করে শহরে নিয়ে চলে যাব।
তারপর ব্যাপারটা সেখানেই শেষ হয়ে গেলে পারতো।
কিন্তু পরদিন ঘটলো আরেক ঘটনা। সেদিন রাতে মা আমাদের ঘরের সামনে যেই ছায়ামূর্তিটাকে দেখে সারাকে মিথ্যা দোষারোপ দিয়েছিলো সেই একই দোষ গিয়ে পড়লো আমার বোনের উপর।
রিম্পার হবু শ্বশুরবাড়িতে না-কি কেউ একজন গিয়ে সেই চোরের সাথে রিম্পাকে জড়িয়ে কুৎসা ছড়াতেই রিম্পার হবু শ্বশুর ফোন দিয়ে বাবাকে সোজাসাপটা বিয়ে না হওয়ার কথা জানিয়ে দিলো।
এ পর্যন্ত বলার পর পিয়াস চোখ নামিয়ে নিয়ে আবার বললো,‘এই কথা শুনে বাবা-মা, রিম্পা সবাই একেবারে ভেঙে পড়ে। তখন আমিই শক্ত হয়ে রিম্পার হবু শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে সব সত্যি খুলে বলি। আর রিম্পার হবু বর নিজেও আমার পাশে এসে দাড়ানোতে শেষমেশ তারা আবারও রাজি হয়।
বাড়িতে ফিরে খবরটা দিতেই রিম্পার মুখে আবার হাসি ফুটে ওঠে। তারপর সেদিন রাতে সবাই মিলে অনেকক্ষণ গল্পগুজব করার পর রাত খানিকটা গভীর হলে যে যার ঘরে ঘুমোতে চলে যাই।
আমি যেহেতু বাড়িতেই ছিলাম, তাই সেদিন রাতে রিম্পা তার নিজের ঘরেই ঘুমিয়েছিল।’
এপর্যন্ত বলে পিয়াস থামলো।
রুদ্র দা ভ্রু কুঁচকে ধীর স্বরে বললেন,‘আর পরদিন সকালে রিম্পাকে গলায় ফাঁস দেওয়া অবস্থায় ঝুলে থাকতে দেখলে তাই তো?’
পিয়াসের গলাটা এবার ধরে এলো খানিকটা। নিচু স্বরে উত্তর দিলো,‘হ্যাঁ। তবে রিম্পার মৃত্যুর পর কয়েকটা জিনিস ভেবে আমার মনে হয়েছে রিম্পা আত্মহত্যা করেনি।’
‘যেমন?’
রুদ্র দা আবার প্রশ্ন করলেন।
‘সেদিন এতকিছু মাথায় আসেনি আমার,আমি ওতটা খেয়ালও করিনি। আসবেই বা কী করে বলেন? একটা মাত্র বোন ছিল আমার… তার মৃত্যুর পর কোন ভাইয়ের মাথা ঠিক থাকে?’
‘কি দেখেছিলে সেদিন?’
‘সাধারণত ফাঁস দিয়ে মরা ব্যক্তির মাঝে যেসব লক্ষ্যণ থাকে; যেমন মৃত্যু যন্ত্রণায় মুখের অভিব্যক্তির পরিবর্তন হওয়া,হাত পা বেঁকে যাওয়া,টান লেগে জিহ্বা বেরিয়ে আসা,চোখ বিকৃত হয়ে যাওয়া,এসবের কোনকিছুই হয়নি রিম্পার ক্ষেত্রে।
সেদিন এসবে ওতটা গুরুত্ব দিইনি আমি,তবে রাতে যখন সারা এক এক করে সবগুলো বললো তখন আমারো মনে হয়েছে রিম্পা আত্মহত্যা করেনি তাকে খুন করা হয়েছে। আপনিই বলেন একটা শরীর শূণ্যের উপর ঝুলে গেলে কি তার চেহারা কখনো স্বাভাবিক থাকে? দেখে মনে হচ্ছিলো রিম্পা ঘুমের মধ্যে ঝুলে আছে।’
‘আচ্ছা সবার প্রথমে লাশটাকে কে দেখেছিলো?’
‘আমার স্ত্রী। রিম্পা রোজ সকালে নাস্তা তৈরীর সময় সারাকে হেল্প করতো। তো সেদিন রিম্পাকে না দেখতে পেয়ে সারা ভেবেছিলো হয়তো মন খারাপ তাই রান্নাঘরে আসেনি। তারপর সবকাজ শেষ করার পরও রিম্পাকে দেখতে না পেয়ে আমার স্ত্রীই রিম্পাকে ডাকতে গিয়েছিলো আর তারপর…
পিয়াস এবার কেঁদে ফেললো। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার বললো,
‘রুদ্র দা আমার বোনটা কার কি ক্ষতি করেছিলো যে এমন পাষাণের মত কাজটা করতে হলো তার সাথে?’
রুদ্র দা কিছুক্ষণ গম্ভীর চোখে পিয়াসের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন,’ এখনি বলতে পারছি না। আগে তোমার বাড়িতে যাই বাকিদের সাথে কথা বলি তারপর না হয় বলবো। আচ্ছা রিম্পার মৃত্যুর পর পুলিশ এসেছিল?’
‘এসেছিল। কিন্তু বাবা চাননি মৃত্যুর পরও রিম্পার শরীর টাকে নিয়ে কাটাছেঁড়া হোক। তাই অনেক অনুরোধ করে বিষয়টা মিটিয়ে ফেলেছিলেন বাবা।’
এই কথা শুনে রুদ্র সাহেবের চোখ হঠাৎ তীক্ষ্ণ হয়ে উঠলো।
তিনি ধীরে, কিন্তু কঠোর স্বরে বললেন,
‘এইখানেই তো বড় একটা ভুল করে ফেলেছো।
রিম্পার পোস্টমর্টেম রিপোর্ট টা থাকলে খুন, আত্মহত্যা নাকি পরিকল্পিত কোনো হত্যা সবকিছু ক্লিয়ার হয়ে যেত। কেস সলভ করাটাও অনেক সহজ হয়ে যেত। আর পুলিশই বা কেমন ফাঁস দেওয়া লাশের ফরেনসিক না করিয়েই মাটি দিতে রাজি হয়ে গেলো!’
পিয়াস অসহায় কণ্ঠে বললো,
‘আপনাকে তো বললামই তখন এতকিছু মাথায় আসেনি। আর বাবাও চাইছিলেন না মরার পর আবার মৃত শরীর নিয়ে টানা-হেঁচড়া করা হোক। তাই…’
রুদ্র দা কথার মাঝেই থামিয়ে দিলেন,
‘তাই টাকা খাইয়ে পুলিশকে ফিরিয়ে দিয়েছো, তাই তো?’
উত্তরে পিয়াস চুপচাপ মাথা নিচু করে বসে রইলো।
পিয়াসের নীরবতা দেখে রুদ্র দা মনে মনে বললেন,
‘ভদ্রলোক তাঁর মেয়ের পোস্টমর্টেম করাতে নিষেধ করলো কেন সেটাই বুঝতে পারছিনা।
তারপর পিয়াসকে উদ্দ্যেশ্য করে বললো,’আচ্ছা, এখন চলো তোমাদের বাড়িতে যাওয়া যাক। আমি গেলে কোনো সমস্যা হবে না তো?’
‘না, সমস্যা কেন হবে।’
মৃদু হেসে, প্রায় বিড়বিড় করে রুদ্র দা বললেন,
‘সমস্যা তো একটা আছেই। শস্যের ভেতরেই মনে হচ্ছে ভূতটা ঘাপটি মেরে বসে আছে।’
পিয়াস কপাল কুঁচকে তাকিয়ে বললো,’কিছু বললেন?’
‘না, কিছু না।’
একটু থেমে আবার বললেন,
‘চলো তাহলে। আর একটা কথা এখনই তোমার বাবা-মাকে এসব কিছু বলার দরকার নেই। আমি গেলে যদি আমার পরিচয় জানতে চায়, বলবে রিম্পার মৃত্যুর খবর শুনে আমি ঢাকা থেকে এসেছি। তোমার অফিসের বড় ভাই ঠিক আছে?’
পিয়াস ধীরে মাথা নেড়ে বললো,
‘আচ্ছা… ঠিক আছে।’
তখনকার মত কথাবার্তা শেষ করে পিয়াস রুদ্র দা কে সাথে করে তার বাড়ির উদ্দ্যেশ্যে রওনা দিলো।
চলবে…
#আশিক_মাহমুদ

